ব্যস্ত দুপুর। গোলাপশাহ
মাজার ক্রস
করে নগর
ভবন ঢুকব।
বাস-লেগুনা,
প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, রিকশা-বাইসাইকেল মিলেমিশে
গুলিস্তানের এ সড়ককে আক্ষরিক
অর্থেই ব্যস্ত
করে তুলেছে।
কর্তব্যরত ট্রাফিক
পুলিশ যথাসাধ্য
চেষ্টা করেও
কুলিয়ে উঠতে
পারছে না।
হাত উঁচিয়ে
কোনো লেন
বন্ধ করার
পরও মোটরসাইকেল-রিকশা সাঁই করে
বেরিয়ে যায়।
ধরার জো নেই। গোলচক্কর
পার হতে
গিয়ে একটি
আকস্মিক ঘটনার
দিকে চোখ
গেল। মাজারের
উল্টো দিক
থেকে মন্থরগতির একটি বাস এগিয়ে
আসছে। ‘মন্থর
গতি’ই সেদিন পথচারী
নারীর জন্য
আশীর্বাদ হয়ে
এসেছে। নয়তো
ঘটনা শব্দের
জায়গায় এখন
‘দুর্ঘটনা’ লিখতে
হতো। দুই
পাশে দুই
বাস। তার
মাঝে পথচারী
নারী। বাসের
ব্লাইন্ড স্পট
অর্থাৎ যে জায়গা থেকে
চালকের দৃষ্টি
আকর্ষণ করা
যায় না—সেখান ঘেঁষে
নারী যাত্রী
এগিয়ে আসছেন।
মুহূর্তেই তিনি
বাসের সামনে
দিয়ে পার
হওয়ার চেষ্টা
করলেন। চালকও
বাস এগিয়ে
নিচ্ছেন। অবাক
ব্যাপার হলো,
ওই নারী
তখনো কিছু
বুঝতে পারেননি।
তিনি অনেকটা
জোর করেই
বাসের সামনে
দিয়ে পার
হওয়ার চেষ্টা
করছেন। মানুষজনের ডাকাডাকিতে চালক ও পথচারী দুজনের
হুঁশ ফিরল।
সেদিনের মতো
বেঁচে গেল
একটি প্রাণ।
পেশা সূত্রে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছে। একজন কর্মকর্তার কাছে ঘটনাটা বিস্তারিত বললাম। বললাম, ‘সিটি করপোরেশন যদি নির্বিঘ্নে ফুটপাতে হাঁটার ব্যবস্থা করতে পারত তাহলে কিন্তু মানুষজনকে বাসের নিচে চাপা পড়ার ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে হতো না।’ ওই কর্মকর্তা বললেন, ‘আপনার কথা আংশিক সত্য। প্রথমত, গুলিস্তানের মতো ব্যস্ত সড়কেও পর্যাপ্ত ফুটপাত আছে। দ্বিতীয়ত, ফুটপাত বা ফুট ওভারব্রিজ থাকলেই কি পথচারীরা তা ব্যবহার করেন? করেন না। মানুষজনেরও সচেতনতার অভাব আছে।’
কথা
সত্য। একজন
পথচারীকে অবশ্যই
রাস্তায় চলার
ন্যূনতম নিয়মকানুন মেনে তবেই পথে
বের হতে
হবে। নয়তো
ভুলভাবে হেঁটে
মূল্যবান প্রাণ
মুহূর্তেই খোয়া
যাবে। সবার
ভাগ্য তো ওই নারীর
মতো প্রসন্ন
হবে এমন
গ্যারান্টি নেই।
যা-ই হোক, পর্যাপ্ত
ফুটপাতের যে দাবি করা
হলো তা হয়তো সঠিক।
কিন্তু সে ফুটপাত কোথায়
জিজ্ঞাসা করে
উত্তরের আশায়
ওই কর্মকর্তার দিকে তাকালাম। এবার
তিনি অসহায়
আত্মসমর্পণ করে
বললেন, ‘হকারদের
দখলে’।
‘কেন?’
‘সেটা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানেন। হকারদের উচ্ছেদের জন্য কিছুদিন পর পরই তো অভিযান হয়। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটরা হামলারও শিকার হয়েছেন একাধিকবার।’
‘কিছুদিন আগে দুজন হকারকে আপনারা জেলও দিয়েছেন। তবুও হকারমুক্ত গুলিস্তান সম্ভব হচ্ছে না কেন?’
কিছুটা আমতা আমতা করে তিনি বললেন, ‘গত সাত বছরে এ পর্যন্ত অন্তত ২০০ বার হকার উচ্ছেদের অভিযান করেছে দক্ষিণ সিটি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, হকাররা রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী। নয়তো নগর পিতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে হকাররা কীভাবে টিকে থাকেন?’
নগর পিতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে নাকি সন্ধি করে হকাররা টিকে আছেন—এ নিয়ে নেতিবাচক ধারণাটিই বেশির ভাগ নগরবাসীর বিশ্বাস। তবে বর্তমান সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ যে দৃঢ়তা নিয়ে হকার উচ্ছেদ শুরু করেছে, তাতে নগরবাসীর মনে হকারমুক্ত গুলিস্তানের স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। মুকুলেই ঝরে যাওয়ার মতো বোধ হয় এবারো মরে গেল হকারমুক্ত গুলিস্তানের স্বপ্ন।
আসলে
হকার সমস্যা
নিয়ে বলতে
গেলে অনেক
বিষয় সামনে
চলে আসে।
বিশেষ করে হকারদের পুনর্বাসন
বড় একটা
ইস্যু। তাছাড়া
অর্থনীতিতে হকারদের
অবদানের বিষয়টিও
ছোট করে দেখার উপায়
নেই। বেকারত্বে
জর্জরিত একটা
দেশে হকারমুক্ত
ফুটপাতের কথা বলাও অনেকের
কাছে বিলাসিতা
মনে হবে—সেটিও স্বীকার
করছি। কিন্তু
আমাদের প্রশ্ন
হলো, হকারদের
জন্য কি পথচারীরা গাড়ির
নিচে চাপা
পড়ার ঝুঁকি
নিয়ে রাস্তায়
চলবেন? হকারদের
পুনর্বাসনের জন্য
গুলিস্তানেই অন্তত
১০টি মার্কেট
নির্মাণ করেছে
সিটি করপোরেশন।
তবুও হকার
সমস্যা দিন দিন প্রকট
হচ্ছে কেন? বরাদ্দের দোকান
প্রকৃত হকাররা
ঠিকমতো বুঝে
পায় না—এটা যেমন
সত্য, তেমনি
হকাররা নিজেদের
নামে দোকান
বরাদ্দ নিয়ে
অন্যদের কাছে
বেশি টাকায়
বিক্রি করে দেন এটাও
বাস্তব। হকারদের
বড় একটা
অংশ হকার
হিসেবেই থাকতে
চায় এ নগরীতে। তা থাকুক। আমাদের
কোনো সমস্যা
নেই। কিন্তু
সিটি করপোরেশন
হকার উচ্ছেদের
নামে দুদিন
পর পর অভিযান করে কিন্তু হকারদের
থেকে যারা
চাঁদা নেয়—লাইনম্যান, পুলিশ,
রাজনৈতিক নেতা
তাদের বিরুদ্ধে
কোনো অ্যাকশন
নেয় না কেন? হকারদের
এত সাহস
কীভাবে হয়—তারা খোদ ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর হামলা করে বসে? ঢাকার
অনেক ফুটপাতই
হকারমুক্ত হয়েছে,
গুলিস্তান কেন সম্ভব হচ্ছে
না? তাহলে
কি সিটি
করপোরেশনের ওই কর্মকর্তার কথাই
সত্য—হকাররা
রাষ্ট্রের চেয়েও
বেশি শক্তিশালী?
রাষ্ট্রের চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই—শুধু কথায় নয়, বাস্তবেও আমরা তা দেখতে চাই। হকারদের নিয়ে গণমাধ্যমে প্রায়ই অনুসন্ধানী খবর প্রকাশ হয়। প্রতিটি খবরেই রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা উঠে আসে। কিন্তু ওইসব হোমরাচোমরাদের বিরুদ্ধে সচরাচর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না প্রশাসনকে। খোদ মেয়র-কাউন্সিলর-এমপিরাই হকারদের চাঁদার ভাগ পায় বলে শোনা যায়। সর্ষের ভেতর ভূত থাকলে যা হয়, ঢাকার হকার সমস্যার বেলায় তা-ই ঘটছে। নয়তো প্রশাসন চাইলে কী না সম্ভব!
বিদ্যমান হকার সমস্যার অস্থায়ী সমাধান দেখা গেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়। সেখানে সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা ছিল মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে। সিটি করপোরেশন সময় বেঁধে দিয়েছে বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত হকাররা দোকান বসাতে পারবেন। হকাররাও বলেছেন তাদের বিক্রি শুরুই হয় বিকাল থেকে, শুধু জায়গা দখল করার জন্য সকাল থেকে তারা পসরা খুলে বসেন। উত্তর সিটি করপোরেশনের সময় বেঁধে দেয়ার ফলে পথচারীরদের জন্য কিছুটা আসান হয়েছে। তবে সময় বেঁধে দেয়া অবশ্যই টেকসই সমাধান নয়। আমরা চাই, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই হকার সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হোক। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবে, ফুটপাত হকারদের জন্য নয়, নাগরিকদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য। নাগরিকদের বাসের নিচে পিষে হকারদের জন্য মমতা দেখানো নগর পিতাদের কাজ নয়।
আল ফাতাহ মামুন: নগর ও পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিক










