ভোটার হওয়ার পরে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দিয়ে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার অংশ হতে পেরে গর্বিত আমি। সর্বশেষ কোনো রকম বিতর্ক ছাড়া ২০০৯-এ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে যখন সংসদীয় নির্বাচন হয়েছিল, তখনো আমি ভোটার হইনি। তখন দেখেছি, নির্বাচনের পরিবেশ অন্য রকম ছিল; নির্বাচনের প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতেন, জনগণের সঙ্গে আন্তরিকতা বজায় রাখতে চাইতেন এবং সর্বোপরি, টান টান উত্তেজনা বিরাজ করত গ্রাম আর শহরের রাস্তাঘাটে। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে, পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে জমে উঠত বিতর্ক, আর পাশেই দেখা যেত ছোট্ট শিশুরা বিভিন্ন দলীয় স্লোগান বলে খেলাধুলা করছে রাস্তার মাঝে। ভোটের দিন সকালবেলা, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে পরিবারের সবাই মিলে ভোট দিতে যাওয়া, রাতভর ভোটের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা, বিজয়ী দলের সমর্থকদের রাস্তায় নেমে আনন্দ মিছিল করা—তখন দেখেছি মানুষের মধ্যে নির্বাচনের সময় উৎসবের একটা আমেজ বিরাজ করত। এরপর একে একে তিনটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের যে নিজস্ব একটা আমেজ থাকে, তা অনুপস্থিত ছিল জনগণের ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। প্রায় ১৬ বছর পর আবার এ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে।

বহু বছর পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কিন্তু প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে বাংলাদেশকে নানা সময়ে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাদা ছোড়াছড়ির রাজনীতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ—এসব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে। তাছাড়া সহিংস রাজনীতি, হামলা-মামলা, গুম-খুন, মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি অনেক সময় নাগরিক আস্থাকে ক্ষুণ্ন করেছে।

বাংলাদেশে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার একটি অতীত ইতিহাস রয়েছে। এবারের নির্বাচন পরবর্তী সময়েও বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে এবং সার্বিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা যায়, সেজন্য অবশ্যই কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের দৃঢ় ও স্পষ্ট সহিংসতাবিরোধী অবস্থান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ও কঠোর হাতে বিশৃঙ্খলা মোকাবেলা করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা।
খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, নতুন সরকার হিসেবে বিএনপিকে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। এক্ষেত্রে সরকারের প্রথম কাজ হতে হবে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করা। দ্বিতীয়ত, অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেমন মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ পরিবেশ ইত্যাদি ইস্যুতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আর সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জ বিএনপির সামনে সেটা হলো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুস্থ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও আস্থার সংকট দূর করা।

তানজিলা আমির: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি