জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ একবার শিক্ষার্থীদের বড় একটি সভায় বলেছিলেন যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক একটি ‘সিভিল ক্যান্টনমেন্ট’। আমরা মুক্তিযুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দিয়েছি কিন্তু প্রশিক্ষণ জমা দিইনি। তিনি জিয়াউর রহমানের সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে পেয়েছিলেন। তার বহু বছর পরে জিয়াউর রহমান যখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে খুলনা গিয়েছেন তখন আলাউদ্দিন স্যার খুলনার একজন ম্যাজিস্ট্রেট। সার্কিট হাউজে দুপুরের খাওয়ার সময় স্যারকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আলাউদ্দিন তুমি এখানে? তোমার তো এখানে থাকার কথা নয়। তোমার তো বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা।’ কত মেধাবী জিয়াউর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তার কত উঁচু ধারণা! আলাউদ্দিন স্যার উত্তর দিলেন, ‘স্যার সেভাবে হয়ে ওঠেনি, তাই প্রশাসনে জয়েন করেছি।’ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বললেন, ‘তুমি এখন সুযোগ পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করবে? স্যার উত্তর দিলেন, অবশ্যই করব স্যার।’
প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমান তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে তখনো কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তার কয়েক মাস পরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি হলো, স্যার আবেদন করলেন। ফলাফল যেহেতু ভালো, তাই তিনি সাক্ষাৎকারে অংশ নিলেন কিন্তু প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরি ছাড়া তো অত সহজ নয়। জিয়াউর রহমানকে জানালেন। তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত ফাইল ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে তার কাছে পাঠাতে বললেন। তিনি স্যারকে রিলিজ করার অনুমোদন করলেন। স্যার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করলেন। জাপানে পিএইচডি করেছেন। পরবর্তীকালে জাবির উপাচার্য হয়েছিলেন। তিনি যদিও আওয়ামী লীগ করতেন কিন্তু জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধা করতেন।
সব সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভয় করে। কারণ তারা সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, আর যখন তারা রুখে দাঁড়ায় তখন আর কেউ ক্ষমতায় টিকতে পারে না। আইয়ুব খানকেও ক্ষমতার মসনদ ছাড়তে হয়েছিল। এরশাদ সরকারও ভয় পেত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। তাই রাতের আঁধারে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে গাজীপুর থেকে কুষ্টিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। শুনেছি কাজী জাফর বলেছিলেন ‘ঢাকার প্রবেশপথগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় থাকলে রাজধানী যেকোনো সময় অচল হয়ে যাবে। রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে। যেকোনো মূল্যে তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে গাজীপুর থেকে স্থানান্তর করতে হবে। একদিকে জাহাঙ্গীরনগর, অন্য একটি প্রবেশপথে যদি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থাকে তাহলে ঢাকায় প্রবেশের বিকল্প কোনো পথ থাকবে না। অতএব ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থানান্তর করা হলো। এগুলো বেশিদিনের কথা নয়। বড় ও মহৎ সব উদ্দেশ্যর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা একসময় আন্দোলন করত। এখন কি হয়েছে? হাতে থুতু লেগেছে কিংবা চায়ের কাপে শব্দ হয়েছে তাই ছাত্রদের দুই গ্রুপ কিংবা দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি।
গত ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় সাভারের খাগানে অবস্থিত সিটি ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী মোটরসাইকেল থেকে থুতু ফেললে তা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থীরা গায়ে লাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর জানা উচিত, কীভাবে থুতু ফেলতে হয়। এ নিয়ে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে রাত ৮টার দিকে সিটি ইউনিভার্সিটির প্রায় ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থী দেশী অস্ত্র ও ইট পাটকেল নিয়ে ড্যাফোডিল শিক্ষার্থীদের ‘ব্যাচেলর প্যারাডাইস হোস্টেলে’ হামলা চালায় ও কয়েকটি কক্ষ ভাংচুর করে। পরে ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১২টার দিকে ড্যাফোডিলের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে সিটি ইউনিভার্সিটিতে হামলা চালায়। ভোররাত পর্যন্ত চলে এ তাণ্ডব! এ যেন চর দখল! এ যেন দুর্বৃত্ত আর পশুত্বের খেলা! নেই কোনো সভ্যতার ছাপ!
সর্বত্রই শক্তি প্রয়োগ! সর্বত্রই গায়ের জোর দেখানো, বুদ্ধি, স্থিরতা, যৌক্তিক ও মানবিক আচরণ—সবই অনুপস্থিত! তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দরকার কি? রাস্তার পাশের একজন চা বিক্রেতা, জুতো পলিশ করা মুচিও এ রকম করবে না। তাদের ভেতরেও মনুষত্ব আছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের মনুষত্ব কোথায় হারালো?
আবেগ আর পশুত্ব দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে আহত করেছে, অনেকের অবস্থাই নাকি গুরুতর! এ ফলাফল তারা কেন চিন্তা করে না। এখন মামলা হবে, পুলিশের দৌড়াদৌড়ি হবে! পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার গোল্লায় যাবে, অভিভাবকদের হয়রানি, অর্থকষ্ট! এ কি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ! বিশ্ববিদ্যালয় দুটোর সামনে শিক্ষার্থীরা বেরিকেড দিয়ে সড়ক বন্ধ করে রেখেছে। মনে হয় যেন, জনগণের রাস্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এ ঘটনা দেশজুড়েই চলে ও চলছে! কিছু হলেই শিক্ষার্থীরা রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাই হচ্ছে মানুষকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, দেশের সমস্যা সমাধানে কীভাবে এগিয়ে আসতে হয় এবং জনগণকে কোনোভাবে কষ্ট না দেয়। তারা যেন সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়ে নিজেদের পশুশক্তির জানান দিতে চায়! এগুলো না বুঝলে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। দেশ তাদের কাছ থেকে কী পায়?
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিদর্শনে এসে প্রতিষ্ঠানটির ফ্যাকাল্টি অব ইনফরমেশন সায়েন্সের অ্যাসোসিয়েট ডিন বলেছেন, এখানে যে ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা দেখেছি তাতে আমরা লজ্জিত ও দুঃখ প্রকাশ করছি। একজন ছাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ভাংচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে, তা আমার ধারণার বাইরে। দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার। শিক্ষার্থীদের আমি সঠিক শিক্ষা দিতে পারিনি, আমি একজন ব্যর্থ শিক্ষক। সিটি ইউনিভার্সিটির উপাচার্য বলেন, সিটি ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রের থুতু ফেলাকে কেন্দ্র করে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের সঙ্গে তর্কাতর্কি হয়। এরপর তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা হলে রাত ১০টার দিকে আমরা সমস্যাটি সমাধান করে দিই। কিন্তু পরে পরিকল্পিতভাবে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির অসংখ্য দুষ্কৃতকারী শিক্ষার্থী আমাদের ইউনিভার্সিটির গেট ভাংচুর করে, ওয়াল ভাংচুর করে এবং আমাদের গেটের ভেতর ১৩টি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। তারা পরিকল্পিতভাবে আমাদের প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশ করে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারের কার্যালয়সহ সব কক্ষে থাকা কম্পিউটারসহ মূল্যবান মালামাল ভাংচুর ও লুটপাট করেছে। গতকাল আমাদের যত আর্থিক লেনদেন হয়েছে, সেগুলো আমাদের অ্যাকাউন্টস অফিসে ছিল, তারা সেখানে ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমাদের কম্পিউটার ও ল্যাপটপে যে ডকুমেন্টগুলো ছিল, সেগুলো তারা ভাংচুর করেছে, যা আমরা চাইলেও উদ্ধার করতে পারব না। একটা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী কীভাবে আরেকটি ইউনিভার্সিটিতে এভাবে ভাংচুর চালাতে এবং অগ্নিসংযোগ করতে পারে সেটি আমার কল্পনার বাইরে।
ডিন ও উপাচার্য ঠিকই বলেছেন, এটি আমাদেরও কল্পনার বাইরে। এ ধরনের ইতিহাস দেশে এই প্রথম! পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ কিছু শিক্ষার্থী যারা মূলত ক্যাডার বা বিশেষ কোনো ছাত্র সংগঠনের সুবিধাভোগী ও পড়াশোনায় অমনোযোগী তারা করে থাকে। দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। বিদেশী শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে না কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আসছে, আছে এবং ভবিষ্যতেও আসবে। কিন্তু এ কী ঘটনা ঘটাল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা? সবচেয়ে বড় কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যাদের কাছ থেকে পুরো জাতি ভিন্নধর্মী ও ইতিবাচক আচরণ প্রত্যাশা করে।
সেটি অনেক আগেই উবে গেছে অন্তত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দুষ্ট রাজনীতির ক্ষতের কারণে। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অন্তত এসব থেকে মুক্ত ছিল। আজ যেন তাদের জন্য সব দুয়ার খুলে গেল! কোনো ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই শিক্ষক তথা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নেই ও থাকে না। তার পরেও দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষই এখন নিজ নিজ শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নেবেন। যদিও দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দুঃখ প্রকাশ করেছেন, সমবেদনা জানিয়েছেন কিন্তু ঘটনা তো ঘটে গেছে! কিন্তু এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিরন্তর সাফল্য ও ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি সবার চোখে ভালো লাগবে না। এর পেছনে বহু শত্রু আছে। দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত শিক্ষার্থীদের মোটিভেশন দেয়া, সেশন পরিচলনা করা যাতে তারা কোনো ধরনের উসকানিতে না পড়ে। বারবার ফোন করার পরও নাকি পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কোনো সদস্য শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। ভাংচুরের সময় ১১ জন সন্ত্রাসীকে আটক করলেও হুমকি-ধমকির পরে নাকি ছেড়ে দিতে হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এখন আতঙ্কে রয়েছে, ফলে তাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চারদিনের জন্য ছুটি দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নাকি ছাত্রীদের আবাসিক হোস্টেলে ঢোকারও চেষ্টা করেছে। সেখানে মূল ফটক ভেঙে ভেতরের ক্যান্টিন ভাংচুর করেছে, কলাপসিবল গেট ভাংচুর করেছে ও মেয়েদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এ কেমন কাণ্ড! কিছু কিছু বিষয় রহস্যজনক মনে হচ্ছে। দুই বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে কারণ বিশ্ববিদ্যালয় দুটোর ঘটনার সঙ্গে ‘মবের’ একটি ভূমিকা ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। এখানে কোনোভাবে মব হতে দেয়া যাবে না। সবকিছুর স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমাদের রক্ষা করতেই হবে ও সেটি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সম্ভব নয়।
মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক










