দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি সমাবর্তনেই ডক্টরেট উপাধি দেয়া হচ্ছে। চলতি বছর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির ৯৩তম সমাবর্তনে ৯৭ জনকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া হয়। এসব ডিগ্রির বেশির ভাগই কলা অনুষদের, উন্নত দেশগুলোর মতো বিজ্ঞান বা প্রকৌশল বিদ্যায় ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়ার সংখ্যা খুব কম। এর কারণ আর্থিক বরাদ্দ এবং আবাসনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না থাকা, এমনকি পিএইচডির জন্য যে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন হয়, তার জন্য চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে গবেষণা করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে চাকরির পাশাপাশি গবেষণা করা হয়। এর ফলে গবেষণার কাঙ্ক্ষিত ফল ফুটে ওঠে না।

কিন্তু তবু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একাংশ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করছে। এক্ষেত্রে জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু থাকে আর নামের আগে ড. উপাধি বসানোর ইচ্ছা কতটা থাকে সেটি বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের পিএইচডি করার অনুমতি দেয়া হয়, এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব শিক্ষার্থীদের এমফিল ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা না থাকলেও কমপক্ষে দুই বছর চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত না থাকলে এমফিল করার প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে হলে এমফিলের প্রয়োজন হয়।

এমফিলের মাধ্যমে গবেষণা শুরু হয়, কিন্তু এমফিলের তুলনায় পিএইচডির গবেষণাকর্ম আরো সমৃদ্ধ বলেই মূল্যায়ন করা হয়।

পিএইচডি বা ডক্টর অব ফিলোসফির প্রকৃত চাহিদা হচ্ছে সাধারণত নতুন কিছু গবেষণা বা উদ্ভাবন করা যা আগে কখনো হয়নি। সাধারণত এ চাহিদা পূরণ না করলে ডিগ্রিটি অর্জন করা যায় না। পিএইচডি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সর্বোচ্চ স্তরের গবেষণা ডিগ্রি কোর্স, যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কাজের জন্য প্রদত্ত সর্বোচ্চ ডিগ্রি।

মূলত পিএইচডি ডিগ্রি ধারণ করার প্রথাটি কীভাবে শুরু হলো? ইংরেজি Doctor (ডক্টর) শব্দটি মূলত ল্যাটিন ভাষা থেকে আগত একটি শব্দ। এর প্রকৃত অর্থ হলো ‘শিক্ষক’ বা ‘প্রশিক্ষক’। মধ্যযুগের দিকে, ইউরোপে যারা ল্যাটিন ভাষা পড়াত, তাদের একটি লাইসেন্স লাগত, যার নাম ছিল Licentia Docendi, এবং এ লাইসেন্সিয়া ডোসেন্ডির ইংরেজি অনুবাদ হলো License to Teach, অর্থাৎ শেখানোর লাইসেন্স। এ লাইসেন্সটিকেই ডাকা হতো Doctoratus, যার ইংরেজি হলো Doctorate এবং এ লাইসেন্স যার থাকত, তাকে বলা হতো ডক্টর, এবং ডক্টর মানে ধরা হতো শিক্ষক। তখনকার দিনে চার্চের পাদ্রিরা ডক্টর ছিলেন, যারা বাইবেল পড়াতেন ও ব্যাখ্যা করতেন। চার্চের অনুমতি ছাড়া কেউ ডক্টরেট বা শেখানোর লাইসেন্স পেতেন না, কিন্তু খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের পোপ ১২১৩ সালে ঘোষণা করেন যে, আজ থেকে চার্চের পাশাপাশি ফ্রান্সের প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ও শেখানোর লাইসেন্স বা ডক্টরেট দিতে পারবে। এ ঘোষণার আগেও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাথলিক চার্চের অনুমতি নিয়ে কিছু ছাত্রকে ডক্টরেট দিয়েছে। কিথ এলান তার ‘Changing doctoral degrees: an international perspective’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, পৃথিবীর প্রথম ডক্টরেটটি ১১৫০ সালের দিকে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে দেয়া হয়।

আজ থেকে হাজার বছর আগে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের এ ডক্টরেটের মতো আরেকটি ডক্টরেট মুসলিমদেরও ছিল। এ ডিগ্রির নাম ছিল ইযাজাহ। ডক্টরেট দেয়া হতো খ্রিস্টানদের চার্চ থেকে, আর ইযাজাহ দেয়া হতো মুসলিমদের মাদ্রাসা থেকে। দুটিরই অর্থ ছিল শেখানোর লাইসেন্স। মোদ্দাকথা যাদের ডক্টরেট ও ইযাজাহ আছে, তারাই সমাজে শিক্ষকতা করতে পারতেন।

১৭ শতকের দিকে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ডক্টরেট বা শিক্ষকতার লাইসেন্সের একটি নাম দিলো ‘Doctorate of Philosophy’ বা PhD (Philosophiae Doctor), এবং এই ‘Philosophy’ শব্দের অর্থ দর্শন ধরে নেয়া হয়, কিন্তু এ ফিলোসফি বলতে দর্শন বোঝানো হয়নি। ডক্টরেট অব ফিলোসফিতে যে ফিলোসফি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা মূলত গ্রিক ভাষায় শব্দটির মূল অর্থকে নির্দেশ করে। অর্থটি হলো: Love of Wisdom বা জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা। অর্থবিত্ত, ক্ষমতা ও পদপদবী নয়, যে ব্যক্তির জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে, সে ব্যক্তিই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে পারবেন।

বণিক বার্তায় ২০২২ সালের ২৬ মার্চ প্রকাশিত প্রধান সংবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে উঠে আসে যে বিশ্ববিদ্যালয়টির পিএইচডি গবেষণার শীর্ষ জোগানদাতা হিসেবে রয়েছে ইসলামিক স্টাডিজ, আরবি এবং বাংলা। ২০১০-১১ থেকে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে এক দশকে সবচেয়ে বেশি পিএইচডি ডিগ্রি ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পিএইচডি দেয়া হয়েছে ৮১ জন গবেষককে, যা এক দশকে বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে দেয়া পিএইচডি ডিগ্রির ১০ শতাংশের বেশি। তার পরই রয়েছে বাংলা এবং আরবি বিভাগ।

প্রশ্ন হচ্ছে এসব ডিগ্রির ফলে জ্ঞানের বিস্তার কতটুকু হয়েছে সেদিকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে নাকি শুধু ডক্টরেট ডিগ্রিধারীদের সংখ্যাই বাড়ছে। এই যে ইসলামিক স্টাডিজে এত পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে, এক্ষেত্রে নতুন জ্ঞানের উন্মেষ কি আদৌ হচ্ছে? না অতীতের ইতিহাস বর্ণনা করে তার সমকালীন সময়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রয়োগের প্রচলিত ব্যাখ্যা উপস্থাপনার মাধ্যমেই পিএইচডি অর্জিত হচ্ছে? এক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞানের সূত্রে নতুন কোনো জ্ঞানের বিস্তার ঘটছে কি?

বস্তুত নিবিড় গবেষণার ফলে নতুন জ্ঞানের বিকাশ ঘটবে এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু গভীর মনোসংযোগের মাধ্যমে গবেষণার সুযোগ কি আদৌ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পাওয়া যায়? বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পিএইচডি শিক্ষার জন্য গেলে শিক্ষা ছুটি পাওয়া যাবে, কিন্তু চাকরিরত অবস্থায় দেশের কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করলে ছুটি মিলবে না, এক্ষেত্রে বরং চাকরির পাশাপাশি গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। এভাবে তো আসলে প্রকৃত গবেষণা হয় না। আর নতুন জ্ঞান, সেটা অনেক দূরের বিষয়।

এছাড়া গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয় না, এ অভিযোগও পুরনো। গবেষণার পেছনে অর্থ বড় একটা চাহিদা পূরণ করে, যে কারণে বিজ্ঞান অনুষদের চেয়ে কলা অনুষদে গবেষণা বেশি হয়। এদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পিএইচডির মাধ্যমে জ্ঞানের বিস্তারের চেয়ে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ছে এমন অভিযোগের মধ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। সম্প্রতি নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. আতিকুল ইসলাম একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় এ দাবি জানান। অবশ্য তিনি এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত মানার বিষয়টিও জানিয়েছেন। বস্তুত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রির মান নিয়েই যেখানে প্রশ্ন তোলা যাচ্ছে, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পিএইচডি গবেষণার অনুমতি দেয়া কতটা যৌক্তিক হবে সেটা বিবেচনা করতে হবে। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে ভালো করছে, সেদিকে আলোকপাত করে দু-একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরীক্ষামূলক পিএইচডি গবেষণার সুযোগ দেয়া যেতে পারে।

মোদ্দাকথা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি গবেষণা বিশ্বমানের হবে এটিই আমাদের প্রত্যাশা। এজন্য গবেষণার ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। অতীতে জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির কাজ নিয়ে গবেষণা করলে তাতে কিন্তু নতুন জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে না, এর মাধ্যমে বড়জোর সে ব্যক্তির কাজের প্রতি সম্মান জানানো যায়। এটির অবশ্যই প্রয়োজন আছে। তবে কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোতেও মানসম্মত পিএইচডি গবেষণা বৃদ্ধি পাওয়া উচিত। এক্ষেত্রে ডিগ্রিগুলোর অভিসন্দর্ভের মাধ্যমে যদি মানব সভ্যতার বিকাশে নতুন চিন্তার উদ্রেককারী জ্ঞানের উদ্ভব হয়, তাহলেই এসব ডক্টরেট ডিগ্রি সার্থক হবে। 

তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক