বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ পূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার সুপারিশ পেয়েছে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে জাতির জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় অর্জন। কিন্তু এ অর্জন যেমন আনন্দের, তেমনই অনেক প্রতিবন্ধকতা ও প্রত্যাশা নিয়ে আসছে। এ মুহূর্তে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাত গড়ে তুলতে হবে, আর অর্থনীতির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে বীমা শিল্প। কারণ বীমা শিল্পই পারে অর্থনৈতিক সুরক্ষা দিতে। দেশের সামগ্রিক ও টেকসই উন্নয়নে বীমা খাতের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিরসনের ক্ষেত্রে বীমা খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশে বীমা খাতের পরিসর সীমিত। বীমা খাতকে যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য এরই মধ্যে সরকার বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তদারকি ও নজরদারি আরো কার্যকরভাবে পালন করা প্রয়োজন। এছাড়া বীমা খাত তত্ত্বাবধানে সক্ষমতা অর্জন ও সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য অধিকতর উপযোগী নীতি ও পদ্ধতি প্রবর্তন করা প্রয়োজন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পেশা হিসেবে ১৯৬০ সালের ১ মার্চ একটি বীমা কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন। সে হিসেবেই সরকার ১ মার্চকে জাতীয় বীমা দিবস হিসেবে পালন করছে। জাতীয় বীমা দিবসের উদ্বোধন উপলক্ষে দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী গ্রাহকদের অর্থ পাওয়া নিশ্চিত, হয়রানি রোধ ও বীমা খাতের সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ব্যক্তিগত আগ্রহে তিনি বিভিন্ন সময়ে বীমা কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকবান্ধব নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বছরের পর বছর ধরে কিস্তি পরিশোধ করে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যেখানে গ্রাহকরা তাদের পাওনা আদায় করতে পারছেন না, সেখানে নানা কারণে বন্ধ বা অনিয়মিত বীমা গ্রাহকদের জমাকৃত টাকা ফেরত পাওয়ার আইনগত নিশ্চয়তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এক শ্রেণীর বীমা প্রতিনিধি সাধারণ মানুষকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে বীমা পলিসি গ্রহণের পর তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এভাবেই দেশের সম্ভাবনাময় বীমা খাত সাধারণ মানুষের কাছে আস্থাহীনতার সংকটে পড়েছে। অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষেত্রে জীবন বীমা এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যে সাধারণ বীমা একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত খাত। এ খাতের স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু বিকাশ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বীমা কোম্পানিগুলোর অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় গ্রাহক হয়রানি বন্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সংস্থা আইডিআরএ, দুদক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সব অভিযোগের অনুপুঙ্খ তদন্ত নিশ্চিত করে দোষীদের শাস্তি এবং গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

গত ৫১ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে এগিয়েছে বীমা শিল্পের অগ্রগতি সেভাবে লক্ষণীয় নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে সাধারণ ও জীবন বীমা খাতে ৭৮টি কোম্পানি রয়েছে। তার মধ্যে সরকারি দুটি সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা করপোরেশন এবং ব্যক্তি খাতে ৪৬টি সাধারণ ও ৩২টি জীবন বীমা কোম্পানি রয়েছে। এখনো অনেক বীমা কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। অতএব বাংলাদেশের বীমা শিল্প এক কথায় ক্ষুদ্র পরিসরের। বাংলাদেশের বীমা শিল্প বৈশ্বিক বীমাবাজারের তুলনায় খুবই নগণ্য। পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান সুইস রি প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ২০১৯’-এর প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশের বীমা খাতে জিডিপি অনুপাতে বীমা প্রিমিয়াম প্রায় দশমিক ৫ শতাংশ। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনীতির অন্যান্য দেশের তুলনায় যা খুবই কম, যেখানে ভারতে ৪ শতাংশ, শ্রীলংকায় ১ দশমিক ২৫, ভিয়েতনামে ২ দশমিক ২৫, ইন্দোনেশিয়ায় ২ ও ফিলিপাইনে ১ দশমিক ৭২ শতাংশ। বাংলাদেশে মাথাপিছু বীমা ব্যয় এখনো ১০ মার্কিন ডলারের নিচে। প্রায় সাড়ে ষোল কোটি জনসংখ্যার তুলনায় যা খুবই নগণ্য, আবার একই সঙ্গে অনেক সম্ভাবনার। কারণ এখনো বৃহৎ জনগোষ্ঠী বীমা আওতার বাইরে।

জীবন বীমার গ্রাহকসংখ্যা সেভাবে বৃদ্ধি না পাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশের জনগণের বীমার প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা। বীমা এজেন্টদের অদক্ষতার কারণে বীমা সম্পর্কে দেশের জনসাধারণের কাছে একটি নেতিবাচক চিত্র তৈরি হয়েছে। এটি বীমা ব্যবসার সুযোগ সংকুচিত করে। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ যদি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারত তাহলে জিডিপিতে এ শিল্পের উল্লেখযোগ্য অবদান থাকত। বীমা সম্পর্কে জনসাধারণের দুর্বল ভাবমূর্তি প্রধানত এ খাতের সম্প্রসারণ না হওয়ার জন্য দায়ী। জাতীয় বীমা দিবস, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে বীমা মেলা সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা দূর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত পদক্ষেপের সার্বিক বাস্তবায়নে দুবর্লতা লক্ষ করা যায়। বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য জনশক্তি বীমা বাধ্যতামূলক হলেও এর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। শিল্পে ৫০ জনের অধিক কর্মীর ক্ষেত্রে গোষ্ঠী বীমার কথা বলা থাকলেও এর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে গ্রাহকরা সময়মতো প্রিমিয়াম পরিশোধ করলেও এজেন্টদের অসততার কারণে বিভিন্ন সময় কোম্পানিতে প্রিমিয়ামের টাকা জমা হতো না। যার ফলে দাবি পরিশোধের সময় কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তি করতে পারত না। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে প্রিমিয়াম জমা থেকে শুরু করে দাবি পরিশোধসহ বিভিন্ন পর্যায়ে স্বচ্ছতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে বীমাগ্রহীতারা মোবাইল ওয়ালেট এবং তাদের ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে কোম্পানির ওয়েবসাইট ও অ্যাপসের মাধ্যমে পেমেন্ট গেটওয়ে চ্যানেলের ব্যবহার করে সহজভাবে তাদের প্রিমিয়াম প্রদান করতে পারছে। তাছাড়া বিএফটিএন সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে যেকোনো ব্যাংকের গ্রাহকরা তাদের প্রিমিয়ামের টাকা জমা করতে পারছে। 

গ্রামীণ এলাকার অধিকাংশ মানুষ বীমা কাভারেজের আওতাধীন নয়। দেশের মানুষের একটি বড় অংশেরও বীমা সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। মানুষজন বীমা পলিসির সুবিধা সম্পর্কে সচেতন নয় এবং অনেকেই বিশ্বাস করে যে বীমা ব্যবসা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। বীমাসেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা ও প্রচার-প্রচারণার অভাব রয়েছে। দেশের ৭ শতাংশ পরিবার তাদের স্বাস্থ্যসেবার খরচ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যবস্থা করে, যেখানে বীমা তাদের স্বাস্থ্যসেবার খরচের বিপরীতে নিরাপত্তা প্রদান করতে পারে। বীমা খাতের আওতা বাড়ানোর জন্য একদিকে এ খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের ভুল ধারণা ভাঙানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। অন্যদিকে আইনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বীমাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। বীমার আওতা বাড়াতে হবে, যেমন উৎপাদন খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের ঝুঁকি বীমা, সম্পদ বীমা, কৃষি ও পশুসম্পদ বীমা এবং দেশের সব মানুষের জন্য স্বাস্থ্য বীমা। বীমা কোম্পানিগুলোকে প্রতিনিয়ত নতুন বীমাসেবা উদ্ভাবনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম যাতে পরিচালনা করে এ ব্যাপারে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং নিয়মিত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তথ্য হালনাগাদ করতে হবে, যা বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। বীমা কোম্পানিগুলো এই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের যে লক্ষ্য নিয়ে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে তা একটি শক্তিশালী বীমা শিল্প প্রতিষ্ঠা অনেকটাই সহজতর করবে। উন্নত বিশ্বে বীমা সরকারের আয় অর্জনের অন্যতম বৃহৎ খাত। এর জন্য বীমা কোম্পানিগুলোকে প্রস্তুত হতে হবে এবং দেশের জিডিপিতে অবদান বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমেই একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, ক্ষুধামুক্ত ও স্থিতিশীল অর্থনীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।