(‘তুমি
কি নদীর
ওই গোপন
কথা জানতে;
যে সময়
বলতে এমন
কিছু জিনিস
নেই? যে
নদীটা একই
সময়ে সব
জায়গায় আছে,
উৎসে এবং
মুখে, ঝরনায়,
ফেরিতে, জলস্রোতে,
মহাসাগরে, এবং
পর্বতে, প্রত্যেক
জায়গায় এবং
বর্তমান বিদ্যমান
এর জন্য,
অতীতের ছায়া
নয়, নয়
ভবিষ্যতের ছায়া
‘হ্যারমান
হেসে, ‘সিদ্ধার্থ’)
আগের লেখায়
বাংলার নদী
নিয়ে অমর্ত্য
সেনের অনুভূতির
কথা তুলে
ধরা হয়েছিল।
কিন্তু তার
সদ্যপ্রকাশিত আত্মজৈবনিক
বইয়ে তিনি
নদীর সঙ্গে
সম্পৃক্ত অন্যান্য
বিষয় নিয়েও
কথা বলেছেন
এবং আজ
এ নিবন্ধে
সেগুলো সংক্ষেপে
উপস্থাপন করা
হবে।
বাংলা সাহিত্যে
নদীর প্রতি
বিমুগ্ধতা প্রাচীন।
দশ শতকে
গুরুতর ব্যাকরণ
নিয়ে বাংলা
একটা ভাষা
হিসেবে আবির্ভূত
হওয়ার পর
থেকে এ
বিমুগ্ধতার বিকাশ
ঘটে বলে
ধারণা করা
হয়। অবশ্য
সংস্কৃত থেকে
উত্পত্তি হলেও
কিন্তু ব্যাপকভাবে
ভিন্নরূপী, এ
ভাষার ‘প্রাকৃত’
নামে ক্ল্যাসিক্যাল
সংস্কৃতের সঙ্গে
একটা গভীর
সম্পর্ক ছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
পর্যবেক্ষণ হলো,
প্রাচীন বাংলা
গল্পগুলো বেশির
ভাগ নদীর
সঙ্গে জড়িত,
যেমন—সম্পূর্ণভাবে
গঙ্গা, ভাগীরথীর
ওপর পনের
শতকের লেখা
‘মনসা-মঙ্গল
কাব্য’।
অনেক প্রশংসিত
এবং সমালোচনার
দৃষ্টিতে পঠিত
এ কাব্যে
চাঁদ নামে
এক সওদাগরের
দুঃসাহসিক অভিযান
এবং সাপদেবীর
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
করার কারণে
নিহত হওয়ার
গল্প বলা
হয়েছে।
মনসামঙ্গলে এ
পরিণতি বালক
অমর্ত্য সেনকে
হতাশ করেছিল
যেহেতু তিনি
চেয়েছিলেন জঘন্য
সাপদেবীর বিরুদ্ধে
অবাধ্য চাঁদ
সওদাগর জয়লাভ
করুক। এমনিতেও জনপ্রিয়
গল্প ও
নাটকে অলৌকিক
শক্তির আস্ফাালন
তার মানসিক
পীড়ার কারণ
ছিল এবং
প্রত্যাশা করতেন
এগুলো একদিন
পরাস্ত হবে।
মাঝেমধ্যে সেটা
হয়েছেও হয়তো।
তবে যতটুকু
আশা জেগেছিল
তার মনে,
তা ব্যাপকভাবে
খাটো করেছে
পরবর্তী সময়ে
আমেরিকায় গিয়ে
দেখা গভীর
রাতে টেলিভিশনে
প্রচারিত অলৌকিক
শক্তিধরদের বলবত্তা
ও জনপ্রিয়তা।
আপাতদৃষ্টে মনে
হবে যেন
গল্পটি অপরাধ-শনাক্ত
নিয়ে গড়াবে
কিন্তু কোণঠাসা
খলনায়ক যখন
সুগঠিত মুখটা
খোলে তখন
একটা ১০
