বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। কয়েকদিন পরই দেশব্যাপী উদযাপিত হবে ঈদ উৎসব। উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় বোনাস দেয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ শিল্প-কারখানার নির্ধারিত বোনাস দেয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৪০ শতাংশ কারখানায় শ্রমিকদের ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে, যা হতাশাজনক। উৎসবের আগে নির্ধারিত সময়ে পোশাক কারখানায় বেতন-বোনাস না হওয়ার বিষয়টি পুরনো। কোনো বছরই এক্ষেত্রে শতভাগ সাফল্য অর্জন করা যায়নি। সরকার-মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে তারিখ নির্ধারিত হলেও অনেক কারখানা তা পরিপালন করে না। এর জন্য অবশ্য দায়ী তদারকির দুর্বলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হওয়ার প্রবণতা। এক্ষেত্রে ঈদের আগেই সব পোশাক কারখানায় নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধি, বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং যথাযথ ভাতা ও বোনাসের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখা দরকার, ঈদ উপলক্ষেই শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি হতো আগে। পোশাক কারখানার মালিকদের গড়িমসিতে আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। আমরা আশা করি, মালিকদের সংগঠনগুলো এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।

আসন্ন ঈদে শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাসের অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার অবশ্য নির্দেশ দিয়েছে ২০ রোজার মধ্যে দেশের পোশাক শ্রমিকসহ সব কারখানা শ্রমিকদের বোনাস পরিশোধের। মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পরও শ্রমিকরা শঙ্কায় ভুগছেন। বেতন-বোনাস পরিশোধে মালিকরা গড়িমসি করছেন। এমন ঘটনা প্রতি বছর দেখা যায়। অথচ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অজুহাতে সরকার শিল্প মালিকদের আর্থিক সহায়তা দেয়। কিন্তু দেখা যায়, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে অনিশ্চয়তা লেগেই থাকে। করোনার সময়ে সংকটে পড়ে অনেক শিল্প। তবে সরকার ওই সময়ে সংকটকালীন শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। শ্রমিকরা যেন সঠিক সময়ে তাদের বেতন বুঝে নিতে পারেন মালিকদের সংগঠনগুলো সেটি তদারকও করেছে। তার পরও অনেক কারখানায় বেতন-বোনাস সঠিক সময়ে হয়নি, যা ছিল দুঃখজনক। এবার যেন একই অবস্থা তৈরি না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখা জরুরি। অনেক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে গত কয়েক দশকের পথপরিক্রমায় দেশের শিল্প খাত আজকের এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। যেকোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই নিশ্চিত করতে হবে শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও বেতনের নিশ্চয়তা। এবার বেতন-বোনাস সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে আবারো শ্রমিক অসন্তোষ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে শ্রমিকরা নানামুখী চাপে রয়েছেন। পরিবার নিয়ে জীবনযাপনই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যথাসময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ করা প্রয়োজন। 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সারা বিশ্বের অর্থনীতি অনেকটা স্থবির। টিকে থাকার সংগ্রামে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। এক কঠিন সময় পার করছে রফতানি খাত। বিশ্বমন্দার কারণে অধিকাংশ কারখানায় পর্যাপ্ত কার্যাদেশ নেই। ৫০-৬০ শতাংশ ক্যাপাসিটি নিয়ে চলছে উৎপাদন, যা রফতানি করে মাস শেষে শ্রমিকের বেতন দেয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার যা রফতানি হচ্ছে, সেই বিলও ক্রেতারা যথাসময়ে পরিশোধ করছেন না। সময়টাও খুবই স্পর্শকাতর। যথাসময়ে বেতন-বোনাস দেয়ার ব্যর্থতায় ঘটে যেতে পারে শ্রম অসন্তোষ। ঈদে বেতন-বোনাস পরিশোধের জন্য বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সরকারের কাছে অর্থসহায়তা চেয়েছিল। সেক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তবে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে খবর মিলছে। আইন অনুযায়ী মাসের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে আগের মাসের বেতন পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও তা কখনই যথাযথভাবে পরিপালন হতে দেখা যায় না। ঈদের আগে শিল্পমালিকরা সাধারণত ছুটির আগের দিন পর্যন্ত বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ করেন। এ বছরের চিত্রটিও একই রকম।

মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শ্রমিকের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে বিজিএমইএ। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় খোলা হয়েছে ক্রাইসিস কন্ট্রোল রুম। বর্তমানে রফতানি আদেশের স্বল্পতা রয়েছে। তার পরও সরকারের সহযোগিতায় বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বিজিএমইএর সদস্য ৯২ শতাংশেরও বেশি কারখানায় বেতন পরিশোধ হয়েছে। বোনাস পরিশোধ হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানায়। দু-তিনদিনের মধ্যে সব কারখানায় পরিশোধ শেষ হবে বলে তারা আশা করছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘শ্রমিকরা যাতে ভালোভাবে ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে পারেন, সেজন্য মালিকরা ঈদের আগেই বোনাস দেবেন। নিয়ম অনুযায়ী এপ্রিলের সাত কর্মদিবসের বেতন পরিশোধ করবেন। তবে দু-একটি কারখানার মার্চের বেতন যদি বকেয়া থাকে, সেটিও অবশ্যই ঈদের ছুটির আগে পরিশোধ করবেন।’ 

শিল্পের প্রাণ যে শ্রমিক, তাকে বঞ্চিত রেখে আমরা কোনোভাবেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত শিল্পের উন্নতি ঘটাতে পারব না। তাই শ্রমিকের স্বার্থ বিবেচনা করে ঈদের আগে তাদের বেতন-বোনাস সঠিক সময়ে দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করতে পারত, কিন্তু কখনই তেমন উদাহরণ আমরা দেখতে পাই না। ঈদ ও উৎসবে সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বোনাস ও উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। সরকারের সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও তাদের কর্মীদের উৎসব ভাতা দিচ্ছেন। গার্মেন্টসহ সব শিল্পে এটি চালু হয়েছে। শ্রমিকদের একটা অংশ তাদের ন্যায্য পাওনা পাচ্ছেন না। শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে হেলাফেলা কাম্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে পোশাক শিল্প মালিকরা নানা ধরনের বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাদেরও উচিত শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। সরকারকেও শ্রমিকদের পাওনা পেতে সহযোগী হওয়া উচিত।

দেশের শিল্প-কারখানা এখন একটি নিয়মনীতির মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশী ক্রেতা সংগঠন ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার নজরদারিও রয়েছে। আবার কেউ যাতে শ্রমিকদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে। ঈদের আগেই গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য জেলার কারখানার শ্রমিকদের উৎসব ভাতা পরিশোধ করা প্রয়োজন। এজন্য সরকার ও মালিকদের সংগঠনগুলোকে উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশে শিল্প খাতে বিপুল সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে সরকার। তাদের জন্য সরকারি ঋণ ও জমি সহজলভ্য। তাদের মুনাফা আসে ডলারের হিসাবে। তার পরও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাধন্য শিল্পের শ্রমিকদের বেতন কেন বকেয়া থাকবে বা নির্ধারিত মজুরি দেয়া হবে না, এটি কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।