বাংলাদেশ বিজনেস সামিটের এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতে আর ভর্তুকি নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুরও একই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুলভ মূল্যের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বড় ভূমিকা রেখেছে। কম দামে পাওয়া প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করে সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে তা জোগানো হয়েছে। সরকারের ভুল নীতিপরিকল্পনার ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকটের সূত্রপাত এবং ক্রমে তা মহিরুহ আকার ধারণ করেছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুদ কমে আসায় স্থানীয় অনুসন্ধান জোরদারের পরিবর্তে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে সরকার। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল কাঁচামাল ও ব্যক্তি খাত নির্ভর হওয়ায় ভর্তুকির পরিমাণও বেড়েছে। ভর্তুকি কমাতে গিয়ে ঘন ঘন দাম বাড়াতে হচ্ছে। ভ্রান্ত নীতি পরিবর্তন ব্যতিরেকে ভর্তুকি বন্ধ করা হলে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না, জনগণের ওপর চাপই শুধু বাড়বে। দেশের উন্নয়ন আর উৎপাদনের স্বার্থে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক নয়, জনমুখী করা দরকার। 

জ্বালানি খাতে বিশেষত জ্বালানি তেলে সরকার এখন কোনো ভর্তুকি দেয় না। বরং ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দর একসঙ্গে হিসাব করলে দেখা যাবে, সরকার মুনাফা করছে। ভ্যাটসহ বিভিন্ন ধরনের শুল্ক হিসাব করলে এ খাতে সরকার ভর্তুকি আগেও দিত না। গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর এ খাতের ভর্তুকিও এখন খুব বেশি নয়। বহু বছর ধরেই পেট্রোবাংলা দেশে গ্যাস কেনা ও আমদানির দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক বলেই সবাই জানে। মুনাফায় টান পড়েছে প্রথমত তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজি আমদানি শুরুর পর থেকে এবং দ্বিতীয়ত বিশ্ববাজারে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজির দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার কারণে। এ কারণে সরকার দামও বাড়িয়েছে। বড় আকারের ভর্তুকি রয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। এর জন্য সরকারের ভ্রান্ত পদক্ষেপকেই চিহ্নিত করতে হবে। ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বেসরকারি খাতকে অনুমতি প্রদান এবং তাদের কাছ থেকে অধিক দামে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিই আজকের অবস্থার জন্য দায়ী। দায়মুক্তি আইনের মাধ্যমে একের পর এক বেসরকারি কোম্পানিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে বিদ্যুৎ কেনার অভিযোগও রয়েছে। এসব চুক্তির ন্যূনতম কোনো স্বচ্ছতা নেই। অনস্বীকার্য, কোনো বেসরকারি কেন্দ্রকে অলস বসিয়ে রাখার মাশুল হিসেবে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়ার রীতি বিশ্বব্যাপীই আছে। কিন্তু আমাদের দেশে বিষয়টি এত নিরীহ নয়। অভিযোগ আছে, যে শতাধিক বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে তা দেয়া হচ্ছে, তার একটা বড় অংশ অপ্রয়োজনীয়, স্রেফ স্বজনতোষণের জন্য রাখা হয়েছে। আর চার্জও নির্ধারিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট মালিকের ইচ্ছামাফিক। জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে সরকার অনায়াসেই এই ক্যাপাসিটি চার্জ অনেকাংশে হ্রাস করা যায়। সেক্ষেত্রে বছর বছর ভর্তুকি নিয়ে কথা চালাচালিও বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সরকার সে পথে হাঁটতে চাচ্ছে না।

এ কথা সত্য যে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেয়া হয় না। পশ্চিমা দেশগুলো জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেয় না, আবার এটিকে সরকারের আয়ের উৎসও বানায় না। দেশগুলোয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করে দাম নির্ধারণ করা হয়। বিভিন্ন দেশে প্রতিযোগিতা কমিশন, প্রাইস কমিশন, ভোক্তা কমিশনসহ নানা নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে। তাদের নির্ধারিত মূল্য ব্যতীত বাজারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়-বিক্রয় করা যায় না। এমনকি কোনো কোনো দেশে প্রতিদিনই মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো কোন পর্যায়ে কী মুনাফা করবে এবং করছে সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে তাকে জরিমানাসহ কঠিন শাস্তি প্রদান করা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাজই থাকে জনগণকে সবচেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিশ্চয়তা বিধান। দেশগুলোয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়াতে হলে কোম্পানি বা সংস্থাকে নানা জেরার সম্মুখীন হতে হয় এবং দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তাদেরই প্রমাণ করতে হয়। আর বাংলাদেশে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বিরাজ করে। এখানে কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে চায় আর জনগণ দাম কমাতে তাদের যুক্তি তুলে ধরে। গণশুনানি বা দাম বাড়ানোর যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে এড়িয়ে বাংলাদেশে জ্বালানির দাম নির্ধারণ হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। সেখানে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি বলতে কিছুই নেই। সিস্টেম লস, দুর্নীতি, অপচয়ের বোঝা প্রতিনিয়ত জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়াতে আগে বিইআরসিতে গণশুনানি হতো। তাতে কিছুটা হলেও কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি তৈরি হয়েছিল। সে প্রক্রিয়াও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিদ্যমান অবস্থায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়া হবে আত্মঘাতী। 

ভর্তুকি না দিয়ে বা দাম না বাড়িয়েও উৎপাদন খরচ সমন্বয়ের আরো অনেক উপায় আছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, সঠিক নীতি গ্রহণ না করা, অপচয়, সিস্টেম লসের নামে দিনের পর দিন চুরি হচ্ছে। এ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে দাম না বাড়িয়েও সরকারের ব্যয় বা ক্ষতি কমানো সম্ভব। ২০০৯ সালে সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন যেকোনো মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ ছিল। এজন্য কিছু ব্যয়বহুল উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছিল। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল নানাভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা ছিল। সে চেষ্টা সফলও হয়েছে। কিন্তু ১৪ বছর পর এসেও সেসবের পুনর্মূল্যায়ন হয়নি। বিদ্যুতের দাম কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের ব্যাপারেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে টাকা পরিশোধের আত্মঘাতী অবস্থান থেকেও সরে আসার কোনো চিন্তাভাবনা লক্ষ করা যাচ্ছে না। ভর্তুকির চাপ সামলাতে এখন স্বল্পমেয়াদে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। অপচয় (সিস্টেম লস) আরো কমিয়ে আনার পাশাপাশি সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে উৎপাদন ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন যে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েও সরকার ব্যয়সাশ্রয়ী হয়ে ভর্তুকির চাপ কমাতে পারত। একইভাবে সরকার যদি দেশে মজুদ গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা করত তাহলে গ্যাসের দামও বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। সরকার ব্যয়সাশ্রয়ী না হয়ে দাম বাড়িয়ে আয় বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে। ফলে দ্রব্যমূল্য আরো বাড়ছে। বিদ্যুৎ চুরিও বাড়ছে। বিদ্যুৎ খাতে উচ্চহারে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বন্ধ করা যায়। এজন্য দরকার সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা। প্রয়োজনের বাইরে কুইক রেন্টালগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করা গেলেও খরচ অনেক কমে আসবে। সরকার যদি তেলভিত্তিক সেচের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক সেচ চালু করে তাহলেও ব্যয় সাশ্রয় হবে। 

প্রতিবারই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় উৎপাদন খরচ সমন্বয়ের কথা বলা হয়। পুরো খরচ সমন্বয় করতে হলে বিদ্যুতের দাম হবে আকাশছোঁয়া। জনগণ ও অর্থনীতির কি সে সক্ষমতা আছে? বিদ্যুতের ব্যাপারে সরকার আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের কথা যতটা শুনছে, দেশের বিশেষজ্ঞদের কথা তেমনভাবে শুনছে না। সরকার ব্যবসায়ীর মতো শুধু লাভক্ষতির হিসাব করছে। দেশে অনেক অপ্রয়োজনীয় লোকসানি প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন চলছে। সেখানে বিদ্যুতের ওপর বারবার চাপ দিতে হবে কেন? জনস্বার্থে সরকার অনেক কিছুর ওপর ভর্তুকি দেয়। জনবান্ধব সরকারকে তো সবার আগে জনগণের কথাই ভাবা দরকার। ভর্তুকি প্রদানের বিষয়টি সরকারের সহনীয় মনোভাব নিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ভর্তুকি মানেই বোঝা নয়। আমাদের মতো উন্নয়নগামী দেশের উন্নয়নের  জন্য ভর্তুকি একটি সহায়ক উপাদান বটে। পৃথিবীর সব দেশেই প্রাথমিক অবস্থায় ভর্তুকি দিয়ে থাকে। দেশটি উন্নয়নের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে গেলে তখন ভর্তুকি হ্রাস/সমন্বয় করে থাকে, তার আগে নয়। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ এখনো উন্নত রাষ্ট্রে পৌঁছায়নি, এমনকি এর ব্যবস্থাপনাও উন্নত হয়নি। 

উন্নয়ন আর উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর দাম তাই ভাবিয়ে তোলে সব মহলকে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ, সরকারের ভুল নীতি, নানা ধরনের অপচয়, অপব্যয়, দুর্নীতি সবকিছুরই প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে। দাম বাড়ানোর ফলে কৃষি, শিল্প, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, বিনোদনের সব শাখায় ব্যয় বৃদ্ধির আঘাতে জনজীবন আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে দাম বাড়ানো নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুর্নীতি কমানোটাই এখন জরুরি।