বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষত শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে স্বল্পমূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাস ও সহজলভ্য শ্রম। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে আসায় খাতটি ক্রমে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে গ্যাসের চাহিদা মেটানো হচ্ছে এখন। কিন্তু চলতি শীত মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বর ও ডিসেম্বরে এলএনজি ক্রয় থেকে বিরত থাকে সরকার। অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু শিল্প-কারখানার চাহিদা এ সময়ে কমেনি। ফলে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক সরবরাহের চেয়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি কম যাচ্ছে গ্রিডে। এমনিতে পাইপলাইনে কনডেনসেট জমে যাওয়ায় শীতকালে গ্যাসের চাপ ঠিক রাখতে কম্প্রেসার বাড়াতে হয় বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। এবার সরবরাহে বড় ঘাটতির কারণে রাজধানীসহ আবাসিক ও শিল্প গ্রাহকরা গ্যাসের তীব্র সংকটে পড়েছেন।

এলএনজির বাজার মূলত এশিয়ার দখলে। একটা সময় জাপান বিশ্বের ৫০ শতাংশের বেশি এলএনজি আমদানি করত। জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর হচ্ছে এলএনজির প্রধান আমদানিকারক। এখন ভারতও আমদানি করছে। রফতানিকারক হিসেবে শীর্ষে আছে কাতার ও অস্ট্রেলিয়া। এলএনজির দাম বিভিন্ন মৌসুমের ওপরও নির্ভর করে। শীত বেশি পড়লে অনেক দেশ তখন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার চেষ্টা করে। দাম নির্ধারণ করা নিয়ে যখন প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন স্পট মূল্যও অনেক বেড়ে যায়। জাপান, আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে হঠাৎ শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়ায় চাহিদা বেড়ে যায় এলএনজির। এলএনজির স্পট দাম ৩০ থেকে ৩৮ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। এখন এলএনজির চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে না। ১০-১২ বছরের চুক্তি খুব কম হচ্ছে। এখন পাঁচ বছরের চুক্তিকেই দীর্ঘমেয়াদি ধরা হয়। সবকিছুই এত দ্রুত পরিবর্তনশীল যে ক্রেতা-বিক্রেতার কেউই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যেতে চাইছে না। কারণ অনিশ্চয়তা। গত কয়েক বছরে এলএনজির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও এ বছরের শুরু থেকে এর বাজার অস্থির হতে থাকে। দাম আরো কয়েক মাস এমন উচ্চ পর্যায়ে থাকলে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট বৃদ্ধির শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে সংকট সামলাতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া উচিত। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী গ্যাসের বর্তমান রিজার্ভ (আবিষ্কৃত) দিয়ে ১০-১২ বছর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব। এর মধ্যে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার ও সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলন না হলে দেশের গ্যাস খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। সাম্প্রতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে প্রশ্ন করছেন, গ্যাস স্বল্পতা এলএনজি আমদানির ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে কিনা। স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে এ সংকট মেটানো যায় কিনা, তা ভেবে দেখা যেতে পারে।  

আকস্মিক দর বাড়ায় বাংলাদেশসহ এলএনজির উদীয়মান বাজারগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সস্তা জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের দিকেই ঝুঁকেছিল দেশগুলো। অদূর ভবিষ্যতে আরো বেশি দামে গ্যাস ক্রয় করতে হতে পারে। জ্বালানি তেলের বাজারের মতো এলএনজির বাজারও অস্থির হয়ে উঠছে। এভাবে এলএনজি বাজার আরো অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হতে পারে। সন্দেহ নেই, গ্যাসের উদীয়মান বাজারগুলো মূলত মূল্যসংবেদনশীল এবং আসন্ন গ্যাসের অস্থির বাজারে পরিণত হতে চলেছে, ভবিষ্যতে যা আরো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। উচ্চ ও অস্থির এলএনজির দাম এলএনজি-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত করে তুলবে। ফলে এলএনজি-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে এবং গ্রাহকদের ওপর গ্যাস ও বিদ্যুতের দামের বোঝা আরো বেড়ে যেতে পারে। গ্যাসের দরবৃদ্ধির এ অনিশ্চয়তা একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে। সম্ভাব্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি গ্রাহককে পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশের উচিত দীর্ঘমেয়াদে এলএনজির চেয়ে সস্তা, আরো স্থিতিশীল নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নজর দেয়া।

আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সবসময়ই দোদুল্যমান। ফলে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একক জ্বালানিনির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ অনেকটা সময় পেরোলেও আমাদের দেশে এটি করা হয়নি। এটি জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া সমীচীন নয়। জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনে যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা, তার অন্যতম সবার জন্য টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। কিন্তু সমস্যা হলো এসডিজির অন্যতম শর্ত সবার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা সহজলভ্য করে তোলা। সেদিক থেকে ততটা ভালো অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চারটি উপাদান—জ্বালানি সহজলভ্যতা, জ্বালানির সমর্থতা, জ্বালানির উপযোগিতা ও জ্বালানির নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম। আমরা এর কোনোটিই সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে নিতে পারিনি। জার্মানির মতো উন্নত দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে নিজেদের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানোর ঘোষণা দিয়েছে। এখন ইউরোপ থেকে শুরু করে চীন পর্যন্ত বেশির ভাগ উন্নত দেশই প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও ঢেলে সাজাতে হবে। বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শিল্প মালিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। উপরন্তু গ্যাসের সংকটে উৎপাদনে প্রভাব পড়লে অনেকের জন্য টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। বিষয়টি আমলে নিয়ে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার প্রত্যাশা করছে সবাই।