এখন শ্রাবণ মাস। ভরা বর্ষার মাস। এ মাস এলে আর প্রবল বৃষ্টিপাত হলেই আমার ছোটবেলার কথা, স্কুলজীবনের কথা মনে পড়ে। বৃষ্টি মানেই বৃষ্টিতে ভেজা, ভেজা মাঠে ফুটবল খেলা, খালে-বিলে মাছ ধরা, নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়া। আনন্দ, মহা আনন্দ—সব শিশু মিলে। খেতাম শিম বিচি ভাজা, কাঁঠাল বিচি ভাজা, খিচুড়ি। এসবের আরেক দিকে যে দুঃখ-কষ্ট আছে, তা বুঝতাম না। টেলিভিশন তো দূরের কথা, রেডিওটাও ছিল না। পত্রিকার প্রশ্নই ওঠে না। তাই কোথায় কী হচ্ছে এর কিছুই আমরা জানতাম না। এখন বৃষ্টিপাত, প্রবল বৃষ্টিপাত হলে টেলিভিশন খুলি। দেশের কোথাকার অবস্থা কী? ঢাকা শহরের অবস্থা কী? এবার শুরু হয়েছে চীনের বন্যার খবর দিয়ে। এক মাস ধরে চীনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল বন্যার জলে ডুবে আছে। কোটি কোটি লোক গৃহহারা। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী মানুষকে উদ্ধার করছে। ভেসে যাচ্ছে সব। বড় বড় বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এসব দেখে দেখে মনে মনে প্রমাদ গুনছিলাম। চীনে প্রবল বারিপাত হলে ভারতের আসাম কি অক্ষত থাকবে? আসাম যদি বারিপাত ও বন্যাকবলিত হয় তাহলে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল কি অক্ষত থাকবে? পরের প্রশ্নই হচ্ছে, তাহলে কি আমরা অক্ষত থাকব? আমার আশঙ্কাই সত্য হলো। এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বন্যা ও বৃষ্টির জলে ভেসে গেছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, পাবনা, নওগাঁ, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ থেকে শুরু করে বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর, এদিকে টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ বন্যাকবলিত। মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। সঙ্গে তার গরু-ছাগল, এমনকি টিনের চালাঘর পর্যন্ত। খাওয়ার জল নেই, খাদ্য নেই, ওষুধ নেই, শিশুদের অসুখ-বিসুখ হচ্ছে। একে তো কভিড-১৯-এর আতঙ্ক, চার মাস ধরে মানুষ করোনার কবলে। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। অগণিত মানুষ মারা যাচ্ছে। লোকের রোজগার নেই। চাকরি নেই। কর্মসংস্থান নেই। মিল-ফ্যাক্টরি বন্ধ। কাজের ভীষণ অভাব। এ চিত্র সারা দেশের। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যা ও অতিবৃষ্টির কষ্ট। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ আর কী! মানুষ অসহায় জীবন-যাপন করছে। ত্রাণের অপ্রতুলতা, আশ্রয়ের অভাব, চিকিৎসার অভাব, ওষুধের অভাব, পানীয় জলের অভাব। এ তো গেল নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু দুশ্চিন্তা ফসল নিয়ে। ক্ষেতে ধান। আউশ ফসল জমিতে। বন্যার জলে জমিজমা ডুবে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে ফসল। কৃষক কি আউশ ধান তুলতে পারবেন? বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ এই দুশ্চিন্তায়। দুদিন পরে বন্যার জল ভাটিতে আসবে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত করছে। আউশ ফসল আমাদের একটা ‘বাফার’ ফসল। বড় দুই ফসল—বোরো এবং আমনের মাঝখানে আউশ। ২৫-৩০ লাখ টন আউশ চাল আমরা এর থেকে প্রতি বছর পাই। যদি এর ১০ শতাংশও মার খায় তাহলে খাদ্যনিরাপত্তায় আঘাত পড়বে। বোরো ফসলটা ভালো হয়েছে। সরকার কিছু মজুদ করেছে। কিন্তু আউশের ক্ষতি হলে চালের দামে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। কোনো ছুঁতা পেলেই মজুদদাররা বা ডিলাররা চাল নিয়ে খেলতে শুরু করে। আর যদি আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে তো কথাই নেই। আশা করি, সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ আছে। যতটুকু জানি, এমনিতেই এবার আমাদের আউশের চাষ আগের তুলনায় কম হয়েছে। অতএব, সাবধানতার দরকার আছে। সাবধানতা আরো বেশি, কারণ কভিড-১৯ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। এই অচেনা শত্রু সবকিছু তছনছ করে  দিয়েছে। এর মধ্যে ফসল নিয়ে কিছু ঘটলে আমাদের আরো বিপত্তি হবে।

এদিকে আর কয়েক দিন পরই কোরবানির ঈদ। মানুষ এবার রোজার ঈদ শান্তিতে করতে পারেনি। একই অবস্থা হবে কোরবানির ঈদের, তা অনেকেই মানতে পারেন না। কোরবানির ঈদের শুধু ধর্মীয় দিক নয়। এর আছে একটা বড় অর্থনীতি। বস্তুত, রমজান মাস ও রোজার ঈদ এবং কোরবানির ঈদ উপলক্ষে স্বাভাবিক অবস্থায় দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা বছরের ব্যবসা করেন। কোরবানির ঈদের পক্ষ বেশ কয়েকটি। রয়েছেন খামারিরা, যারা সারা বছর নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পশু পালন করেন, বড় করেন এবং কোরবানি উপলক্ষে তা বিক্রি করেন। এতে তার লাভ-ক্ষতি উভয়ই হয়। ভাগ্য ভালো থাকলে লাভ, না হলে ক্ষতি নিয়ে ঘরে ফেরা। এবার খামারিরা চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছেন। একে তো কভিড-১৯ জনিত অস্বাভাবিক অবস্থা। মানুষের হাতে টাকা নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যা, অতিবৃষ্টির জল। তারা কি পশুর ন্যায্যমূল্য পাবে? বাজারে কি যথেষ্ট ক্যাশের আমদানি থাকবে? আশার কথা, বিদেশে কর্মরত ওয়েজ আর্নাররা অর্থ পাঠাচ্ছেন নিয়মিত। ভয় ছিল হয়তো রেমিট্যান্সের পরিমাণ হ্রাস পাবে। বিদেশে অনেকের চাকরি চলে যাচ্ছে। অনেকে বেকার। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি সবার মতোই খারাপ। বহু শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন এবং অনেকেই আসার জন্য দিন গুনছেন। এ  প্রেক্ষাপটে আশঙ্কা ছিল রেমিট্যান্স কমবে। না রেমিট্যান্স বরং বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৮ বিলিয়ন ডলার দেশে রেমিট্যান্স হিসেবে এসেছে। এই টাকার প্রবাহ অব্যাহত থাকবে কিনা, সে প্রশ্ন আছে। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে বলা যায়, বৃহৎ পরিমাণের রেমিট্যান্সের প্রাপক গ্রামবাসী। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকার গ্রামবাসী এক-দেড় কোটি পরিবার এর সুবিধাভোগী। এদের হাতে এবার বেশ টাকা এসেছে। এদের ‘ক্যাশ’ আছে। এরা প্রকৃতপক্ষে কোরবানির বাজারের একটা বড় অংশ। অতএব, অনেকেরই আশা কোরবানির পশুর দাম পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাদ সেধেছে বন্যা। বন্যাকবলিত দেশের একাংশ এবং নতুনভাবে কবলিত হতে পারে এমন অঞ্চলে কোরবানির বাজার বসবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। আর সেটি বাস্তবে সত্য হলে এবার খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এদিকে রয়েছে চামড়ার বাজার। পশুর বাজারের সঙ্গেই সম্পর্কিত পশুর চামড়ার বাজার। বাংলাদেশের পশুর চামড়ার বাজার বেশ বড়। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার চামড়া ক্রয়-বিক্রয় হয়। সরকার এতে অর্থ জোগান দেয়।


খামারি, কোরবানিদাতা, ব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তার জন্য সরকার প্রতি বছর ঋণের ব্যবস্থা করে। এটা পান চামড়ার বড় বড় ব্যবসায়ী এবং চামড়া শিল্পের মালিকরা। এরা বরাবরাই ঋণখেলাপি। দু-একজন আছেন, যারা অর্থ পাচারকারী। এ খাতের ঋণের কোনো অর্থ ফেরত আসার ঘটনা বিরল। তবু এবার চামড়া ক্রয়ের জন্য ৫০০ কোটি টাকা ঋণের ব্যবস্থা করেছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক। দু-একটি বেসরকারি ব্যাংকও চামড়া খাতে ঋণ দেয়। এবারো দেবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সরকার যে উদ্দেশ্যে পশুর চামড়া ক্রয়ের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে, তা পরিপূর্ণ হবে তো? সরকারের কী উদ্দেশ্য? সরকারের উদ্দেশ্য কোরবানিদাতারা যাতে চামড়ার ন্যায্যমূল্য পান। রয়েছে এ ব্যবসায় অগণিত দালাল, ফড়িয়াসহ ছোট ছোট চামড়া ব্যবসায়ী। অনেক সময় এ ব্যবসায় নতুন নতুন ছোট ছোট মৌসুমি উদ্যোক্তাও যোগ দেন। আবার দেখা যায় চামড়ার ন্যায্যমূল্যের সুবিধাভোগী অনেক এতিমখানা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। গত বছর তা-ই হয়েছে। বস্তুত, প্রায় প্রতি বছরই বড় বড় চামড়া শিল্পের মালিক ‘মনোপলি’, ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি করে চামড়ার দাম কমিয়ে রাখেন। পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে লবণ লাগে। লবণ ব্যবসায়ীরা এখানে হস্তক্ষেপ করেন। লবণ ব্যবসায়ীদের অনেকে গুণ্ডা বাহিনী লাগিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। সরকার দাম বেঁধে দেয়। এ পর্যন্তই। তা বাস্তবায়ন হলো কিনা, তা কে দেখে? এ অবস্থায় হাজার হাজার ফড়িয়া, বেপারি, দালাল, ছোট ছোট চামড়া ব্যবসায়ী এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। লাভবান হন চামড়া শিল্পের মালিকরা। এবারো কি তা-ই হবে? হলে ভীষণ ক্ষতি হবে। সরকার ঋণের ব্যবস্থা করেছে, যাতে এর সুবিধা সবার মধ্যে ভাগাভাগি হয়। অর্থনীতি যাতে পুনরুজ্জীবিত হয়। এখানে চামড়া শিল্পের মালিকদের সহযোগিতা একান্ত দরকার। আরেকটা কথা বলা দরকার। ঈদ উপলক্ষে গ্রামাঞ্চল সাধারণত উজ্জীবিত হয়। ঈদে শুধু পশুই বিক্রি হয় না। কোরবানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার লোক। কোরবানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চাল, চিনি, মসলাপাতি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, সয়াবিন তেল ইত্যাদি বেচাকেনা বাড়ে। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বিক্রিও বাড়ে। মানুষ রেফ্রিজারেটর কেনে। দা-বঁটি কেনে মানুষ। এতে উপকৃত হন কামাররা। এসবের একটা অর্থনীতি আছে। যদি মঙ্গলাবর্তে ঈদ হয়। বন্যা পরিস্থিতির যদি আরো অবনতি না ঘটে তাহলে কোরবানির ঈদ ভালোভাবেই উদযাপিত হবে বলে আশা করা যায়। সরকারের নানা ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ কভিড-১৯-এর দাপট এখনো শেষ হয়নি। আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। তবে পরীক্ষার সংখ্যা কমছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের বাধা-নিষেধ থাকবে। এর মধ্যেই সবাই ঈদ উদযাপন করবেন। সাধারণত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঈদ উপলক্ষে একটা-আধটা বোনাস দেয়। এবার কি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তা দেবে না? না দিলে ঈদ উদযাপন উপলক্ষে বাজারে ক্যাশের ঘাটতি দেখা দেবে বৈকি।

 

ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক