বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে মাতৃমূর্তি একটি গভীর ও প্রভাবশালী প্রপঞ্চ হিসেবে বিবেচিত। জাতিরাষ্ট্রকে ‘মা’ হিসেবে কল্পনা করা এবং সেই মাতৃসত্তার প্রতি আনুগত্য ও আত্মত্যাগের ধারণা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক চেতনায় সুদীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি মাতৃমূর্তির প্রতীকী শক্তিকে ধারণ করতে সক্ষম হন, তবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব হয়ে উঠতে পারে অকল্পনীয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় অর্জন এ মাতৃমূর্তি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে বেগম খালেদা জিয়ার যে অবদান, তার তুলনায় তার বৈষয়িক অর্জন নিতান্তই নগণ্য। মুক্তিযুদ্ধকালে তার বন্দিত্ব থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম তার নামটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্থায়ী করে রেখেছে। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংজ্ঞাকে সার্থকতা দেয়ার জন্য যে ত্যাগ, বলিষ্ঠতা, আত্মনিষ্ঠতার আবশ্যকীয়তা রয়েছে, তার বাস্তব প্রয়োগ স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে খুব অল্প কিছু নেতৃত্বের মাঝেই প্রত্যক্ষ করা যায়। বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরলতম নেতৃত্বের প্রতীক। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গেঁথে দেয়া বুনিয়াদের ওপর একটি সার্বভৌম মর্যাদাসম্পন্ন প্রগতিমুখি ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। শহীদ জিয়া যদি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’- এর সমার্থক হন, তবে বেগম জিয়া তার সার্থকতা। অন্যদিকে প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেখানে অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি ও তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রবণতা লক্ষণীয়, সেখানে তার 'দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও' আহ্বান একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে তার সেই আহ্বান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ অবধি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধিপত্যবাদি শক্তির দোসরদের বিপরীতে সগর্বে মাথা উঁচু করে ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া উচ্চারণ করেছিলেন, ;ওদের হাতে গোলামীর জিঞ্জির; আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা!' এ ভয়ডরহীন আত্মমর্যাদাবোধই তাকে রাজনীতির উচ্চাসনে আসীন করেছিল। গণতান্ত্রিক কাঠামো যখন গভীর সংকটে নিপতিত, তখনও রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে তিনি আশার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়ার পরও, আধিপত্যবাদি শক্তির জাহান্নামের আগুনসদৃশ লালচোখের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এদেশের মানুষ বিশ্বাস করতো, ‘নাহ! এখনো একজন খালেদা জিয়া আছেন আশার আলো হয়ে। তিনি যতদিন আছেন, মুক্তিকামী জনতার স্বপ্নের জাল বুনতে বাঁধা নেই।’ মিথ্যা ও প্রহসনের মামলায় কারাবরণের আগের দিন ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে বেগম খালেদা জিয়া এক বার্তায় বলেন, ‘কম বয়সে স্বামীকে হারিয়েছি। দেশের জন্য জিয়াউর রহমান জীবন দিয়েছেন। কারাগারে থাকতে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় একটি সন্তান হারিয়েছি। আরেকটি সন্তান নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে দূরদেশে এখনো চিকিৎসাধীন। আমার স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না।’

আমাদেরকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এভাবেই যিনি আপস না করতে শিখিয়েছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই প্রথম এবং একমাত্র জননন্দিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে নক্ষত্রদ্যুতি ছড়ানো এ নেত্রীর দেশপ্রেম, আধিপত্যবাদ বিরোধী দৃঢ় অবস্থান আর গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে। রাজনৈতিকভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ব্যর্থ শক্তিটি তাই এমন কোনো পন্থা নেই, যা ব্যবহার করে তাকে আঘাত করেনি। গৃহহীন করেছে, সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, অন্যায় অপবাদ দিয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত তার আদর্শ-সন্তানদের থেকে পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করেছে। কিন্তু যে ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ আন্দোলনের ডাক তিনি দিয়েছিলেন, তাকে স্তব্ধ করা যায়নি। এদেশের প্রতিটি গৃহবধূ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মনের গহীনে তিনি এক দৃঢ় জায়গা করে নিয়েছিলেন আপন মহিমায়। তার রাজনৈতিক আদর্শ ও আন্দোলনের আবেদন সাধারণ মানুষের হৃদয় থেকে অপসারিত হয়নি।

বেগম খালেদা জিয়া তার জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অতিবাহিত করেছেন। দীর্ঘ পথচলায় অনেক উত্থান-পতন সত্ত্বেও তিনি প্রতিবার ফিরে এসেছেন দৃঢ় মনোবল নিয়ে, মাথা উঁচু করে। এদেশের আপামর জনতাও তাকে বরণ করেছে বুক ভরা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়। পতিত স্বৈরাচার বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার এ বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলার জন্য বারবার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু জনগণের নেত্রীকে কখনোই তাদের মনের মণিকোঠা থেকে মুছে ফেলা যায়নি। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এ সম্পর্কের সামাজিক বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তোলে। মানিক মিঞা এভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত এ জানাজা যে বার্তা দিয়ে গেল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দশকের পর দশক জুড়ে অনুরণিত হতে থাকবে।

বেগম জিয়ার জানাজায় উপস্থিত জনসমুদ্রকে কোনো সংখ্যায় সীমিত করা যাবে না। এটি একটি অনুভূতি এবং বাংলাদেশের রাজনীতির এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ভবিষ্যৎ ইতিহাসে এ জানাজাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের ‘হৃদয়কেন্দ্র’ হিসেবেই অধ্যায়ন করা হবে। সংখ্যার হিসেব এখানে খুবই গৌণ। ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখের বিকেল তিনটা বেজে তিন মিনিট থেকে তিনটা বেজে পাঁচ মিনিটের মধ্যবর্তী এ দুই মিনিটে অনেক প্রশ্নের জট খুলে গেছে। এ জানাজা আমাদের জানিয়ে গেল, ক্ষমতা কখনোই রাষ্ট্রের কাঠামোবদ্ধ প্রবল শক্তির মাঝে বাস করে না; বরং ক্ষমতার আসল বাসস্থান মানুষের অনুভূতিতে, মানুষের ন্যায়-অন্যায় বিবেচনায়। যে এক শহর জানাজার সাক্ষী আমরা হলাম, তা আমাদেরকে জানান দেয় গণমানুষের সুপ্ত অনুভূতির দৃশ্যমান রূপ। এটি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়- দমন-পীড়নের মাধ্যমে মানুষের কণ্ঠকে রোধ করা যায় সত্য; কিন্তু অনুভূতির ওপর কোনো দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।

সবকিছু মিলিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক উপস্থিতি আমাদেরকে এ মৌলিক সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দেয় যে— রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস কোনো প্রশাসনিক কাঠামো বা বলপ্রয়োগ নয়; বরং মানুষের অনুভূতি, বিশ্বাস ও নৈতিক বিচারবোধ। মাতৃমূর্তির শক্তিকে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে তিনি যে রাজনৈতিক ঐতিহ্য নির্মাণ করেছেন, তা ব্যক্তি-নির্যাতন, রাজনৈতিক দমন কিংবা ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টাতেও মুছে যায়নি। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর এক শহর জানাজা হচ্ছে সেই অমোঘ প্রমাণ যে, এটি কোনো দলের শক্তির পরিমাপ নয়; বরং জনগণের সুপ্ত অনুভূতির প্রকাশ, যেখানে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে— যিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, ক্ষমতা তাকে হারাতে পারলেও ইতিহাস থেকে তাকে কখনোই মুছে ফেলা যায় না। বেগম খালেদা জিয়া তাই কেবল একটি রাজনৈতিক নাম নন; তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, আপসহীনতা এবং জনগণ নির্ভর রাজনীতির এক জীবন্ত দিকনির্দেশক।

ফারহান আরিফ: রিসার্স অ্যাসোসিয়েট, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্স সেন্টার (বিএনআরসি)