ফুট লম্বা
জিহ্বার আবির্ভাব
ঘটে, যা
প্রশিক্ষিত আমেরিকান
দর্শকের কাছে
ব্যাহত কোনো
চমক নয়।
কাহিনী যত
গড়ায়, দৈহিক
নিয়মগুলো পাল্টে
যেতে থাকে।
অমর্ত্য সেনের
বিস্ময়, পৃথিবীর
মধ্যে বিজ্ঞানে
সবচেয়ে সমৃদ্ধ
একটা দেশের
ফিকশনে অলৌকিকতার
আধিপত্য জনপ্রিয়
আমেরিকান কল্পনাপ্রতিভার
একটা উল্লেখযোগ্য
দিক এবং
ওখানটায় সাহিত্যগুণবিবর্জিত
১০০টি মনসামঙ্গল
হুট করে
বেরিয়ে পড়ে
প্রতি রাতের
টেলিভিশনের গল্পগুলোয়।
দুই
লক্ষ
করা গেছে,
প্রাচীন বাংলা
সাহিত্যের নদীকেন্দ্রিক
লেখায় মনোযোগ
এবং বিষয়বস্তুগত
দিক থেকে
ব্যাপক বৈসাদৃশ্য
বিদ্যমান। অমর্ত্য
সেন দশ
এবং বারো
শতকের অনেক
লেখা, যা
আদিকালের সবচেয়ে
ভালোভাবে শনাক্ত
করা যায়,
পড়েছেন এবং
বিশেষত চর্যাপদ,
গভীর মনোযোগ
সহকারে পাঠ
করে শিহরিত
হয়েছেন। এগুলো
পাঠে তার
উদ্দেশ্য ছিল
সাহিত্যবিষয়ক স্বাদ
আহরণ এবং
নিবেদিত বৌদ্ধরা
জীবন এবং
অগ্রাধিকার সম্পর্কে
কীভাবে ভাবতেন
সে বিষয়ে
ঐতিহাসিক জ্ঞান
লাভ করা।
লেখক সিদ্ধাচার্জ
ভুসুকু কর্তৃক
পদ্দা নদীতে
জলদস্যুদের কর্মকাণ্ড এবং
অতি ‘নিচু
জাতের’ নারীকে
বিয়ে করা
নিয়ে রচিত
শ্লোকগুলো বৌদ্ধভক্ত
অমর্ত্য সেনকে
অভিভূত করেছিল।
তিন
দশ
এবং বারো
দশকে Bangalee (চর্যাপদে
বানান Vangali)
আর বর্তমানের
Bengali
শব্দ দুটো
সমার্থক নয়।
বরং দশ
দশকের ‘ভাংগালি’
বলতে বাংলার
নির্দিষ্ট একটা
উপঅঞ্চল থেকে
আসা মানুষকে
বোঝানো হতো।
জায়গাটার নাম
ভাংগা যার
পুরোটাই বর্তমান
বাংলাদেশে অবস্থিত
এবং ভৌগোলিক
দিক থেকে
বহুকাল ‘পূর্ব
বাংলা’ নামে
পরিচিত হয়ে
আসছে। পুরনো
বাংগা বা
ভাংগায় অন্তর্ভুক্ত
ছিল। এখনকার
ঢাকা ও
ফরিদপুর জেলা।
ঢাকা থেকে
পশ্চিম বাংলায়
যাওয়া অমর্ত্য
সেন নিজেকে
মনে করতেন
আধুনিক অর্থে
বেঙ্গলি এবং
ক্ল্যাসিক্যাল বর্ণনায়
বাঙালি (অথবা
ভাংগালি)।
এ কারণে
তার মনে
হতো তিনি
ভুসুকুর কিছুটা
কাছাকাছি কিন্তু
ভাবনার পেছনে
অন্য একটা
কারণও কাজ
করেছে আর
সেটা হলো
ভুসুকুর বৌদ্ধ
ধর্ম
যার প্রতি
স্কুলজীবনে আকৃষ্ট
ছিলেন অমর্ত্য
সেন। হাজার
বছরের পুরনো
ভুসুকুর ধারণা
সহপাঠীদের বোঝানোর
চেষ্টা চালিয়ে
ব্যর্থ হয়েছিলেন
বলে চরম
আফসোস অমর্ত্য
সেনের। তবে
তাদের মধ্যে
একমাত্র ব্যতিক্রম
ছিল একনিষ্ঠ
শ্রোতা চীনা
সহপাঠী তান
লি কিন্তু
তার পরও
নিশ্চিত হতে
পারেননি সে
অমর্ত্যের বকবকানি
সহ্য করেছে
বন্ধুর প্রতি
আনুগত্যের কারণে,
না সত্যিকার
বিষয়টা ভালো
লেগেছিল বলে।
যা-ই
হোক, বাঙালি
নিয়ে বেশ
একটা মজার
গল্প বলছেন
অমর্ত্য সেন।
পূর্ব বাংলার
বাঙালিকে পশ্চিম
বাংলায় বলা
হয় ‘বাংগাল’
(অর্থাৎ একেবারে
সরল); অন্যদিকে
পূর্ব থেকে
আসা ‘নিন্দুকদের’
কাছে পশ্চিম
বাংলার বাঙালি হচ্ছে
‘ঘটি’
(আক্ষরিক অর্থে
হাতলবিহীন মগ)।
এ দুই
গোষ্ঠীর মধ্যকার
ব্যাপক বৈপরীত্য
শত শত
বছরের পুরনো।
তবে এ
বিভাজন ১৯৪৭
সালের বাংলা
ভাগের সঙ্গে
কোনোভাবে সম্পৃক্ত
নয়, যে
ভাগের কারণে
পরবর্তী সময়ে
পূর্ব পাকিস্তান
থেকে বাংলাদেশ
এবং ভারতে
থাকা বাকি
অংশ পশ্চিম
বাংলা। ১৯৪৭
সালের রাজনৈতিক
বিভাজন হয়েছিল
সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয়
ভিত্তিতে অথচ
বাঙাল আর
ঘটির মধ্যকার
সাংস্কৃতিক ভাগ
তারও বহু
আগ থেকে
চলে আসছে।
হয়তো কিছুটা
কাকতালীয়ভাবেই বাঙালদের
বেশির ভাগ
মুসলমান আর
ঘটিরা মূলত
হিন্দু, তবে
ধর্মের ভূমিকা
এখানে নেই।
তারও আগে
অবশ্য পূর্ব
আর পশ্চিম
বাংলার মধ্যে
একটা ঐতিহাসিক
সাধারণ ভাগ
ছিল যেমন
পূর্ব বাংলার
অনেকে প্রাচীন
রাজত্বের ভাংগা
থেকে আসা;
অন্যদিকে পশ্চিমের
বাঙালিরা এসেছিল
অনেক পশ্চিমে
গৌড় রাজত্ব
থেকে। সিদ্ধাচার্জ
ভুসুকুর মতে,
আদি বাংলার
বিশেষ বিশেষ
জায়গায় সামাজিক
চলনবলনে বেশ
পার্থক্য প্রতীয়মান
হতো; এমনকি
ক্ষেত্র বিশেষে
মূল বক্তব্য
উত্থাপনে ব্যবহূত
শব্দে এ
দুই গোষ্ঠীর
মধ্যকার অমিল
চোখে পড়ার
মতো। যেমন—পশ্চিম
বাংলার কলকাতা
কিংবা শান্তিনিকেতন
এলাকায় লালিত
লোকেরা যখন
বলে ‘বলবো’,
পূর্ব থেকে
যাওয়া লোকের
কথায় যেমন
অমর্ত্য সেনের,
সেটা দাঁড়ায়
‘কইব’
অথবা ‘কইমু’।
সুতরাং ঢাকা
ছেড়ে শান্তিনিকেতনে
যাওয়া অমর্ত্য
সেন অলক্ষ্যে
প্রায়ই আঞ্চলিক
কথা বলতে
গিয়ে বন্ধু
মহলে হাসির
খোরাক হয়ে
উঠতেন এবং
যখনই দেখা
হতো তার
ডাকনাম ‘কইব’
দিয়ে বন্ধুরা
অকপট হাসিতে
ফেটে পড়ত।
চার
বিশেষত
প্রাক বিভক্ত
বাংলার রাজধানী
কলকাতায় এই
দুই গোষ্ঠী
পরস্পর মিলিত
হতো, এবং
ছুতো পেলেই
অনুপকারী পরিহাসে
লিপ্ত থাকত।
তবে যে
ক্ষেত্রে প্রায়ই
ঘটি বাঙালি
দ্বন্দ্বটা বেশ
প্রকট হয়ে
দেখা দিত
তা হলো
ফুটবল খেলা।
কলকাতার অনেক
পুরনো ফুটবল
দল মোহনবাগান
ক্লাবের সমর্থকদের
অধিকাংশ ঘটি
এবং অপেক্ষাকৃত
নতুন দল
ইস্ট বেঙ্গলের
সমর্থক অধিকাংশ
বাঙাল। এক্ষেত্রে
ধর্মের ভূমিকা
একেবারে শূন্য
(অন্য এক
ক্লাব মোহামেডান
স্পোর্টিংয়ে হিন্দু
খেলোয়াড়ও ছিল)।
মোহনবাগান আর
ইস্ট বেঙ্গলের
খেলার দিন
প্রচুর দর্শক
সমাগম হতো
এবং এখনো
তাই হয়।
কলকাতার অনেক
অধিবাসী ভাবত
এবং এখনো
ভাবে এ
দিনটি বর্ষপঞ্জিকায়
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
ঘটনা এবং
এর ফলাফল
জীবন-মরণ
বিষয়।
অবশ্যই অমর্ত্য
সেনের উৎস
ঢাকা বিধায়
তিনি ছিলেন
ইস্ট বেঙ্গল
ক্লাবের সমর্থক,
যদিও জীবনে
মাত্র একবার
মাঠে গিয়ে
খেলা দেখেছেন
এবং তাও
যখন তার
বয়স ১০
মাত্র। তাতে
কী, অন্তত
ফুটবল খেলার
ক্ষেত্রে চোখকান
বন্ধ ছিল
না; মিডিয়ার
মাধ্যমে এ
দু’দলের
গুরুত্বপূর্ণ মুখোমুখির
খবরাখবর রাখতে
অমর্ত্য সেনের
আগ্রহের কমতি
ছিল না।
মজার ঘটনা
হলো, ‘অব্যাহত
আনুগত্য ও
সমর্থনের’ জন্য
৫০ বছর
পর ১৯৯৯
সালে ইস্ট
বেঙ্গল ক্লাব
অমর্ত্য সেনকে
তার ভাষায়
‘অপ্রাপ্য
সম্মান’ আজীবন
সদস্যপদ প্রদান
করেছে।
পাঁচ
তীক্ষ
মেধাবী এবং
চিন্তক অমর্ত্য
সেন লক্ষ্য
করলেন, মোহনবাগান
বনাম ইস্ট
বেঙ্গলের মধ্যকার
খেলা সবসময়
সহজবোধ্য কিছু
অর্থনৈতিক পরিণতি
ডেকে আনে
এবং বিশেষ
করে এর
মধ্যে আছে
কলকাতায় বিভিন্ন
মাছের আপেক্ষিক
দাম। যেহেতু
বেশির ভাগ
ঘটি ‘রুই’
এবং অধিকাংশ
বাঙাল ‘ইলিশ’
পছন্দ করে,
সেক্ষেত্রে মোহনবাগান
জিতলে রুইয়ের
দাম বেড়ে
যেত বিজয়
উদযাপন এবং
নৈশভোজের জন্য
অতিরিক্ত চাহিদার
কারণে; তেমনি
ইলিশের দাম
লাফিয়ে উঠত
ইস্ট বেঙ্গল
ক্লাব জয়ী
হলে। প্রসঙ্গত
বলে রাখা
প্রয়োজন, নোবেলজয়ী
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য
সেন জীবনে
অর্থনীতি নিয়ে
পড়াশোনার কথা
কখনো ভাবেননি;
তিনি বরং
দৃঢ়ভাবে অনুরক্ত
ছিলেন অংক
এবং পদার্থবিজ্ঞানে,
সম্ভব হলে
সংস্কৃতে। তার
পরও হঠাৎ
চাহিদা বৃদ্ধি
সাপেক্ষে দাম
বৃদ্ধির প্রাথমিক
অর্থনীতি অমর্ত্য
সেনের মধ্যে
কৌতূহল উদ্রেক
করে। এমনকি
একটা আদিম
তত্ত্বের ওপর
ভর করে
তিনি অনুমান
করলেন, সাধারণত
দামের এ
উদ্বায়িতা বা
ওঠানামা থাকত
না যদি
খেলার ফল
শক্তভাবে ভবিষ্যদ্বাচ্য
হতো, অর্থাৎ
ফল যদি
পূর্ব থেকে
আঁচ করা
যেত। ফলাফলের
ভবিষ্যৎ আগ
থেকে জানা
থাকলে খুচরা
মাছ বিক্রেতারা
যথাযথ মাছের
জোগান দিতেন
এবং তাই
যথাযথ মাছের
চাহিদা এর
মধ্যে সম্প্রসারিত
সরবরাহ অতিক্রম
করতে পারত
না, আর
এর ফলে
দাম লাফিয়ে
উঠত। এটা
স্পষ্ট, রুই
বা ইলিশের
দামের ঊর্ধ্বগতি
ফুটবলের ফলাফলের
অনিশ্চয়তার ওপর
নির্ভরশীল ছিল,
যেমন—যথাক্রমে
মোহনবাগান অথবা ইস্ট
বেঙ্গলের বিজয়।
কিন্তু অমর্ত্য
সেনের দ্বিতীয়
উপসংহারও উঁকি
দিল মনে,
অর্থনীতি যদি
প্রকৃত অর্থে
এ ধরনের
সমস্যা সমাধানে
ব্যাপৃত থাকে
তবে সম্ভাবনা
আছে যে
এর থেকে
বড়োজোর বিশ্লেষণধর্মী মজা পাওয়া
যেতে পারে
তার চেয়ে
বেশি কিছু
নয়
এবং এ
প্রাপ্তিটুকু সম্পূর্ণ
অর্থহীন তামাশা
ছাড়া কিছু
নয়। তা
হয়ে থাকলেও
আনন্দের সংবাদ
এ, যখন
সময় এলো,
তার ওই
সংশয় প্রথম
বর্ষ আন্ডার
গ্র্যাজুয়েট হিসেবে
অর্থনীতি পড়ার
পথে বাধা
হয়ে দাঁড়ায়নি।
তবে অন্তত
সেদিন মনে
হয়েছিল ফুটবল
আর মাছের
দামের সম্পর্কের
চেয়ে অধিকতর
চিন্তার খোরাক
জুগিয়েছিল নাব্য
নদী এবং
সভ্যতার সমৃদ্ধি
অর্জনের উপস্থিতি
সম্পর্কে এডাম
স্মিথের অনুমান।
ছয়
বাঙালিদের
প্রথাগত নদীকেন্দ্রিক
জীবনের জন্য
এটাই স্বাভাবিক
যে সামাজিক
এবং সাংস্কৃতিক
বিষয়ে প্রায়ই
নদীভিত্তিক তুলনা
চলে আসে।
বাঙালির কাছে
নদী জীবন,
নদী মরণ
যেমন তার
সমাজ। মূলত
নদী ও
সমাজ উভয়ের
আছে সৃষ্টি
ও ধ্বংস
করার ক্ষমতা।
১৯৪৫ সালে
হাই স্কুলপড়ুয়া
অমর্ত্য সেনের
নজর কাড়তে
সক্ষম হয়
ঔপন্যাসিক ও
রাজনৈতিক প্রাবন্ধিক
হুমায়ূন কবিরের
একটা পরিবারের
ওপর শক্তিশালী
নদীর প্রভাব
নিয়ে লেখা
উপন্যাস ‘নদী
ও নারী’।
নদীটির নাম
পদ্দা যা
‘বর্ষাকালে
বলিষ্ঠ, বর্ষা
মৌসুমের পর শরত্কালে
শান্ত এবং
সুন্দর, গ্রীষ্মকালের
ঝড়ের বিকালে
ভয়ংকর, অপ্রত্যাশিত
মৃত্যুর আতঙ্কের
একটা উৎস,
ভালো মানব
জীবনের জন্য
অনেক উপকারী,
এর সঙ্গে
খরার পর
বৃষ্টির প্রবল
জলধারায় মূল্যবান
জিনিস ধ্বংসকারী।’
গতিপথ পরিবর্তনকারী
নদীর ভূমি
সৃষ্টি এবং
ধ্বংসের ভেতর
বেঁচে থাকার
সংগ্রামে লিপ্ত
একটা ভূমিহীন
পরিবারের গল্প
‘নদী
ও নারী’।
পরিবারটা মুসলিম,
যেমন ছিলেন
হুমায়ূন কবির,
কিন্তু সংগ্রামটা
নদীনির্ভর হিন্দু
এবং মুসলিম
সবার দিকেরই
বিপাক। ‘আমরা
নদীর মানুষ।
আমরা কৃষক।
আমরা বালুতে
বাঁধি ঘর
কিন্তু পানি
ভাসিয়ে নেয়।
আমরা পুনঃপুন
নির্মাণ করি
এবং মাটি
চাষ করে
পতিত জমি
থেকে সোনার
ফসল ঘরে
তুলি।’ গল্পটির
অনন্য বৈশিষ্ট্য
এই মুসলিম
পরিবার নিয়ে
হলেও তখনকার
চলমান মুসলিম
বিচ্ছিন্নতাবাদ মেজাজের
সঙ্গে চলনসই
ছিল না।
চল্লিশের দশকে
‘নদী
ও নারী’
লেখা হয়
যখন অনেক
মুসলিম রাজনৈতিক
নেতা লাহোর
প্রস্তাবের ভিত্তিতে
মুসলমানদের জন্য
আলাদা আবাসভূমি
স্থাপনের লক্ষ্যে
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির
বীজ বপন
করছিলেন। একই
ধরনের শক্তিশালী
সংঘর্ষের ইঙ্গিত
পাওয়া যাচ্ছিল
অনেক বাঙালি
হিন্দুর মধ্যেও।
স্বাধীনতার ঠিক
আগের বছরগুলোয়
যে নতুন
শক্তিশালী রাজনৈতিক
শক্তি বাংলায়
প্রভাব বিস্তার
করেছিল তা
হচ্ছে হঠাৎ
আবির্ভূত এবং
দ্রুত বিস্তার
লাভ করা
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা
যা চল্লিশের
দশকে স্বাধীনতা
ও বিভাজনের
আগে অনেক
রক্তপাতের কারণ
হয়েছিল। ‘এমনকি
স্কুলের ছাত্র
হিসেবে আমরা
দুশ্চিন্তা এবং
গভীর উদ্বেগের
অনুভূতি এড়াতে
পারিনি। ঠিক
বুঝে উঠতে
পারছিলাম না
হঠাৎ করে
এ বিদ্বেষ
কী করে
বহুবিস্তৃত হলো
এবং আমরা
আন্তরিকভাবে প্রার্থনা
করছিলাম যেন
পৃথিবীটা উন্মত্ততা
থেকে সরে
আসে, ভাবছিলাম
এমন কিছু
কি আছে
যা আমরা
করতে পারি।’
সৃষ্টি ও
ধ্বংস উভয়
ধর্মভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদের
প্রতি নদীগুলোর
উদাসীনতা স্মরণ
করিয়ে দেয়
সাম্প্রদায়িক বিভাজন
নির্বিশেষে সব
মানুষ একই
বিপাকের শিকার
এবং এটাই
‘নদী
ও নারী’র
প্রধান বাণী।
আব্দুল বায়েস: অর্থনীতির অধ্যাপক; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক










