ভারতববর্ষের অনুন্নত শহরগুলোর মধ্যে আগরতলা একটি। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে চারদিনের জন্য আগরতলায় যাওয়ার সুযোগ হয়। আমার সঙ্গে ছিলেন ছোট খালা ও খালাতো ভাই ইকরাম। গত ডিসেম্বরে দিল্লি ঘুরে এসেছে দুজনেই। বর্ডার ক্রস করে যখন আমরা অটো নিয়ে বটতলার দিকে যাচ্ছি, দশ বছরের ইকরাম আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘আম্মু! আগরতলা তো কুমিল্লার মতোই।’ অর্থাৎ, আগরতলা এতটাই সাদামাটা—অবুঝ শিশুর চোখও ব্যাপারটি সহজেই ধরে ফেলতে পারে।

কম উন্নত শহর হলেও পর্যটকদের মন ভোলাতে পিছিয়ে নেই শান্ত শহর আগরতলা। রবীন্দ্রনাথের লেখায় বোধ হয় পড়েছিলাম—রূপে কমতি রমণীর গুণ বেশি থাকতে হয়। আগরতলার বেলায় তা-ই হয়েছে। চোখ ধাঁধানো উন্নত শহরের মতো রূপ না থাকলেও হৃদয়জুড়ানো সৌন্দর্য ও প্রশান্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শহরটির অলিগলিতে। বর্ডারে আমরা আটজনের একটি টিমের সঙ্গে যুক্ত হই। টিমের প্রায় সবাই বড় ব্যবসায়ী ও চাকুরে।

খবরের জীবন ছাড়াও শিল্প-সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক থাকায় খুঁজতে চেষ্টা করলাম অনাড়ম্বর আগরতলার সৌন্দর্যটা কোথায়? প্রতিটি স্পটে, বাজারে যেখানেই গিয়েছি এ প্রশ্নের উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করেছি। দ্বিতীয় দিন ঘোরাঘুরি শেষে সোহাগ, ইমরান ও রিয়াদ ভাই মিলে রাতে আড্ডায় বসেছি। কথায় কথায় একজন বললেন, ‘একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন—শহরটা খুব উন্নত না হলেও গোছানো বেশ। মানুষের মাঝেও কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সবাই কেমন শান্ত-শিষ্ট।’

ইউরেকা! ইউরেকা! আগরতলার মাটিতে পা রেখেই যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছি—রাতের আড্ডায় তা সহজেই পেয়ে গেছি। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, তুখোড় ব্যবসায়ী ও চাকুরে বন্ধুদের চোখেও আগরতলার শান্তভাবটি ফুটে উঠেছে নিখুঁতভাবে। বণিক বার্তার মতো অর্থনীতিবিষয়ক একটি জাতীয় দৈনিকে নগরায়ণ—বিশেষ করে ঢাকা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বৃত্তের বাইরে ভাবতে হয় প্রতিনিয়ত। আমি ভাবছিলাম, অনাড়ম্বর আগরতলার আসল সৌন্দর্য ধরতে হলে কবি কবি ভাব থাকা লাগবে মনে। কিন্তু না। রাতের আড্ডায় আমার ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো। আড্ডা জমে উঠেছে। দ্রুত উন্নয়নশীল শহর ঢাকায় বসবাসের চাপ এবং আগরতলার নির্ভার জীবন নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। সবাই ঢাকার বাসিন্দা হওয়ায় ঢাকায় বসবাসের নেতিবাচক ব্যাপারে কেউ দ্বিমত করেননি।

ঢাকার মতো অবকাঠামোর ভারে নুয়ে পড়া শহর না হওয়ায় আগরতলার মানুষের জীবনে এখনো গ্রামীণ একটা সরলতা ও শান্ত ঢেউ জারি রয়েছে। শহরটি যেমন ভারী নয় তেমনি এখানকার মানুষও তুমুল ব্যস্ত নয়। রাস্তা পার হতে হতে কোনো মানুষকে আমরা মোবাইল চাপতে দেখিনি। চালকরাও চলতি অবস্থায় মোবাইলে কথা বলেন এমন ভয়ংকর দৃশ্য চোখে পড়েনি। দেশে ফেরার দিন সকালের ঘটনা। এক হোটেলে নাশতা খেয়েছি। এক বুড়ো দাদু আমাদের নাশতা পরিবেশন করেছেন। প্রায় দশজন একসঙ্গে নাশতা করলেও বিল দিয়েছি আলাদা আলাদা। বুড়ো দাদু একজনের বিল হিসাব করছেন, এর মধ্যেই স্থানীয় একজন জানতে চাইলেন তার বিল কত হয়েছে? বুড়ো দাদু হালকা ধমকের সুরে বললেন, ‘থামো! এত ব্যস্ত হয়ো না। অপেক্ষা করো।’ খুব সাধারণ আচরণ। কিন্তু আমার মনে ধরল। মুহূর্তেই চোখে ভেসে উঠল ঢাকার হোটেল বয়দের তুমুল ব্যস্ত চেহারা। মা কালির দশ হাতের কর্মক্ষমতা বোধ হয় ভগবান আমাদের হোটেল বয়দের দিয়েছেন। এক মুহূর্ত জিরোনের সময়ও যেন নেই তাদের।

ফেরার আগের দিন সন্ধ্যায় ছোট খালাসহ শপিংয়ে বেড়িয়েছি। খালা ঘড়ি কিনবেন। আর আমি স্থানীয় বইয়ের মার্কেটটা ঘুরে দেখব। আগরতলায় সড়ক এত শৃঙ্খল যে একজন রিকশাওয়ালাও ট্রাফিক আইন ভাঙে না। আর পুরো শহর চলছে ট্রাফিক লাইট অনুসরণ করে। অথচ আমাদের ঢাকা! কোটি টাকার ট্রাফিক লাইট অকেজো। ট্রাফিক পুলিশদের সততা প্রশ্নবিদ্ধ। ফুটপাতে হয় বাইক চলে নয়তো হকারের দখলে। আর রাস্তার মাঝখানে মোবাইলে কথা বলতে বলতে হাঁটছেন যাত্রীরা। হায় সেলুকাস!

মার্কেটে যাওয়ার জন্য অটো খুঁজছি। একটি অটো সামনের সিটের দুজন নারী বসা। একজন চালক। অন্যজন চালকের বন্ধু। বললাম, ‘দিদি যাবে?’

‘কোথায়?’

‘স্মার্ট বাজার।’

অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে চলে এলাম। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হলো, চালকের পাশে বসে থাকা নারীটি এতক্ষণ চালকের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাঙার বিষয়ে কথা বলছিলেন। কৌতূহল থেকে জিজ্ঞেস করলাম তোমরা কোন দিকে যাবে দিদি? চালক বলল, ‘কোথাও না। আজ এমনিতেই ঘুরব।’ রাতের আড্ডায় মেয়ে দুটির কথা উঠল। কী সহজভাবে মেয়েটি তার সম্পর্ক ভাঙার গল্প করছিল! একজন বললেন, ‘শান্ত শহরের মানুষের বৈশিষ্ট্যই এটা—তারা সহজে যেমন আনন্দ ভাগ করতে পারে, তেমনি সহজে দুঃখের কথাও বলতে পারে। আপনি পারবেন নিজের দুঃখের কথা এমন খোলা রাস্তায় চলতে চলতে বলতে? পারবেন না। এটা আপনার দোষ না। এটা নগরায়ণের ভয়ংকর প্রভাব। শত মন খারাপ থাকলেও আমাদের ঢাকায় তা প্রকাশ করার সুযোগ খুব কমই আছে।’

দেশে ফিরে আগরতলার ট্রেনে দাঁড়িয়ে তোলা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করি। ক্যাপশনে প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের ‘ঊনিশশো চৌত্রিশের’ কবিতার শেষ কয়েকটি লাইন জুড়ে দিই। লাইনগুলো হলো—

‘আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;

আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,

পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।’

আগরতলার নগর জীবনের উপলব্ধি নিয়ে কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মাদের সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে স্যার বলেন, ‘এক কথায় বলতে গেলে ওদের জীবনে কোনো তাড়া নেই। জীবনের সৌন্দর্য আসলে এখানেই। তাড়াহুড়োর জীবন আসলে জীবন নয়। আপনি যে পোস্টটি করলেন সেটি নিয়ে আমি আর আখতার ভাই আলাপ করছিলাম, মামুন ভাইয়ের অনেক অবসর আছে। অপেক্ষা করার সময় আছে। ভালো হতো আপনার ভ্রমণটি যদি আরেকটু দীর্ঘ হতো। আরো সমৃদ্ধ হতে পারতেন তাহলে।’

দেশসেরা একজন নগরবিদের কাছে আগরতলা নিয়ে আমার উপলব্ধির পূর্ণ সমর্থন পেয়ে পুলকিত হই। বললাম, ‘স্যার! জীবনানন্দের কবিতার লাইনগুলো আরো অনেকবার পড়েছি, কিন্তু এভাবে কখনো উপলব্ধি করিনি। এই ভ্রমণে বুঝেছি কেন ঘুরেফিরে কবি শালিখের ঠ্যাংয়ে মুখ ঘষা, বিবর্ণ বাদামি পাখি, হলুদ বিচালি, নীল ডিম, পৌষের শীতের সন্ধ্যা, সকালের সোনালি আলো, শীরীষ গাছের পাতা এসব বলেছেন। প্রকৃতিকে এত গভীরভাবে দেখার জন্য প্রয়োজন নিবিড় অবসর। সেটা জীবনানন্দের ছিল। আমাদের নেই। নেই বলেই আমাদের এত অসুখ! এত অশান্তি।’

আবারো পূর্ণ সমর্থন দিয়ে স্যার বললেন, ‘আসলে এত তাড়া, এত ব্যস্ততা দিয়ে কী হবে? আমি প্রায়ই অবসর কাটানোর জন্য গ্রামে চলে যাই। কত ভালো হতো আমাদের যারা নগরের অভিভাবক তারা যদি অবসরের আনন্দ বুঝতেন। নগর উন্নয়ন মানে কেবল বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়। একটু বসে অপেক্ষা করা, হেঁটে হেঁটে কোথাও যাওয়ার অবসরই টেকসই উন্নয়ন—শত বছর আগে জীবন ও প্রকৃতির কবি ব্যাপারটি ধরতে পেরেছেন, আফসোস! আমরা পারছি না।’

আল ফাতাহ মামুন : সাংবাদিক