‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’—হালের একটা জনপ্রিয় প্রবচন।

ওদিকে আবার আছে এক পুরনো লোকপ্রবাদও: ‘যতক্ষণ বেঁচে আছো, কথা বলো।’ কিন্তু কথা বললে তো সেই বিপদ, প্রায়ই চাকরি থাকে না। একদিকে জিহ্বার ডগায় কথারা হাঁসফাঁস করছে, অন্যদিকে চাকরি যাওয়ার ভয়—এমন টানাটানিতে মানুষ করে কী?

এ নিয়ে একটা পুরনো গল্প। রোমে তখন সম্রাট অগাস্টাসের কঠোর শাসন, ফলে কল্লাখানা ঠিকঠাক রেখে পেটের ভেতর যা গুড়গুড় করছে তা প্রকাশ করতে ওভিদ (৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-১৮ খ্রিস্টাব্দ) গ্রিক পুরাণের এ গল্পটা নিজের মতো করে বানিয়েছিলেন—লেখকের চেতনা আর রাষ্ট্রের হুমকির মাঝেকার দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলতে।

আরাখনি নামে এশিয়া মাইনরের এক তাঁতির মেয়ে নাকি দেবতাদের চেয়ে সুন্দর নকশি কাপড় বোনে! আরাখনির মুখেরও লাগাম ছিল না, মনের কথা স্পষ্ট করেই বলত: কলুষিত মনের দেবতাদের চেয়ে আরাখনির শিল্পকর্মে অনেক বেশি সত্যি আর সৌন্দর্য আছে।

কথা সত্যি বা মিথ্যা হোক, দেবতাকুল ক্ষুব্ধ হলো। তাদের মাঝেও সবচেয়ে বেশি রেগে গেলেন এথেন্স নগরীর মা অ্যাথেনা, বিশেষ করে জ্ঞান আর সৌন্দর্যবোধের জন্যই ভক্তকুলে তার দেমাগ। ‘কি, আরাখনির এত বড় সাহস!’ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন তিনি, ‘আরাখনি যা বলছে তা যদি প্রমাণ করতে পারে তো এই দেবপ্রভা ত্যাগ করব, ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে আমজনতার মতো থাকব। না পারলে আরাখনির শাস্তি হবে।’

সতর্ক আরেক দেব-উপদেষ্টা তটস্থ হয়ে বললেন, ‘অমন ভীষণ প্রতিজ্ঞা কখনো করবেন না।’

অ্যাথেনা ফিক করে হেসে বললেন, ‘আরাখনির প্রমাণ আমি মানলে তো!’

তারপর এক সূচিকর্মের প্রতিযোগিতায় দেবী অ্যাথেনা বুনলেন দেবতাদের মহত্ত্ব, কীর্তি, দেব প্রকল্পে পৃথিবীজুড়ে কত রকম পুষ্টিকর ফসল, চোখ ধাঁধানো জৌলুস আর উন্নয়নের জোয়ার কত বৃদ্ধি পেয়েছে...। স্বর্গীয় পটে ঐশ্বরিক সুতায় অনুপম তুলির মতো আঙুলে অ্যাথেনা বুনে গেলেন তার সূচিকর্ম। যেই দেখল, ধন্য ধন্য করল।

ওদিকে আরাখনি আঁকল নিতান্ত নৈমিত্তিক চিত্র। আঁকল অপুষ্ট মানুষের ছবি, আঁকল দেবতাদের লুণ্ঠনের ছবি, নারীদের অপহরণের দৃশ্য, দেবতাদের মিথ্যাচার আর ভণ্ডামির ছবি। আঁকল সাধারণ মানুষকে তারা যা বলে, ঠিক তার বিপরীতটাই যে তারা নিজেরা করে, তার বিবরণ। তার বিষয় মানবীয়, উপকরণও মানবিক।

সবাই বুঝল কার শিল্পে বেশি সত্যি আছে, সৌন্দর্য আছে। কিন্তু অ্যাথেনা বুঝলে তো! মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য তাই আরাখনিরই শাস্তি হলো, তাকে ফাঁসিতে ঝুলে মরতে হলো। আর পরজন্মে সে হলো ঊর্ণনাভ—পেট থেকে সুতার জাল বুনে সে বিগত জন্মের অনন্য নৈপুণ্যের ব্যর্থ স্মৃতিচারণ করত।

ওভিদ এই গল্প বলে অগাস্টাসের কী সমালোচনা করতে চাইছিলেন, তা নিশ্চিত করে জানি না—হয়তো বোঝাতে চাইছিলেন যে শিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা সূচিশিল্পীকে পরিণত করে নিছক মাকড়সায়, চিন্তাশীল অধ্যাপকরা পরিণত হন পতঙ্গজীবীতে, এতে সমাজেরই সামগ্রিক ক্ষতি।

ওভিদের কপালে খারাপি ছিল, চাকরিটা কিন্তু হারালেন তিনি, তখনকার দিনে মৃত্যুদণ্ডের পরই যা ছিল