`অবস্থা যখন পাল্টায়, আমি আমার মত পরিবর্তন করি। আপনি কী করেন জনাব?’ জন এম কেইনস 

এক.

সমাজতন্ত্র নামক শব্দটি কিংবা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধারণা এক কালে আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এবং স্বাধীনতা-উত্তর কটা বছর গ্রাম-শহর, ধনী-গরিব, ডান এবং বাম—সবখানে, সব জায়গায়, সবার করোটিতে সমাজতন্ত্র জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। তবে কেউ হুজুগে, কেউ সুযোগে এবং কেউ অন্তরের অন্তস্তল থেকে বিশ্বাসে ভর করে। তৎকালীন সিনেমা, নাটক, উপন্যাস কিংবা গানে সমাজতন্ত্রের মূল চেতনার সন্ধান পাওয়া যেত। 

সত্তরের নির্বাচনী প্রচারণায় এবং পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমাজতন্ত্রের কথা গণবিবৃতির মাধ্যমে বিধৃত করেছেন। রেহমান সোবহানের আত্মজীবনীমূলক বই থেকে অনুবাদ করা অনুসন্ধান এই যে বঙ্গবন্ধু নিয়মিত সমাজতন্ত্রের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন একটা শোষণমুক্ত সমাজ গঠন। ‘‌আমি আমাদের শ্রমিক শ্রেণীকে আশ্বস্ত করতে চাই যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তার একটা মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রমিক সমাজের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। জাতীয়করণের জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে যেখানে শিল্পে শ্রমিকদের ভূমিকা রাখার ব্যবস্থা থাকবে। বস্তুত বর্ধিত উৎপাদনের ভাগ তারাও পাবে।’  

অতীত স্মরণ করে পাই, সত্তরের দশক বিশেষত স্বাধীনতা-উত্তর থেকে পঁচাত্তর-পূর্ব বাংলাদেশে বাম ধারার রাজনীতির প্রাধান্য আর ডানা-কাটা পাখির মতো মুখ থুবড়ে মাটিতে পতিত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, পঁচাত্তরের দুর্ভাগ্যজনক পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে পেন্ডুলাম ঠিক উল্টো ঘুরে যায়: সমাজতন্ত্র শব্দটি শাসনতন্ত্র থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়, বাজার অর্থনীতির ধারণা প্রাধান্য পায় এবং সমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা বিলুপ্তির পথে পা বাড়ায়। খাঁটি কতক বামপন্থী ছাড়া মেকি সব সমাজতন্ত্র ফেলে ভোঁ দৌড় দিল-ডুগডুগি বাজাল ডান। 

সেই বিলুপ্ত সমাজতন্ত্র শব্দটি মাটি খুঁড়ে যেন তুলে আনলেন এক প্রখ্যাত অধ্যাপক এবং সেই গল্পটি বলার জন্যই বর্তমান নিবন্ধের অবতারণা।

দুই. 

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বই ‘উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: একটি রূপরেখা’ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ করেছে বাতিঘর প্রকাশনী সংস্থা। ছিমছাম পরিপাটি যাকে বলে পরিশিষ্ট আর গ্রন্থপঞ্জি বাদ দিলে বইয়ের আকার দাঁড়ায় ৬৫ পৃষ্ঠা মাত্র। এত ছোট বই? বিস্ফারিত চোখে প্রশ্ন জাগবার পূর্বে বইয়ের মুখবন্ধে ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হলেন লেখক নিজেই, ‘‌এই বই প্রকৃত অর্থে একটি প্রবন্ধ মাত্র; একে কোনোক্রমেই পূর্ণদৈর্ঘ্য বই বলে দাবি করা যাবে না। তাছাড়া এটি আসলে আমার একটি চলমান বই লেখার প্রকল্পের উপজাতক বা বাই-প্রডাক্ট।’ তা হোক, আমার মতো পাঠকের এতে আপত্তি থাকার কথা নয় কারণ কথায় আছে ‘স্মল ইজ বিউটিফুল’ এবং বাস্তবিকই বিষয়বস্তুসমেত বইটি যেমন সুন্দর তেমনি ব্যতিক্রমধর্মী অনেক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। 

তবে দু-একটা না বললেই যেন নয়। প্রথমত এবং প্রশংসনীয়ভাবে এটি তার লেখা প্রথম বাংলা বই, ‘কাজেই, বিশেষত ভাষাগত দিক থেকে যেসব ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে, সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থী।’ দ্বিতীয়ত, পাঠককে উৎসর্গ করা হয়েছে অতি বিনম্র ভাষায় ‘সুধী পাঠক, যারা এই বইয়ের অনুচিত সাহসী শিরোনামের ধৃষ্টতা সত্ত্বেও বইটি পড়তে আগ্রহী হয়েছেন, শ্রদ্ধাভরে তাদের উদ্দেশ্যে।’ তৃতীয়ত, বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন স্বপ্নিল বড়ুয়া তবে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের চিত্রকর্ম অবলম্বনে। তিনি এ প্রচ্ছদ ফেসবুকে দিয়ে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হন। যদিও তিনি বলছেন, ‘বলা বাহুল্য, আর্টে আমার বিন্দুমাত্র প্রশিক্ষণ নেই। এটি অবসরের আমার একটি বিনোদন মাত্র’ (যেমন তার গান গাওয়া)। এবং চতুর্থত, ‘সমসাময়িক উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির সমন্বয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি রূপরেখা তৈরি করা যায় কিনা, তা নিয়ে কিছু প্রাথমিক চিন্তাভাবনাই এ বইয়ের উদ্দেশ্য।’ কিন্তু এ ‘উদ্দেশ্য’ যে তাকে কট্টর মার্ক্সবাদীদের সমালোচনার জ্বলন্ত উনুনে নিক্ষেপ করতে পারে আশা করি সেটা মাথায় রেখেই তিনি হাতে কলম নিয়েছেন। 

তিন.

গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র? এ আবার হয় নাকি? ভ্রু কুঁচকে সাচ্চা বামপন্থী এ প্রশ্ন করতেই পারেন যখন তাদের ধারণা গণতন্ত্র হচ্ছে বুর্জোয়াদের বিলাস। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এক সাক্ষাৎকারে তার রাজনৈতিক পছন্দ সম্পর্কে যা বলছেন তা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় এ রকম: ‘অবশ্যই বাম কিন্তু স্বাধীনতা এবং সমগ্র সাপেক্ষে। যেটা আমি পছন্দ করি না তা হচ্ছে বামেরা, হোক কলকাতা কিংবা কেমব্রিজে, জনগণকে স্বাধীনতা এবং পছন্দ করার অধিকার প্রদানকে এক ধরনের বুর্জোয়া বিলাসিতা বলে গণ্য করে। সুতরাং আমি বাম ধারায় ঝুঁকে গেলাম কিন্তু স্বাধীনতা ও মুক্তির আগ্রহ সহকারে।’ 

থাক সে কথা। আলোচিত বইয়ের ভূমিকায় পাঠক পাবেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা, সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন ধরন। একসময় এ অঞ্চলে সমাজতন্ত্র শব্দটি বহুল আলোচিত ছিল: ‘বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই শাসনতন্ত্রে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ১৯৭১ সালে, শ্রীলংকায় ১৯৭৮ এবং নেপালে ২০১৫ সালে শাসনতন্ত্রে সমাজতন্ত্রের কথাটি যোগ করা হয়েছে। এছাড়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশকিছু দেশ, যেখানে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান, সেসব দেশের শাসনতন্ত্র বা রাষ্ট্রের মূলনীতিতে সমাজতন্ত্রের উল্লেখ আছে।’ স্মর্তব্য, নানান ব্যাখ্যায় এবং অস্পষ্ট সংজ্ঞায় ব্যবহৃত সে সমাজতন্ত্র। আবার তথাকথিত ‘গোলাপি জোয়ার’ বা ‘পিংক টাইড’-এর প্রেক্ষাপটে বামপন্থী অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে ব্রাজিলসহ লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ। ‘লাতিন আমেরিকার এই বামপন্থী ধারার রাজনীতি প্রধানত ইতিপূর্বের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমর্থিত কট্টর বাজার অর্থনীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে।’

চার

‘গণতান্ত্রিক সমাজের বিবর্তনশীল ধারণা’ অধ্যায়ে আমরা পাই কীভাবে ‘অ-সমাজতান্ত্রিক’ জওহরলাল নেহেরু সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সাফল্যে আকৃষ্ট হয়ে এবং কেমব্রিজ সতীর্থ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের অনুপ্রেরণায় বেসরকারি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর সরকারের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণে ভারী যন্ত্রশিল্প গড়ে তুলতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। লেখক বলছেন, ‘সে তুলনায় বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপর সমাজতন্ত্রকে আদর্শগতভাবে বাহ্যত অনেকটা শক্তভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল; বিশেষত প্রস্তাবিত ভূমি সংস্কার ও শিল্পের সরকারি মালিকানার বিষয়ে।’ তাছাড়া তার আলোচনায় স্থান পায় আশির দশকের শেষার্ধ থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শনে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিবর্তনের ইতিবৃত্তান্ত ‘নব্য-উদারীকরণ পরবর্তী সমাজতন্ত্র’ অমর্ত্য সেন এবং বার্ট্রান্ড রাসেলের সমাজতান্ত্রিক কাঠামোয় ব্যক্তিস্বাধীনতার সুযোগ, জন রলসের ন্যায়পরায়ণতা, ‘বাজার সমাজতন্ত্র’ ইত্যাদি সমেত উপসংহার। মোটকথা, ‘‌এযাবৎকালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষণীয় হলো বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তি উদ্যোগের অন্তর্নিহিত শক্তিকে অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু সে সঙ্গে কিছু মানুষের হাতে এত সম্পদ হতে দেয়া যাবে না, যাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং জনকল্যাণমূলক নীতি প্রবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।’

তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে জিডিপি রাজস্ব অনুপাত নিয়ে তথ্যবহুল আন্তঃদেশীয় পর্যালোচনা যা তেমন একটা নতুন কিছু নয় বটে তবে যারা সমতাভিত্তিক সমাজ এবং একই সঙ্গে করের চাপ কমাতে চান তাদের উদ্দেশে নিবেদন— ‘এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ১০ শতাংশের নিচে রাজস্ব আয়ের অনুপাত দিয়ে শাসনতন্ত্রে ঘোষিত সমাজতন্ত্রের পথে এগোনোর লক্ষ্যকে উচ্চাভিলাষী বলতে হবে।’

লেখকের মূল কথা, ‘গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার যেসব উপাদানের আলোচনা এখানে করা হলো, সেগুলো বিভিন্ন মাত্রায় কার্যকর করা সম্ভব এবং এর জন্য কোনো রাজনৈতিক বিপ্লবেরও প্রয়োজন নেই।’

গ্রন্থটি শেষ হয় গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র নিয়ে কিছু স্মরণীয় উক্তি দিয়ে যার বাংলা অনুবাদ হলে হয়তো সাধারণ পাঠকের জন্য সুবিধা হতো । 

এক অর্থে বইটি পাঠকের সামনে সমাজতন্ত্রের সন্ধানে বলে ঠাহর হতে পারে। কথা কিঞ্চিত সেই লাইনেই তো মনে হয় যে দেশে বাজার বৈষম্যের বাহক আবার বিপ্লবের মাধ্যমে সর্বহারার ক্ষমতা দখল সম্ভব নয় সেসব দেশে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র একটা সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে তবে তার জন্য প্রয়োজন খুব দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং প্রতিশ্রুত রাজনীতিবিদ (দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যার বিশাল ঘাটতি রয়েছে)। যেসব দেশে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, রাষ্ট্রীয় খাত প্রতিযোগিতামূলক মুনাফা অর্জন করতে পেরেছে সেসব দেশে দক্ষ আমলা আর আইনের শাসনের বলেই সম্ভব হয়েছে। 

বইটি পড়ে বর্তমান নিবন্ধকারের মনে হলো, আর কিছু না হোক এ বইটি চিন্তার খোরাক জোগাবে তাদের জন্য যারা মনে করেন সমসাময়িককালে ‘বাজার সমাজতন্ত্র’ একটা বিকল্প ভাবনা হতে পারে। রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং অধ্যাপনায় রত সবার জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য। বইয়ের  বক্তব্যগুলো বিতর্কের বাইরে নয় যদিও। ‘নব্য উদারীকরণ-পরবর্তী সমাজতন্ত্র’ নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে লাতিন অ্যামেরিকায় এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রে, তার ঢেউ বাংলাদেশে আসতে পারে একদিন এবং তখন এ বইতে থাকা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণাগুলো খুব কাজে লাগবে বলে বিশ্বাস। 

অনেকটা সমাধিস্থ সমাজতন্ত্রকে লোকালয়ে নিয়ে আসার সাহস দেখানোর জন্য লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ। আশা করি একদিন আরো বিস্তারিত লেন্সে তিনি বিষয়টি নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হবেন, বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায় রেখে যেথায় ‘অন্যায় সুবিধা ও সর্বব্যাপী দুর্নীতিই বড় সমস্যা।’


আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক, বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক