করোনাভাইরাসের আঘাতে বর্তমানে দেশের প্রতিটি অর্থনৈতিক অঙ্গন বিপর্যস্ত। তবে দেশের অর্থনীতির মূল কাণ্ডারি ‘ব্যাংক খাত’ করোনাভাইরাসের আগমনের আরো বহু আগে থেকেই বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতে পর্যুদস্ত হয়ে আছে। করোনার আগমনের আগেই ব্যাংক যেসব যাঁতাকলে পিষ্ট তার অন্যতম হল- এক লাফে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত। সব বেসরকারি ব্যাংকই যেখানে সাধারণ ঋণে ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ আদায় করে আসছিল, সেখানে গেল এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে ক্রেডিট কার্ডের ঋণ ব্যতীত সব ঋণের সুদ হার প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ব্যাংকের সুদ আয় ২৫ শতাংশের মত কমিয়ে দিয়েছে! অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) আশঙ্কা করছে- এতে করে প্রতিটি ব্যাংকের বার্ষিক আয় গড়ে ১৫০ কোটি টাকার মতো করে কমে যাবে৷ এ হিসাবে পুরো ব্যাংক খাতের আয় কমে যাবে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা।
দুশ্চিন্তার তালিকায় আরো যোগ হয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব। প্রত্যক্ষ প্রভাবের মধ্যে আছে, মার্চ মাসের স্থিতিভিত্তিক সকল ব্যাংক ঋণের এপ্রিল ও মে মাসের সুদ স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনেকেই এ ‘স্থগিত’ মানে ‘মওকুফ’ মনে করছেন, যা আসলে সঠিক নয়। এ স্থগিত সুদের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত দেবে। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, যদি শেষ পর্যন্ত এই সুদ মওকুফ করাই হয়, তাহলে এতে আরও প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার আয় বঞ্চিত হবে ব্যাংক খাত (সূত্র: এবিবি)।
সব মিলে চলতি বছরে ব্যাংক খাত প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার আয় বঞ্চিত হবে। এর পরবর্তীতে অর্থনীতির ওপর করোনাভাইরাসের বর্তমান ও ভবিষ্যতের অপরিমেয় অদৃশ্য ও পরোক্ষ প্রভাব বিবেচনা করলে এই ক্ষতির অংক কয়েকগুণ বেশি হবে নিশ্চয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একের পর এক এতগুলো চ্যালেঞ্জ আমাদের ব্যাংক খাত সইতে পারবে কিনা বা মোকাবেলা করতে পারবে কিনা। এরই মধ্যে আবার দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার নতুন চ্যালেঞ্জও ন্যস্ত হয়েছে ব্যাংকের স্কন্ধেই। নিজের বর্তমান আর্থিক ভিত টালমাটাল হওয়া সত্ত্বেও ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প, ব্যবসা ও কৃষিকে ঋণ আকারে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়ার বিশাল দায়িত্ব এখন ব্যাংককেই পালন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী পরপর পাঁচটি প্যাকেজের মাধ্যমে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক পরে এটিকে সম্প্রসারণ করে প্রায় এক লাখ কোটিতে নিয়ে গেছে। কিন্তু এ প্রণোদনার প্রায় পুরোটা অর্থই ছাড় করা হবে দেশের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এবং প্রাথমিকভাবে ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল হতেই এই অর্থায়ন করতে হবে। সরকার শুধু সুদ ভর্তুকি দিবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এই অর্থ পরবর্তীতে ব্যাংকগুলোকে পুনঃঅর্থায়ন করবে।
কিন্তু ব্যাংক সব ব্যবসা, শিল্প ও কৃষির প্রণোদনা বিতরণ করবে, ব্যাংকের নিজের প্রণোদনা কোথায়? ব্যাংকও তো ব্যবসায়িক খাত এবং অন্যান্য ব্যবসার মতই বর্তমানে বিপর্যস্ত খাত বটে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ব্যাংক খাত দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হলেও, ব্যাংক খাত নিজেও একটি ব্যবসায়িক খাত। তাকেও ব্যবসা করে টিকে থাকতে হচ্ছে, ব্যবসা করেই টিকে থাকতে হবে। অন্য ব্যবসার স্বার্থ ও অধিকার অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে ব্যাংকের স্বার্থকে যদি পেছন ফেলে দেয়া হয় কিংবা একেবারেই বিবেচনায় নেয়া না হয়, তাহলে ব্যাংক খাত হোঁচট খেতে বাধ্য; আর এর পরিণতি নিশ্চয় দেশের অন্যান্য ব্যবসার জন্য মঙ্গল নিয়ে আসবে না। সবচেয়ে বেশি শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, যেকোনো একটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ হলে, তা পুরো ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই হুমকি হিসেবে কাজ করবে। পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) ও বেসিক ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নের মাশুল পুরো অর্থবাজারকেই আজ অবধি দিয়ে যেতে হচ্ছে। তাই ব্যাংক খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার পাশাপাশি কিছুটা বাড়তি সুবিধা দিয়ে হলেও এর মান ধরে রাখতে হবে।
আমাদের ব্যাংক খাত এবং অন্যান্য শিল্প ও ব্যবসায়িক খাত পরস্পরের আয়না স্বরূপ। গার্মেন্টস খাত ভালো থাকলে যেমন দেশের ব্যাংক খাত ভালো থাকবে, তেমনিভাবে দেশের ব্যাংক খাত সুস্থ থাকলেই গার্মেন্টস খাত সুস্থ থাকবে। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী অবয়ব বহির্বিশ্বের ব্যাংকগুলোকে আমাদের দেশের ব্যাংকের সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের (আমদানি-রফতানি) ক্ষেত্রে অভয় দেয়। কিন্তু বর্তমানে করোনাভাইরাসের কষাঘাতে এবং সরকারি একাধিক সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোর আয় যদি ক্রমানুসারে কমতে থাকে, তাহলে একসময় তা ব্যাংকের মূলধন এবং সম্পদে টান ফেলবে। এতে করে ব্যাংকগুলোর রেটিং খারাপ হয়ে যাবে এবং বহির্বিশ্বের ব্যাংকগুলো আমাদের দেশের ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করতে রাজি হবে না। যেমন, তারা আমাদের এলসি'র কনফারমেশন দিবে না, আর দিলেও অনেক বেশি মাশুল চাইবে, যা আমাদের আমদানি-রফতানিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।
আচ্ছা মানলাম, ব্যাংক খাত হয়তো অন্যান্য খাতের মতো অতটা ক্ষতিগ্রস্ত খাত নয়। কিন্তু যে কোনো একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা খাতকে টিকে থাকতে হয় তার আয় এবং সম্পদের ওপর ভিত্তি করে। এখন ব্যাংক খাতের ঋণের সুদ হার ১৫ শতাংশ থেকে এক দৌড়ে ৯ শতাংশে নেমে আসার কারণে ব্যাংক খাত বিরাট অংকের আয়বঞ্চিত হবে। পাশাপাশি পরপর দুই মাসের ঋণের সুদ স্থগিত করার কারণে ব্যাংকের আয়ে সুনামির ধাক্কা লাগবে। কারণ, এই দুই মাসের ঋণের সুদ আয় খাতে নিতে না পারলেও, আমানতকারিদের সুদ কিন্তু ব্যাংককে পরিশোধ করতেই হবে। ফলে উচ্চ সুদে আমানত নেয়া ছোট ব্যাংকগুলো মে মাস শেষেই লোকসানে চলে যেতে পারে। তাছাড়া ঋণের সুদ এক লাফে কমে গেলেও আমানতের সুদ হার কিন্তু সেভাবে কমেনি। নতুন বা নবায়নকৃত এফডিআর-এর ক্ষেত্রে হয়ত ৬ শতাংশের সুদ হার কার্যকর করা যাচ্ছে, কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে ১০ থেকে ১২ শতাংশে নেয়া ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি ডাবল বেনিফিট স্কিম, ট্রিপল বেনিফিট স্কিম, মাসিক আয় প্রকল্প এবং বিভিন্ন মাসিক সঞ্চয় প্রকল্পের সুদ তো আর ব্যাংক কমাতে পারছে না। তাছাড়া এখনো অনেক ব্যাংক স্কিম আমানত নিচ্ছে ৮-৯ শতাংশ সুদে। বিনা সুদের চলতি ও স্বল্প সুদের সঞ্চয়ী হিসাবে খুব একটা টাকা রাখেন না গ্রাহকরা। তাই সব ঋণের সুদ নয় শতাংশ হয়ে যাওয়ার পরও আমানতের সুদ ৬ শতাংশে নামানো সম্ভব হবে না।
এতে করে ঋণ ও আমানতের সুদ হারের পার্থক্য (স্প্রেড) তিন শতাংশের নিচে নেমে আসবে। স্প্রেডের এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বিকল্প হচ্ছে ব্যাংকের কমিশন আয়। কিন্তু এই মুহূর্তে কমিশন আয়ও প্রায় বন্ধ। ফলশ্রুতিতে দুই-তিন শতাংশের স্প্রেড দিয়ে পরিচালন খরচ মিটিয়ে, ঋণের প্রভিশন সংরক্ষণের পর সরকারি কর এবং শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড পরিশোধের জন্য ব্যাংকের কাছে তেমন মুনাফা উদ্বৃত্ত থাকবে না। ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ তুলে নিবে এবং সরকারও ব্যাংকের করবঞ্চিত হয়ে বড় অংকের রাজস্ব হারাবে।
অন্যদিকে ডজনখানেক ব্যাংক পর্যাপ্ত পরিচালন মুনাফা করতে পারেনি বলে এরই মধ্যে প্রভিশন ঘাটতিতে আছে। চলতি ত্রৈমাসিক শেষে এ সংখ্যা দীর্ঘ হবে নিশ্চিত। তাই ব্যাংকের খরচের খাতগুলোতে ছাড় না দিয়ে শুধু আয়ের খাতে লাগাম টেনে ধরাটা ব্যাংকের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে নিশ্চয়। কারণ, ব্যাংক এবং অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্যান্য কোম্পানির মত নিজেদের আয় ভোগের পূর্ণ স্বাধীনতা পায় না। কর দেয়া ছাড়াও ব্যাংক এবং অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আয়ের একটি বড় অংশই ঋণের প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়, যা অন্যান্য কোম্পানিকে করতে হয় না। তাই আপৎকালীন ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের হারে কিছুটা উদারনীতিতে যেতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা সাপেক্ষে কৃষি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন শিথিল বা বাতিল করে অন্যান্য ঋণের প্রভিশনের হার বর্তমান হারের অর্ধেক করা যায় কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি আগামী তিন বছরের জন্য ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার বিপরীতে প্রদেয় করপোরেট করের হারও ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।
ব্যাংকের আয়ের ওপর যেসব বিষয়গুলো ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে তাদের অন্যতম হচ্ছে খেলাপি ঋণ। ব্যাংকের দেয়া ঋণ গড়ে প্রায় ১০ শতাংশই খেলাপি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো যে ঋণ নেয়, সে অর্থ এবং আমানতকারীদের আমানত ব্যাংকের ইচ্ছেমতো পরিশোধ করার বা অপরিশোধিত রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবহার করতে পারলেও, গ্রাহকের আমানত- সেটা মেয়াদি হলেও তা চাহিবামাত্রই লাভসমেত গ্রাহককে ফেরত দিতে হয়। তাই ব্যাংকের আয়ের উপর খেলাপি ঋণের প্রভাব বিবেচনা করে ব্যাংক রেটেও বড়সড় ছাড় দিতে হবে।
ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা নিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক উদারতা অবলম্বন করেছে। জুন পর্যন্ত কোনো ঋণকে শ্রেণিকৃত না করার নির্দেশ দিয়েছে। এ সময়সীমা বর্ধিত করে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা আছে। অথবা, ঋণ শ্রেণিকরণের বর্তমান সময়সীমা বাড়ানোও হতে পারে। এতে করে ব্যাংকের অন্তর্মুখী অর্থের প্রবাহ কমে যাবে, যা কর্মীদের বেতন ও প্রশাসনিক খরচ মেটানো ব্যাংকের পক্ষে কঠিন করে তুলবে। তাই এই বছর সন্দেহজনক (ডাউটফুল) মান পর্যন্ত ঋণের সুদ আয় খাতে নেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।
দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাত এবং উপখাত ভালো থাকলে ব্যাংক খাত ভালো থাকবে। তাই স্বাভাবিকভাবেই দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাত এবং উপখাতে গতি ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাংকের আয় সাময়িক বিসর্জন দেয়াটা যৌক্তিক। তবে সে বিসর্জন যদি হয় রক্ত বিসর্জনের পর্যায়ে, তাহলে ব্যাংকগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাবে। আর ব্যাংক সংকটে পড়া মানে হচ্ছে, ব্যাংকাররা দুশ্চিন্তায় থাকা, আর ব্যাংকাররা দুশ্চিন্তায় থাকলে তারা অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা করবে কীভাবে? তাই সরকারের উচিত হবে, অন্যান্য শিল্প, ব্যবসায়িক খাত এবং কৃষিকে যেভাবে প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে ব্যাংক খাতকেও সরকারি প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা। এমনিতেই ঋণের সুদ এক লাফে ৯ শতাংশে নামিয়ে দেশের শিল্প এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অনেক বড় সুবিধা দেয়া হয়েছে। এতে করে ব্যাংকের বিরাট অঙ্কের আয় বাধাগ্রস্ত হবে। তার ওপর আবার দুই মাসের সুদ স্থগিত করা হয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত এই সুদ যদি মওকুফই করা হয়, তাহলে এই দুই মাসের সুদ সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংককে ভর্তুকি দিলে ব্যাংকের পক্ষে কিছুটা ক্ষতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে।
সরকার ঘোষিত প্রণোদনার প্রায় পুরোটাই ঋণ অর্থাৎ ব্যাংক নির্ভরশীল। যদিও সুদ ভর্তুকি দিবে সরকার; কিন্তু ঋণযজ্ঞ- গ্রাহক বাছাই, ঋণ প্রস্তাব প্রেরণ, অনুমোদন, ডকুমেন্টেশন, বিতরণ দায়িত্ব, আদায় ঝুঁকি এবং দায় পুরোটাই ব্যাংকের নিজের ওপর বর্তাবে। তাই আগামী কয়েক মাস প্রণোদনার ঋণসেবা দিতে গিয়ে ব্যাংক অন্য কোনো ব্যবসায় তাদের কর্মীদের খাটাতে পারবে না, যা ব্যাংকের অন্যান্য আয় কমিয়ে দিবে। তাছাড়া এ ঋণের অর্থ দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুরনো-নতুন সব ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ছাড় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যবসায়ী উভয় মহল থেকেই ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকের কাছ থেকে তালিকা নিয়ে চলমান ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিক সুদ ভর্তুকি দিয়ে, নতুন ও বর্ধিত ঋণের জন্য ঋণ প্রস্তাব পাঠানো সাপেক্ষে সুদ ভর্তুকি দিলেও ব্যাংকারদের চাপ কিছুটা কমত।
অন্যদিকে প্রণোদনার কিছু ঋণে ব্যাংকের প্রফিট মার্জিনও তেমন নেই। রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনায় ব্যাংক কেবল ২ শতাংশের সার্ভিস চার্জ আদায় করতে পারবে। বিতরণকৃত এসব ঋণ খেলাপি হলে নামমাত্র লাভের এই ২ শতাংশও যাবে, মূলধনও যাবে। তাছাড়া স্বল্প সময়ে স্বাভাবিক ঋণ নিয়মাচারের মানদণ্ডে ফেলে প্রণোদনার ঋণের অর্থ ছাড় করা ব্যাংকের জন্য আসলেই দুরূহ ব্যাপার। কিন্তু এও সত্য যে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অর্থ ছাড় করারও বিকল্প নেই। পাশাপাশি প্রণোদনা প্যাকেজের অধীনে ছাড় করা ঋণের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট- এক্ষেত্রে ব্যাংকের খেলাপির হার স্বাভাবিক খেলাপি হারের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ হবে নিশ্চিত। আর খেলাপি ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক (ব্যাড অ্যান্ড লস)’ মানে শ্রেণিকৃত হবে। কিন্তু এই অনাদায়ী ঋণের সমস্ত ঝুঁকি এবং দায় ব্যাংকের! তবে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করলে এটা একেবারে স্পষ্ট যে, এ ঋণ ব্যাংকের কোনো একক সিদ্ধান্তে দেয়া হচ্ছে না। তাই এই ঋণের খেলাপির পুরো দায় এককভাবে ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দেয়া উচিত হবে না। কিছুটা দায় বণিক সংগঠন এবং সরকারকেও নেয়া উচিত।
তাই প্রণোদনার এই ঋণে বিভিন্ন বণিক সংগঠন যেমন, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, এফবিসিসিআইয়ের গ্যারান্টি গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি সরকার যদি এই মর্মে ব্যাংকগুলোকে আশ্বস্ত করে যে, প্রণোদনার আওতায় ছাড় করা অর্থের ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক’ মানে শ্রেণিকৃত ঋণের অর্ধেক সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে, তাহলে আমার মনে হয় এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকগুলো আরও সক্রিয় হবে।
সর্বোপরি, অর্থনীতির ত্রাতা হিসেবে ডুবন্ত অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে গিয়ে ব্যাংক নিজেও যদি ডুবে যায়, তাহলে ত্রাতা এবং বিপদগ্রস্ত উভয়কেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। এসব দুর্ভাবনা ব্যাংকের ঋণ প্রবাহকে শ্লথ করে দিতে পারে। তাই এই আপৎকালে ব্যাংক খাত-সহায়ক কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ব্যাংকের দুর্ভাবনা কিছুটা হলেও দূর হবে এবং অর্থনীতি উদ্ধারের কার্যক্রমে ব্যাংকের অংশগ্রহণ গতি পাবে।
লেখক: মোশারফ হোসেন, প্রিন্সিপাল অফিসার ও ব্যবস্থাপক
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, পাকুন্দিয়া শাখা, কিশোরগঞ্জ
ইমেইল: mosharafmau.200117@gmail.com










