আর সপ্তাহ খানেক আছে। ২০২০ সাল শেষ হতে যাচ্ছে। সরকারি হিসাবে ২০২০ সালের অর্ধেক পড়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে, আর শেষ অর্ধেক পড়েছে ২০২০-২১ অর্থবছরে। কেমন যাচ্ছে ২০২০ সাল তাহলে? প্রথম অর্ধেককে গত অর্থবছরে ফেলে হিসাব করলে বলা যায়, অর্থনীতি মোটামুটি ভালোই করেছে। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ—ভয়াবহ কভিড-১৯-এর বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের পরও। পরের অর্ধেক হচ্ছে জুলাই থেকে ডিসেম্বর। মারণাত্মক এই রোগের একদম যৌবনকাল। এখন চলছে তার দ্বিতীয় ঢেউ। সারা বিশ্ব নতুনভাবে আক্রান্ত, তটস্থ। হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। জনজীবন যেন অস্বাভাবিক। আমরা এর থেকে মুক্ত নই। এরই মধ্যে আসছে বড়দিন—খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পবিত্র দিন। তারপর ইংরেজি নববর্ষ, আমাদের ব্যাংকগুলোরও নববর্ষ। তাদের বার্ষিক হিসাব জানুয়ারি-ডিসেম্বর। কৃষকরা নতুন ধান—আমন বা অগ্রহায়ণি—ঘরে তুলছে। সামনে পৌষসংক্রান্তি, পৌষ মেলা। এদিকে চলছে মুজিব বর্ষের অনুষ্ঠান। ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। মার্চে আমাদের বাঙালির স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান। সব মিলে এ সময়টা স্বাভাবিক অবস্থায় থাকত উৎসবমুখর, আমদমুখর। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসায়িক লেনদেন হতো আশাব্যঞ্জকভাবে। মানুষের মুখে থাকত হাসি। কিন্তু না, বিধি বাম। কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের অর্থনীতির, ব্যবসার আলোচনা থেকে বিরত রেখেছে। মুখে মুখে এক কথা—কবে পাব টিকা—এই ভয়াবহ রোগ থেকে মুক্তি! এখন মানুষ মানুষের শত্রু। হাত মেলানো যায় না, দূরে দূরে থাকতে হয়, মাস্ক পরতে হয়। কারো বাসায় যাওয়া যায় না। করোনায় মৃত বন্ধু-আত্মীয়ের মরদেহ দেখতে যাওয়াও মানা। এমন এক অবস্থায় ডিসেম্বর ২০২০-এ এসে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতি স্তব্ধ হয়ে যায়নি। সমালোচক-অর্থনীতিবিদরা বলেছিলেন, (বণিক বার্তা ২১.৬.২০) ছয় মাস পর নোট ছেপে সরকারকে বেতন-ভাতা দিতে হবে। পাক্কা ছয় মাস চলে যাচ্ছে। সরকার বেতন দিতে পারছে না এমন কোনো খবর নেই। বরং বণিক বার্তা (১৪.১২.২০) বলছে, ‘অর্থ জোগান নিয়ে চাপে নেই সরকার।’ ভেতরে বলা হচ্ছে, ‘উল্টো করোনাকালেও বাড়ছে সরকারের রাজস্ব আয়। কমছে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা। মুদ্রাবাজারে অলস তারল্য সরকারের সুদব্যয়ও অনেক কমিয়ে এনেছে। সরকারের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও ফিরেছে রেকর্ড উদ্বৃত্তের ধারা। রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে বেড়ে চলেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সব মিলিয়ে মহামারীর দুঃসময়েও অর্থের সংস্থান ও উৎস নিয়ে সরকার বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই আছে।’ উদ্ধৃতিটি একটু বড় হয়ে গেল। তবু দিলাম, কারণ এরপর অর্থনীতি কেমন যাচ্ছে সে সম্পর্কে আলোচনার কিছু থাকে না। আর সরকার নোট ছেপে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দিচ্ছে কিনা সে সম্পর্কেও কোনো আলোচনার দরকার হয় না। মুশকিল হচ্ছে সারা বিশ্বসহ বাংলাদেশও যে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের সম্মুখীন, তা অনেকেই আমলে নিতে চায় না। এখন বাঁচার সময়, মানুষকে বাঁচানোর সময়, অর্থনীতি সচল রাখার সময়। নিরাপদে ও নিরাপত্তার সঙ্গে থাকার সময়। এ সময়ে অর্থনীতি-ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা বেশি বেশি বলা কি খুবই দরকারি? থাক, তার পরও মানুষ অর্থনীতির আলোচনা করে, ব্যবসার কথা আলোচনা করে, সঙ্গে সঙ্গে টিকার কথাও আলোচনা করে। আবার ঘরবন্দি মানুষ ঘরের বাইরেও যেতে চায়। মুক্ত পাখির মতো ঘুরে বেড়াতে চায়। বলাই বাহুল্য এটাই জীবন। এই আলোকে দেখলে অর্থনীতি একদম খারাপ করছে তা বলা যাবে না। সরকারি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, জুলাই থেকে নভেম্বরে দেশের রফতানি বেড়েছে ১ শতাংশ। মোট রফতানি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৯২ কোটি ডলার। পশ্চিমা বাজারগুলোর দেশে করোনার নতুন আক্রমণ। তাদের বড়দিন উদযাপন, নববর্ষ পালন দারুণভাবে বিঘ্নিত। এমতাবস্থায় আমাদের রফতানি পারফরম্যান্স খারাপ কী? অবশ্য আমদানি কিছুটা কমেছে। শিল্পপণ্য, মধ্যবর্তী পণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। সবচেয়ে লাভের কথা তেল আমদানি খরচ ভালোভাবে কমেছে। এসব কারণে আমদানি কিছুটা কমেছে জুলাই-অক্টোবরে। কিন্তু বেড়েছে, দারুণভাবে বেড়েছে রেমিট্যান্সের পরিমাণ। ২০২০ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর—এই পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪০ শতাংশেরও ওপরে। ভাবা যায়! আমাদের দরিদ্র গ্রামবাসী কৃষকভাইদের সন্তান এই দুঃসময়ে কী দারুণ সেবা দিয়ে যাচ্ছে দেশকে। তারা পাই পাই করে দেশে ডলার পাঠাচ্ছে। আমদানি খরচ কম, রেমিট্যান্স অনেক বেশি, রফতানি সামান্য বেড়েছে—এসবের ফল কী? ফল হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি। সর্বশেষ হিসাবে এর পরিমাণ ৪২ বিলিয়ন ডলার। বিজয়ের মাসে এ খবর বিস্ময়কর খবর। রিজার্ভের স্থিতি সন্তোষজনক হওয়ায় ডলারের মূল্য টাকার বিপরীতে স্থিতিশীল হয়ে রয়েছে। ৮৫-৮৬ টাকায় ১ ডলার, অথচ পাকিস্তানিদের ১৫০-১৬০ রুপি দিয়ে ডলার কিনতে হচ্ছে। ভাগ্যের কী খেলা। তারা বলেছিল স্বাধীন হলে তোমরা খাবে কী? এদিকে বিবেচ্য বিষয় আরেকটি। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বাড়লে তার চাপ পড়ে মূল্যস্ফীতিতে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তা নয়। গত মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। অথচ পূর্ববর্তী মাসেই তা ছিল ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। শীতের বাজার এখন। কয়েক দফা বন্যায় আমাদের সবজি ফসল নষ্ট হয়েছিল। দেরিতে উঠেছে শীতের শাকসবজি। বাজার এখন মাছ, শাকসবজি, মাংস, ডিম ইত্যাদিতে ভরপুর। উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে এসবের ক্রেতা নেই। ঢাকার বাজারে শাকসবজির দাম বেশ কমেছে। এটা অর্থনীতিতে একটা স্বস্তির খবর। যদিও চাল নিয়ে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী খেলা করছে বলে খাদ্যমন্ত্রী স্বয়ং অভিযোগ করেছেন। আমন এখন ঘরে ঘরে কৃষকরা তুলছে। ভরা মৌসুম এটা। এখন চালের দাম বাড়বে কেন? খেলোয়াড় ব্যবসায়ীরা যুক্তি দেখাচ্ছে, সরকারের গুদামে চালের স্টক কম। সরকার করোনার মধ্যে চাল বিতরণ করছে, খোলাবাজারে চাল বিক্রি করছে। অধিকন্তু আমন উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও চালের ঘাটতি নেই। যা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি আছে। তাহলে কেন এই মূল্যবৃদ্ধি। এ কাজটি একশ্রেণীর ব্যবসায়ী বরাবর করে। এবারো তারা তা-ই করছে।
এদিকে সরকারের প্রণোদনা প্রকল্পের কাজ যথারীতি এগিয়ে চলেছে। প্রথম দিককার জড়তা ব্যাংকগুলো কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালটি ব্যাংকগুলোর শেষ হয় একটা বড় ধাক্কা খেয়ে। তারা শিকার হয় সরকারের ‘৯-৬’ সুদনীতির। অর্থাৎ আমানতের ওপর সুদহার ৬ শতাংশ এবং ঋণের ওপর সুদহার ৯ শতাংশ। এই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এসে যায় কভিড-১৯-এর অভিশাপ। ব্যবসায় নামে মন্দা গতি। আসে সরকারের প্রণোদনা কর্মসূচির কাজ। কাজটি মূলত ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংকই ভরসা। ব্যাংকগুলো এতদিনে ধাতস্থ হয়েছে। সর্বশেষ পাক্কা খবর আমার কাছে নেই। তবে মনেই হয় বড় বড় গ্রাহক তাদের পাওনা নিয়ে নিয়েছে। সমস্যা এখনো চলছে ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা-শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে। সমস্যা রয়ে যাচ্ছে কৃষকদের নিয়ে। এসব নিয়ে ব্যাংকাররা ঝামেলায় পড়েন বরাবর। কারণ এসব ঋণ প্রসেসিংয়ে সময় লাগে। বিশেষ করে এবার ভাবতে হচ্ছে আদায় সমস্যা নিয়ে। টাকা আদায় না হলে সুদভর্তুকির টাকা পাওয়া যাবে না। ভীষণ শর্ত। এতে ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে ব্যাংকের মুনাফায়। এমতাবস্থায় বেসরকারি ঋণে রয়ে যাচ্ছে ঘাটতি। ব্যবসায়ীরা এখন ব্যস্ত যা আছে তা সামলাতে। নতুন শিল্প বা সম্প্রসারণের বিষয়টি এখন তাদের মাথায় নেই। ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। মুশকিল হচ্ছে গত অর্থবছরে এক্ষেত্রে অর্জিত হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এ প্রেক্ষাপটে এবারের বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হতে পারে। অথচ অর্থনীতিতে প্রচুর উদ্বৃত্ত তারল্য। তার মানে প্রচুর বিনিয়োগযোগ্য ‘ফান্ড’ অব্যবহূত রয়ে গেছে। বণিক বার্তার খবর থেকে বোঝা যায়, এখন ‘একসেস লিকুইডিটি’ ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। ফলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বাজার খুবই খারাপ। দেড় থেকে তিন-সাড়ে তিন শতাংশ সুদহার। লিকুইডিটির অবস্থা আরো শোচনীয় হতে পরে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ একই থাকলে, আমদানি কম থাকলে, রফতানি স্থিতিশীল থাকলে লিকুইডিটি আরো বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরো বাড়বে। এটা দৃশ্যতর ভালো সংবাদ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভালো খবর নয়। রিজার্ভের টাকার একটা অংশ থাকে দৈনন্দিন আমদানি ব্যয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আবশ্যকীয় ব্যয় মেটানোর জন্য। শিল্পের আমদানি চাহিদা না বাড়লে, ভোগ্যপণ্যের আমদানি চাহিদা না বাড়ালে রিজার্ভের টাকা মূল্যস্ফীতির জন্ম দিতে পারে। শিল্পের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সরকারি নথিতে ৫৮ হাজার ৮৩৬টি কারখানা নিবন্ধিত আছে। এর মধ্য ৮ হাজার ২৯টিই বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আছে অনেক তৈরি পোশাক কারখানা। এক হিসাবে দেখা যায়, লাখ খানেক শ্রমিকের চাকরি গেছে। এতে বোঝা যায়, শিল্পপণ্য আমদানিতে একটা বৃদ্ধির প্রবণতা নাও দেখা দিতে পারে। আবার ভোগ্যপণ্য আমদানি নির্ভর করে নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ভোগের ওপর। তাদের ভোগ চাহিদা না বাড়লে ভোগ্যপণ্যের আমদানি চাহিদা বাড়বে কীভাবে? দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্তের আয় কমে গেছে। সরকারের ‘৯-৬’ সুদনীতি এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। বহু লোক চাকরিচ্যুত, ব্যবসাচ্যুত। বহু পেশার লোকের নিয়মিত কাজ নেই। শ্রমিক শ্রেণীর লোকদের আয়ও কম। মাসিক ও দৈনিক আয় অনেক পরিবারের কম। আয়ের দিক থেকে একমাত্র ঠিক আছে সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তারা। অবশ্য তারা আর কতজন। আয় ঠিক আছে রেমিট্যান্স প্রাপকদের। তারা গ্রামের বাজারের চাহিদা-সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাছে।
২০২০-২১ অর্থবছরের আরো ছয় মাস বাকি। তাহলে বলা যায়, আগামী ছয় মাসে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। সরকারের রাজস্ব আয়ও একই কথা বলে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় ২০২০-২১-এর প্রথম পাঁচ মাসে সরকারের রাজস্ব কিছুটা বেড়েছে, যদিও তা লক্ষ্যমাত্রার নিচে। এর অর্থ অর্থনীতি পূর্বাবস্থায় আছে। ‘করোনার’ টিকা পাওয়া গেলে জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি আসবে। মানুষের ভয়ভীতি কাটবে। এর প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়বে। এসব বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে মনে হয় ২০২০-২১ অর্থবছর মোটামুটি কেটে যাবে। স্থিতাবস্থা রক্ষিত হলেও তা হবে একট বড় ঘটনা। কারণ অনেক দেশের ‘জিডিপি’ সংকুচিত হচ্ছে।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










