এটি বুঝতে স্নায়ুবিদ হতে হবে না, আপনার ব্রেন তা-ই নির্ধারণ করে, বস্তুর ধারণা আকারে আপনি অন্তত যা দেখেন। কাজটি বেশি ঘটে সামাজিক জগতে। এ জগৎ সাধারণত স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, দুর্নীতি বা দারিদ্র্যের মতো ধারণাগুলোর প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু আপনি যদি একজন অর্থনীতিবিদ হন, তাহলে আপনার মন প্রণোদনার অতিরিক্ত স্তরের মধ্য দিয়ে জগেক দেখতে প্রশিক্ষিত হয়।

প্রণোদনা সবখানেই নিহিত এবং অর্থনীতি সব ক্ষেত্রে বোঝাপড়ার এমন এক সমৃদ্ধ ও সূক্ষ্ম ধারণাগত কাঠামো তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে প্রণোদনাগুলো বিকৃত হতে পারে। আমরা প্রায়ই নৈতিক বিপত্তি, অ্যাডভার্স সিলেকশন (তথ্যগত অসমতা ও সামঞ্জস্যহীনতা) কমন-পুল সমস্যা, এজেন্সি সমস্যা, এক্সটার্নালিটি, অন্যায্য মাশুল, এক্সক্লোডাবিলিটি, রিভালরি ও বাজারশক্তি সম্পর্কে কথা বলি। এসব ধারণার ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদরা ব্যাখ্যা করতে পারেন কেন কোনো কোনো ব্যক্তি এত কম ভালো কাজ (যেমন বিনিয়োগ, জনকল্যাণে কাজ করা বা সহায়তা করা) করতে পারেন কিংবা কেনইবা একই ব্যক্তি এত বেশি মন্দ কাজ করতে পারেন (যেমন নির্বিচারে ঝুঁকি গ্রহণ বা দূষিত করা)। এভাবে দেখলে জগতের অধিকাংশ সমস্যাই বিকৃত প্রণোদনায় আরোপিত হতে পারে।

তবে একটি পুরনো প্রবাদ আছে, শুধু একটি হাতুড়ি থাকার কারণে যা প্রতিটি সমস্যাকে সামান্য কিছু হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করে। অর্থশাস্ত্র প্রণোদনার অনেক সূক্ষ্মতা ধরতে পারলেও তুলনামূলকভাবে এর একটি সংকীর্ণ প্যালেট বিদ্যমান, যা দিয়ে সক্ষমতার নানা বিষয় এবং কীভাবে সেগুলো বিকশিত হয় তা বর্ণনা করতে হয়। কিন্তু এটি অনস্বীকার্য যে সক্ষমতাগুলো স্পষ্টত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সামাজিক মূল্য হিসেবে আমরা যা দেখি, কেউ তা না করলে বুঝতে হবে যে তিনি সেটি পারেন না; এটি নয় যে আসলে তিনি করতে চান না। অর্থনীতিতে এই দুর্বলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়ায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে, যা মৌলিকভাবে উৎপাদিকা সক্ষমতার সামাজিক সমাবেশ সম্পর্কিত।  

একজন যেসব সুযোগের (অপশন) সম্মুখীন হয়, তার মধ্য থেকে প্রণোদনা যেখানে তার পছন্দ প্রভাবিত করে, সেখানে সক্ষমতা আসলে কোন কোন সুযোগ আছে, সেটিই নির্ধারণ করে থাকে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন হলো ওইসব সুযোগের সম্প্রসারণ মাত্র। কাজেই সেগুলো সক্ষমতার সমাবেশ ঘটাতে সহায়তা করে এমন নীতিগুলোর ওপর নির্ভর করে। যদিও প্রণোদনার ওপর এককভাবে মনোযোগ দেয়ার কারণে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক কেবলই সামান্য কিছু অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন কোনো দেশের রফতানি চাঙ্গা করতে কী করা যেতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থনীতিবিদরা রফতানিতে প্রণোদনা তুলে দেয়ার পথ সন্ধানের কথা বলেন। সম্ভবত এর পেছনে কারণ, বাণিজ্য সুরক্ষাবাদ অধিক প্রতিযোগিতামূলক ও ঝুঁকিপূর্ণ রফতানি বাজারের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক অভ্যন্তরীণ বাজারকে বেছে নেয়ায় সহায়তা করছে। একইভাবে সম্ভবত আমদানি শুল্ক প্রাথমিক উপকরণের (ইনপুট) দাম বাড়াচ্ছে। ফলে রফতানি কম লাভজনক হচ্ছে। হতে পারে দুর্বহ বাণিজ্যনীতি ও শুল্ক প্রক্রিয়াগুলো লেনদেন ব্যয় বাড়াচ্ছে। কিংবা হতে পারে উচ্চ পরিবহন ব্যয় একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে। সুতরাং বিস্ময়ের কিছু নেই যে এসব প্রণোদনাভিত্তিক ফ্যাক্টর কেন বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন ইনডেক্সে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের সঠিক মানে সঠিক পণ্যগুলো উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আছে কিনা, এ প্রশ্নটি অর্থনীতিবিদরা খুব কমই বিবেচনা করেন। বাণিজ্য সুরক্ষা কমানো এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাসের নীতিগুলো কি আদৌ সক্ষমতা বাড়াবে? কিংবা অভ্যন্তরীণ বাজারে বর্ধিত প্রতিযোগিতা কি শিল্পায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে আলোচনার সামর্থ্য দুর্বল করবে? এ ধরনের নীতিগুলো কীভাবে সক্ষমতাগুলোর পুঞ্জীভবন প্রভাবিত করে, তার পর্যালোচনা ছাড়া উল্লিখিত বিষয়গুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

অনুরূপভাবে, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোয় (মানে অনানুষ্ঠানিক খাত) এত বেশি কর্মসংস্থান কেন? এ প্রশ্নের মীমাংসাও জরুরি। ব্রোকিং ইনস্টিটিউশনের সান্তিয়াগো লেভির ভাষায় এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর হলো, কর ও রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির মাধ্যমে সরকারই সেগুলোকে ক্ষুদ্র থাকার সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে। তবে সমস্যাটি বিকাশের জন্য ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় সক্ষমতাজনিত প্রবেশাধিকার ঘাটতি কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর দূরবর্তী কর্মীদের প্রবেশাধিকার ঘাটতি দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় কি?

সক্ষমতা বাড়িয়ে সুযোগগুলো কাজে লাগাতে বিভিন্ন দেশ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেসব বিষয় শিখতে হবে, যা কীভাবে করতে হয়, এখনো জানে না তারা। তবে নিছকই করার মাধ্যমে একজন বিষয়গুলো জানতে-শিখতে পারবে, এমনও নয়। কেননা আগে যা করেনি, তা করার মাধ্যমে একজনের অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব নয়।

তাহলে কীভাবে একটি দেশ এই না-জানাবিষয়ক ধাঁধা এড়াতে পারে? এখানে স্পষ্ট প্রথম পদক্ষেপ হলো, বিভিন্ন বিষয় যেসব লোকজন বা প্রতিষ্ঠানগুলো জানে, তাদের নিয়ে আসা। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসন, ডায়াসপোরা, বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ, এমনকি ব্যবসায়িক ভ্রমণ অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। নীতিনির্ধারকদের জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন এসব রূপান্তরমূলক চ্যানেল সীমিত করতে পারে বা সম্প্রসারণ করতে পারে, এমন বিষয়গুলো তাদের দেশগুলো আদৌ করছে কিনা।

বড় কথা, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেবল ব্যক্তিক দক্ষতার বহুমুখিতা নয়; গুরুত্ব বহন করে সরবরাহকারী বা গ্রাহকের স্থানীয় লভ্যতাও। বিশেষ করে অন্য দেশ থেকে সহজে আনা যায় না এমন কাঁচামাল বা পণ্যের গ্রাহকের স্থানীয় সহজলভ্যতা খুব জরুরি। আবারো এসব ফ্যাক্টর নির্ভর করে বিদ্যমান বিজনেস ইকোসিস্টেমের কাঠামোর ওপর, যা প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকে পেয়ে থাকে। আর এ ইকো সিস্টেম মূলত সুনির্দিষ্ট জনকল্যাণ নিশ্চিত ও নিয়ন্ত্রণ বিধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের আগের সক্ষমতাগুলোর মেলবন্ধনের প্রতিফলন। বাজার একাই বিদ্যুৎ, উচ্চগতিসম্পন্ন রেল, নিরাপদ টিকা এবং মোবাইল ব্যাংকিং প্রবর্তনের দিকে কোনো দেশকে পরিচালিত করতে পারে না—যদি সমর্থ সরকারগুলো সদিচ্ছামূলকভাবে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সক্ষমতা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের মূল্য নিগড় থেকে শুরু করে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, নিয়ন্ত্রণ, অন্য প্রতিষ্ঠানসহ পুরো ইকোসিস্টেমে বিরাজ করে। তবে শুধু বাজার দ্বারা সক্ষমতাগুলোর মেলবন্ধন ঘটানো যায় না, কারণ বাজারবহির্ভূত সংগঠনের মধ্যেও অনেক সক্ষমতা নিহিত থাকে।

সক্ষমতাগুলোর সম্মিলন অবশ্যই যেকোনো প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্র হতে হবে এবং যথাযথ লক্ষ্য ও কার্যকর কৌশলগুলো নির্ধারণে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে আলোচনায় সরকারগুলোকে অবশ্যই সম্পৃক্ত হতে হবে। সক্ষমতাগুলো উন্নয়নে অনেক হাতিয়ার আছে, যেগুলো ব্যবহার হতে পারে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরিপক্ব বাণিজ্য সুরক্ষা, চাহিদা গ্যারান্টি (যেমন কার্যকর প্রমাণিত হওয়ার আগেই কভিড-১৯ টিকা কেনার চুক্তি), রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ (যেমন পোস্টাল ব্যবস্থা ও সরকারি উপযোগগুলো), জাতীয় কনগ্লোমারেটগুলোকে বহুমুখীকরণে নেয়া নীতিগুলো, জাতীয় উন্নয়ন করপোরেশনগুলোর ভূমিকা (যেমন সিঙ্গাপুরের টেমাসেক এবং মালয়েশিয়ার খাজানা), মারিয়ানা মাশুকাতো প্রস্তাবিত মুনশটস, জাতীয় ও আঞ্চলিক ইনোভেশন সিস্টেম প্রভৃতি। 

সন্দেহ নেই, প্রণোদনাবিষয়ক আমাদের বোঝাপড়া গভীরতর করতে অর্থশাস্ত্রের ধারণাগুলো বড় অবদান রেখেছে। কিন্তু সক্ষমতা বিষয়ে একটি ব্যাপকতর বোঝাপড়ার ঘাটতি আমাদের কেবল প্রতিটি সমস্যাকে সামান্য কিছু হিসেবে দেখার দিকে পরিচালনা করে তা নয়; বরং উন্নয়নশীল বিশ্বকে একটি মিথ্যা গোঁড়ামির দিকেও চালিত করতে পারে। কাজেই সমক্ষমতাগুলোর বিষয়ে বোঝাপড়া বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

রিকার্ডো হাউজম্যান: ভেনিজুয়েলার সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী, ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের অধ্যাপক এবং হার্ভার্ড গ্রোথ ল্যাবের পরিচালক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির