বর্তমানে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশই মহামারী-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করছে। অনেকে এতে গুরুত্ব দিচ্ছে টেকসই বিনিয়োগকে। সরকারগুলোকে বারবার এ নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আসছে জাতিসংঘ। কিছু প্যাকেজ এখনো বাজেট দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, কোন কোন খাতে কী ধরনের ব্যয় বরাদ্দ করা হবে, নীতিনির্ধারকরা এখনো সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি না করার ফলে উল্লেখ্য অঞ্চলগুলোর পুনরুদ্ধার কর্মসূচি থেকে একটি জনগোষ্ঠী বাদ পড়ে যাচ্ছে। আর তারা হলেন গ্রামীণ নারী। যতক্ষণ না সরকারগুলো তাদের ব্যয় অগ্রাধিকারের মধ্যে লিঙ্গবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ এ জনগোষ্ঠী পেছনে পড়ে থাকবে। পুনরুদ্ধার কর্মসূচি থেকে যে পরিমাণ সাফল্য অর্জিত হবে বলে আশা করা হয়েছে, বৃহৎ এ গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে তা অধরাই থেকে যাবে।

আর এ-জাতীয় ফলাফল আক্ষরিক অর্থেই অসম্মানের কারণ হবে। গ্রামীণ অর্থনীতির অবস্থা আগে থেকেই নাজুক এবং শহরের তুলনায় সরকারি পরিষেবা সুবিধা কম। তিনটি কারণে এ নারীদের অবস্থার অবনতি হয়েছে—কভিড মহামারী, এর কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চলমান প্রভাব। তাছাড়া স্বাভাবিকভাবেই পুরুষদের তুলনায় নারীদের ওপর মহামারীর প্রভাব অনেক বেশি, যা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষত তৈরির পাশাপাশি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

এ অবস্থায় গ্রামীণ নারীদের উপকৃত করবে মহামারী-পরবর্তী এমন একটি পুনরুদ্ধার কর্মসূচির মূল চাবিকাঠি হলো সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি করা, যা আবহাওয়া পরিবর্তনের ধাক্কা এবং কৃষি ও জ্বালানির মতো খাতগুলোয় নতুন নতুন উদ্যোগকে পুনরুজ্জীবিত করবে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে নারী পরিচালিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসাগুলো।

এক্ষেত্রে সরকারগুলোকে পুনরুদ্ধার তহবিল বরাদ্দ ও বিতরণের ক্ষেত্রে খানিকটা পরিবর্তন আনতে হবে, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে লাখো মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। ভারতের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রে যেখানে লকডাউন, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিচ্ছৃঙ্খলা এবং শহরের জীবিকার সংস্থানের অভাবে লোকদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেখানে এ ধরনের বন্দোবস্ত বৃহৎ সংখ্যক মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সমর্থন করার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার প্যাকেজগুলো একটি সহজ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। তাছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ মহামারীজুড়ে স্থিতিস্থাপক হিসেবেও প্রমাণিত। এমনকি পরিবহন ও নির্মাণের মতো ক্ষেত্রগুলোয় মনোযোগ প্রদানের পরও নতুন পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্পগুলো সম্প্রসারিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে যে সমুদ্রসৈকতে উইন্ডফার্ম নির্মাণের জন্য তারা ৪৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।

২০২০ সালে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ তথ্য কিন্তু পুরো গল্পটি বলে না। অনুমানপূর্বক যে কেউই ভেবে নিতে পারেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো থেকে নারী ও পুরুষ সমভাবে উপকৃত হন কিন্তু বাস্তব অর্থে এখানে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান। 

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নারীরা তাদের গৃহস্থালির কাজকর্মে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করেন। তবে সামগ্রিক প্রক্রিয়াটা কিন্তু তাদের সুবিধার জন্য নকশা করা হয়নি। কিছু দেশ, যেমন বাংলাদেশের নারীরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত, কারণ এ ধরনের প্রকল্পগুলো মূলত পুরুষদের সমাগম বা জমায়েত বেশি এ-জাতীয় জায়গায় স্থাপন করা হয়, যেমন খোলাবাজার।

সূক্ষ্ম এই পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলোকে সংশোধন করতে সরকার প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়ে আসতে পারে। যেমন যেসব গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছেনি, সেখানে অনুদান কিংবা কম সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ছোট পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প স্থাপন। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) গৃহে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য সরাসরি ভর্তুকি ও ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে থাকে।

তাই এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্যই নারী নেতৃত্বাধীন ব্যবসাগুলোকে সমর্থন জোগাতে হবে। কভিডের আঘাতে তাদের ব্যবসাগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পতিত। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির অধীনে পরিচালিত ইমপাওয়ার প্রজেক্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নারী পরিচালিত ক্ষুদ্র পর্যায়ের ব্যবসাগুলো বড় রকমের ক্ষতির মুখে পড়েছে, যেমন নগদ প্রবাহের সংকট এবং নতুন নতুন ব্যবসা আকর্ষণের চ্যালেঞ্জ। এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে সুইডেন সরকারের অর্থায়নে।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলোয় নারীরা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি সক্রিয় হলেও তাদের বেশির ভাগই কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে। তাই পুনরুদ্ধার তহবিল বিতরণ কার্যক্রমের অংশীজন হিসেবে পুরুষদের তুলনায় তাদের অন্তর্ভুক্তি কম। পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সরকারগুলোকে তাই লিঙ্গবিষয়ক উপাদান যোগ করতে হবে, যাতে এ নারীরা তাদের প্রয়োজনগুলো যথাযথভাবে পূরণে সক্ষম হন।

তৃতীয় সহজ সমাধান হিসেবে আসে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের জন্য বিনিয়োগের বিষয়টি। কেননা ডিজিটাল লৈঙ্গিক বিভাজনটি ব্যাপক। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় পুরুষের তুলনায় নারীদের মুঠোফোনের মালিকানার সংখ্যা ৮ শতাংশ কম। ২০১৯ সালের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী নারীদের অনলাইন ব্যবহারের সংখ্যা মাত্র ৪৮ শতাংশ, বিপরীতে পুরুষদের ক্ষেত্রে যা ৫৮ শতাংশ।

তাই ডিজিটাল শিক্ষণের ব্যাপকতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ অঞ্চলের নারীদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম করে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের মতো দেশগুলো ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে সামগ্রিক বাজার চাহিদা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সরবরাহকারীর যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে অনলাইনে গৃহস্থালি পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্রয়, বিক্রয় ও শনাক্ত কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারে।

নারী, সে ক্ষুদ্র কৃষক কিংবা ব্যবসায়ী হোক না কেন, এ-জাতীয় প্রযুক্তি সম্পর্কে তার ভালো বোঝাপড়া বিদ্যমান বাজারগুলোয় স্বল্প পরিসরে জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে। তাছাড়া অন্যান্য সুযোগও তৈরি হতে পারে এ-জাতীয় উদ্যোগের মাধ্যমে। নারীর দ্বারা পরিচালিত ক্ষুদ্র গ্রিডের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য টেকসই ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তা ফোন কোম্পানিগুলোকে মোবাইল টাওয়ার বসাতে উৎসাহিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, এভাবে টেলিকম অপারেটররাও তাদের নেটওয়ার্ক পরিধি প্রসারিত করতে সক্ষম হবে।

জেন্ডার রিকভারি প্যাকেজগুলো কেবল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নয়, সরকার ও ব্যবসা উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। নীতিনির্ধারকরা যখন অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিকাশ এবং সামাজিক ও পরিবেশগত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পরিপালন করবেন তখন সংস্থাগুলোও নতুন বাজার থেকে উপকৃত হবে এবং একটি বর্ধমান জনসংখ্যা অনলাইনে পণ্য ও পরিষেবার জন্য অর্থ প্রদান করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম হবে। ফলে কেউ আর পেছনে পড়ে থাকবে না।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

পারমিতা মোহান্তি: প্রোগ্রাম ম্যানেজার অফিসার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক অফিস

অ্যানেট ওয়ালগ্রেন: প্রোগ্রাম ম্যানেজার অফিসার, লিঙ্গ ও জলবায়ু পরিবর্তন, জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক অফিস।

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস