গত
কয়েক দশকে বৈশ্বিক জিডিপিতে কৃষির অবদান ক্রমে কমেছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, ২০১০ সালে বৈশ্বিক জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৪ শতাংশ। ২০১৮ সালে যা ৩ শতাংশে নেমে আসে। গুরুত্বের বিবেচনায় ক্রমক্ষয়িষ্ণু এ খাতই কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উঠে এসেছে চাহিদার সর্বোচ্চ শিখরে। কভিড-১৯ মহামারী সব হিসাব-নিকাশ আমূল পাল্টে দিয়েছে। লকডাউনের সময় সারা বিশ্বের মানুষ সবকিছু ফেলে রেখে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহের জন্য হন্যে হয়ে ছুটেছে। জিডিপির সূচককে ঊর্ধ্বমুখী করতে যে পণ্যগুলো এতদিন সবচেয়ে বেশি বাহবা পেয়েছে, মহামারীকালীন জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সে পণ্যগুলো কার্যত তেমন কোনো কাজেই আসেনি। কৃষির গুরুত্ব যে কত বেশি, তা কভিড মহামারী আরো একবার প্রমাণ করেছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন যথার্থই বলেছেন, ‘Agriculture is our wisest pursuit, because it will
in the end contribute most to Real Wealth, Good Morals, and Happiness.’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন, ‘Agriculture
is the most healthful, most useful and most noble employment of Man.’ বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, কৃষি খাত বিশ্বের অর্থনৈতিক আয়ের একটি সামান্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করলেও এটিই মোট কর্মীর প্রায় ৩০ শতাংশের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে।
আধুনিক কৃষির সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। গত ১০০ বছরে পৃথিবীর জনসংখ্যা চার গুণেরও অধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, ১৯৬১-৬৩ সাল থেকে ১৯৯৭-৯৯ সালের মধ্যে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার পরও খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণটি
জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ।
২০১৭ সালে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ বিজয়ী
Akinwumi Adesina বলেছিলেন, ‘Unless Africa uses modern technologies, our farmers’
output will remain low and we will remain dependent on others to feed us.’ বাংলাদেশের জনসংখ্যাও যে হারে বেড়েছে, বাড়ছে এবং আগামীতে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাতে প্রযুক্তির আশীর্বাদ ছাড়া ছোট ভূখণ্ডের জনবহুল এ দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে প্রায় অসম্ভব, তা বলা বাহুল্য। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের নীতি ও পরিকল্পনা কী হবে, তা অবশ্যই ঠিক করতে হবে। আমরা কি প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির দিকে এগোব, নাকি কৃষিবান্ধব প্রযুক্তির দিকে নজর দেব, সেটাই এখন প্রধান বিবেচ্য। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। প্রযুক্তির ওপর এতটা নির্ভরশীলতা আমরা চাই না, যা বিশাল সংখ্যক মানুষকে বেকার করে তুলবে। M
S Swaminathan, যাকে ভারতের সবুজ বিপ্লবের জনক বলা হয়, তিনি বলেছেন, ‘If agriculture goes wrong, nothing else will have a
chance to go right.’ মাত্র এক লাইনের এ বক্তব্যের মাঝে অনেক কথাই আসলে বিধৃত হয়েছে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে পশ্চিমা অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেলের অসারতা অনেক আগেই প্রমাণিত হয়েছে। কারণ অর্থনির্ভর প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমরা আমাদের মাটি, পানি, বাতাস, বন, প্রাকৃতিক পরিবেশ এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মানুষকেও গুরুত্বহীন বিবেচনা করেছি, যার কুফল আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। সে কারণেই প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘টেকসই উন্নয়নে’র কথা বলা হচ্ছে।
কৃষি খাত মানুষ ও পশুপাখির জন্য কেবল খাদ্যই উৎপাদন করে না, বরং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালেরও জোগান দেয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য, আয় ও কর্মসংস্থানের মূল উৎসই হলো কৃষি। ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসার জন্য ভেষজ ওষুধের সরবরাহও আসে কৃষি থেকে। তাই বলা যায়, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টিনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। হয়তো এ সত্য উপলব্ধি করেই মাইক্রোসফটের জনক বিল গেটস বলেছিলেন, ‘Chickens, not computers, can solve poverty.’
২০০০ সালের জুলাইয়ে নেদারল্যান্ডসে ‘Adoption
of Technologies for Sustainable Farming Systems’ শীর্ষক একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে ওইসিডি সদস্য রাষ্ট্র, কমিশন অব ইউরোপিয়ান কমিউনিটিজ, এফএও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এগ্রিকালচারাল প্রডিউসারসের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। আজ থেকে ২০ বছর আগে অনুষ্ঠিত সেই কর্মশালায়ও কৃষিতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘সঠিক প্রযুক্তি’ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। কাজেই স্থানীয় প্রয়োজন বিবেচনায় সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন করতে হবে, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে, ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে এবং এজন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এখানে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহূত প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব মূল্যায়ন করাও অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া শুধু আমদানীকৃত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা তৈরি না করে নিজস্ব মেধাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই প্রযুক্তির উদ্ভাবনও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এক হিসাবে দেখা গেছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে কৃষি গবেষণায় ১ টাকা বিনিয়োগ করলে ৩ টাকারও বেশি রিটার্ন আসে। সুতরাং কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে কেবল সরকারি খরচে গবেষণা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে বেসরকারিভাবে গবেষণাকে উৎসাহ দিতে হবে। প্রয়োজনে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের গবেষণায় মনোনিবেশ করছে, তাদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তাও দেয়া যেতে পারে।
আমাদের দেশে বর্তমানে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত। কৃষি তথ্য সার্ভিসের দেয়া তথ্যমতে, উচ্চফলনশীল ধান ও গমের জাতের সূচনার ফলে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষির অন্যান্য শাখা তথা পোলট্রি, গবাদিপশু ও মত্স্য চাষেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
অ্যাগ্রো-বেইসড ইন্ডাস্ট্রি তথা পোলট্রি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকায় এ খাতগুলোয় প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে দু-একটা কথা বলতে চাই। এক কথায় বলা যায়, গত তিন-চার দশক থেকে এ শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং দিন দিন এর ব্যবহার বাড়ছে। সর্বাধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগুলোকে দেশীয় খামারি ও শিল্পো উদ্যোক্তাদের কাছে সহজলভ্য করে তুলতে ওয়ার্ল্ড’স পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শাখা ১৯৯৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক পোলট্রি শো ও সেমিনারের আয়োজন করে আসছে। দেশীয় খামারি ও উদ্যোক্তাদের একনিষ্ঠতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে চার দশক আগেও যেখানে প্রায় শতভাগ ফিড আমদানি করতে হতো, আজ সেখানে শতভাগ দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে পোলট্রি ও ফিশ ফিড। এখন দেশে উৎপাদিত একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চাই শতভাগ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাচ্ছে, মুরগির মাংস ও ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ করছে দেশীয় পোলট্রি শিল্প। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।
আমরা ধাপে ধাপে অটোমেশনের দিকে যাচ্ছি, তবে প্রান্তিক খামারিদের পেছনে ফেলে কেবল প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প আমাদের লক্ষ্য নয়। সে কারণে আমরা জীবনিরাপত্তার ওপর অনেক বেশি জোর দিচ্ছি, যেন সাধারণ খামারিরাও
নিরাপদ ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন করতে পারেন। তাছাড়া আমরা ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং শুরু করেছি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খামারিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেছি। একথা এখন সবাই স্বীকার করে যে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নে বৃহত্তর কৃষির অংশ হিসেবে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। আমরা বিদেশী ব্রিডের পাশাপাশি দেশীয় ব্রিডগুলোর বাণিজ্যিক বাজার তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছি।
পরিশেষে বলব, বাংলাদেশের কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতিতে পরিবেশবান্ধব টেকসই প্রযুক্তি উন্নয়নে কৃষি গবেষণা কার্যক্রমকে জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, কৃষি গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রদান করা হচ্ছে—এ উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
একটা উদ্বেগের কথা না বললেই নয় যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কৃষি জমিগুলোয় আইলের সংখ্যা বাড়ছে, ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ছে জমি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, স্থাপনা ও বসতি স্থাপন করতে গিয়ে প্রতিদিন আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। এখনই যদি কৃষিজমি রক্ষায় শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
সার ও কীটনাশক, খামার যন্ত্রপাতি, সেচ যন্ত্রপাতি ছাড়াও বৃহত্তর কৃষিতে অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি খাতকে টেকসই প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শক্তিশালী অবস্থান সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায়ও কৃষি অন্যতম রক্ষাকবজ।
কৃষকরা শুধু পণ্যই নয়, বরং পণ্যের সঙ্গে তাদের পুঞ্জীভূত শ্রমও বিক্রি করছেন। কিন্তু শ্রম কিংবা পণ্যের ন্যায্য দাম তারা পাচ্ছেন না। কৃষক আন্দোলনের কারণে ভারতের কৃষি খাতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সেক্ষেত্রে কৃষি আইনগুলোর সংস্কার যেমন প্রয়োজন, তেমনি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিপণন ব্যবস্থায় আধুনিকায়নও অতিজরুরি। ভারত ও বাংলাদেশে কৃষকরা দিন দিন প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাই এ বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে।
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ হ্রাস ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে প্রযুক্তি ব্যবহার অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দ্রুততার সঙ্গেই বৃহত্তর কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং আমাদের নিজেদের স্বার্থে ও আগামীর প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই কৃষির আধুনিকায়ন ঘটাতে হবে। আমাদের সর্বোচ্চ প্রয়াস থাকবে টেকসই উন্নয়ন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪, ২০৩০ ও ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের যে রূপরেখা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন, সেখানে যে প্রয়োজনটি সর্বাগ্রে, তা হলো নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি। আর এক্ষেত্রে কৃষি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প আপাতত নেই। তবে এ লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারেরও কোনো বিকল্প নেই।
আবু
লুেফ ফজলে
রহিম খান:
ব্যবস্থাপনা
পরিচালক
আফতাব বহুমুখী ফার্মস লি.









