রাজধানী ঢাকার সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণের ঘটনায় ভবনটির সামনের প্রধান সড়ক বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এর ফলে তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। ভবনটি যেন হেলে না পড়ে, এজন্য সেখানে লোহার পিলার বসানোসহ বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে. এটি যাচাই করতে অন্তত ৪৫ দিন লাগবে। তার মানে পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের বেশ দীর্ঘ সময়ই ভোগান্তি পোহাতে হবে।
দুর্ঘটনাটি আমাদের ঢাকাবাসীর জন্য সতর্ক সংকেত। ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনার পর ধীরে ধীরে ভবনটির আদ্যোপান্ত অনিয়মগুলো উঠে আসছে। বেজমেন্টে কার পার্কিংয়ের জায়গায় দোকানসহ পাঁচতলার অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও সাত তলা নির্মাণ এবং সেখানে জমে থাকা গ্যাসের ফলেই বিস্ফোরণ ঘটে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। মূলত দুর্ঘটনার ফলেই ভবনটি নিয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে ঢাকা শহরের অনেক ভবনই এভাবে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ভবনের নিচ তলায় কার পার্কিংয়ের জন্য যে উন্মুক্ত জায়গা রাখতে হয় সেটা ভবনের মালিকরা মানতেই চান না। কারণ উন্মুক্ত জায়গা রাখলেই সেটি অলাভজনক মনে করা হয়, এর চাইতে সেখানে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিলে প্রতি মাসেই টাকা উপার্জনের সুযোগ থাকে।
আবার বিল্ডিং কোড অনুযায়ী দুটো ভবনের মাঝখানে ফাঁকা জায়গা রাখার নিয়ম থাকলেও সেটি কেউ মানছে না। একটি ভবন ঘেঁষে আরেকটি ভবন যেভাবে তোলা হয়, তাতে স্বাভাবিকভাবে দুটি ভবনের ভেতর আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ থাকে না। এক্ষেত্রে যে দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি হয়, সেটি দূর করার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার বেড়ে গেছে। এই এসি ব্যবহার করতে গিয়ে যেভাবে সার্ভিসিং প্রয়োজন হয়, সেটিও ঠিকভাবে করা হয় না। যে কারণে হঠাৎ করে এসি বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটছে।
ঢাকার রাস্তায় প্রচুর ধুলো ওড়ে, যে কারণে করোনার সময় দেশের সবাই মাস্ক পরলেও ঢাকাবাসীকে বেশ আগে থেকেই মাস্ক পরে ঘর থেকে বের হতে হয়েছে। বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা শীর্ষ অবস্থানেই রয়েছে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) স্কোর অনুযায়ী আমাদের এ শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা অস্বাস্থ্যকর।এ স্কোর প্রতিদিনই প্রকাশ করা হয়। স্কোরে ঢাকার অবস্থান সবসময় শীর্ষ নগরগুলোর মধ্যেই থাকে।
জ্যামের নগরী এ ঢাকা, জাদুর এ শহরে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানোসহ কোথাও যেতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। জনসাধারণের সুবিধার কথা বিবেচনা করে শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়নি। জ্যাম কমাতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলেও জ্যাম এখন ফ্লাইওভারেও উঠে গেছে। ‘বাঁচবে সময়, বাঁচবে তেল, জ্যাম কমাবে মেট্রোরেল’ স্লোগান নিয়ে মেট্রোরেল যাত্রা করলেও পুরো ঢাকাবাসী এর সুফল এখনো পায়নি। অন্যদিকে মেট্রোরেলের সম্পূর্ণ ফলাফল না দেখেই পাতাল রেলের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জ্যাম কমাতে কতটা ভূমিকা রাখবে সেটি নিয়ে সন্দিহান অবস্থায় কাজ চলছে বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পের (বিআরটি)।
গ্রীষ্মকালে রাস্তার অবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও বর্ষাকালে শুরু হয়ে যাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। আর সেই সঙ্গে দেখা যাবে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা। আর ভারি বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, একেবারে হাঁটু আর কোমরপানিতে সয়লাব হয়ে যাবে ঢাকার অনেক রাস্তা। সবাই নগরপিতাদের দুষলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসবে নাগরিকদের অসচেতনতার বিষয়টি।
বিশেষ করে বৃষ্টির জমে থাকা পানি সরাতে যখন ড্রেন পরিষ্কার করা হয় তখন প্লাস্টিক বোতল আর পলিথিনের স্তূপ জমে। অর্থাৎ এগুলো সচেতনভাবে রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে না ফেলে যত্রতত্র ফেলায় সব ড্রেনে গিয়ে
জমা হয়। এজন্য সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় পানি জমে যায়।
ঢাকায় বসবাসের খরচ অনেক, আগে মানুষ ঢাকার বাইরে থাকতে চাইলেও এখন ঢাকা ছাড়া বিকল্প চিন্তা করতে পারে না। অবশ্য উচ্চশিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকার বিকল্প অবস্থান এখনো তৈরি হয়নি। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ঢাকার বাইরে বেশকিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হলেও চাকরির জন্য ঢাকামুখী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর আসলে থাকে না।
তাই ঢাকায় বসবাসরত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাসা ভাড়া এবং দ্রব্যমূল্য। গ্রামে ক্ষেত থেকে যে পণ্য উৎপাদন করার পর কৃষক অল্প টাকায় বিক্রি করেন, সে পণ্য ঢাকায় কয়েক গুণ দামে কিনতে হয়। তাছাড়া ঢাকায় বিক্রি করার জন্য গাছে থাকতেই দেশী ফলে কেমিক্যাল ছেঁটানো হয়। ট্রাকে ওঠানোর পর আরেকবার কেমিক্যাল দেয়ার পর ঢাকার আড়তে আসে। দেখা যায় কেমিক্যাল দেয়া কলা আলাদা করে রাখা হয়। সেটি পাকলে তারপর ক্রেতাদের জন্য বিক্রি করা হয়।
এভাবেই মাৎস্যন্যায় পরিবেশে আমরা বসবাস করছি আশ্চর্য মায়ার এ ঢাকা শহরে। ঢাকায় থাকার ফিলিংসই আলাদা, এ রকম মনোভাব পোষণ করা মানুষগুলোও মাঝেমধ্যে দম ফেলার ফুরসত খোঁজে। যে কারণে ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই নির্মিত হয়ে গেছে অসংখ্য রিসোর্ট আর অ্যামিউজমেন্ট পার্ক।
ঢাকায় খেলার মাঠ নেই, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বড় হচ্ছে ফ্ল্যাট বাসার নির্দিষ্ট গণ্ডিতে। পরিপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার বদলে মেতে থাকছে স্মার্টফোন আর টিভি স্ক্রিনের বৃত্তে।
তাজা শাকসবজি, মাছ, ফলমূল এ শহরে পাওয়া যায় না। সুপারশপ সংস্কৃতির এ যুগে আমরা বিশ্বের অন্যান্য শহরের মতোই হিমায়িত ও প্যাকেটজাত খাদ্যে অভ্যস্থ হয়ে পড়ছি। হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোর খাবারের মান নিয়ে অভিযোগও বেশ পুরনো।
এত সমস্যার মধ্যেও এ শহরে আশ্চর্য এক জাদু রয়েছে। ৪০০ বছরেরও পুরনো এ শহরে জমে যাওয়া সে অদ্ভুত মায়া আর জীবিকার টানই আমাদের ঢাকা শহরে থাকতে বাধ্য করে। সম্প্রতি কবর সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত করার জন্যই কবরস্থানে ফি বাড়ানো হয়েছে। তার মানে একদিন মাটি হয়েই এ শহরে মিশে যেতে হবে। তবে সে যাওয়াটা যেন স্বাভাবিকভাবে হয় সেটিই সবার কাম্য। সিদ্দিকবাজারে ঘর থেকে বের হয়ে মায়ের জন্য ইফতার কিনতে গিয়ে লাশ হয়ে বের হওয়া আমাদের প্রত্যাশা নয়।
আমরা সুস্থ শরীরে বুকভরে নিশ্বাস নিয়ে মায়ার এ শহরে থাকতে চাই। এজন্য নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনের ভূমিকার বিকল্প নেই।
তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক










