অর্থমন্ত্রী
মহোদয়ের বার্ষিক পরীক্ষা আগামীকাল, বৃহস্পতিবার, ৯ জুন। বরাবরের মতোই। তবে এবারের পরীক্ষা ভীষণ ব্যতিক্রমী, বলা যায় তার অগ্নিপরীক্ষা। তবে ঘটনা হচ্ছে এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও বিষয় এবার তার জানা। বিষয়: বাজেট ২০২২-২৩, আর কী কী প্রশ্ন তা বহুল আলোচিত। প্রশ্নের উত্তর দেবেন তিনি, আর দেশের ১৮ কোটি লোক তার উত্তর পরীক্ষা করে দেখবে। বিশেষ করে এবার খাতা বিশ্লেষণ করে দেখবেন ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা নন, খাতা পরীক্ষা করবেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষ। বাকিরাও দেখবেন, তবে এবার তা মুখ্য নয়। গেলবার মুখ্য ছিল, তাই বাজেটোত্তরকালে তিনি তার বাজেটকে বলেছিলেন ‘ব্যবসা-ব্যবসায়ীবান্ধব বাজেট’। তা করতে গিয়ে তিনি উজাড় করে দিয়েছিলেন তাদের। এবার কী করবেন? এবারের বাজেটের প্রশ্নপত্রে প্রশ্ন থাকবে দশাধিক কম করে। নম্বর ১০০। প্রথম প্রশ্নটিই হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দ্বিতীয় প্রশ্ন হবে ভর্তুকির ওপর। সার, তেল, গ্যাস, খাদ্য ইত্যাদির ওপর। তার পরের প্রশ্নটিই হবে সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। কী করে তিনি ক্ষুধার্ত, গরিব-দুঃখী, বেওয়া-বিধবা, বেকার, ছদ্মবেকার, চাকরিচ্যুত, কর্মচ্যুতদের খাওয়াবেন। এর লেজে লেজে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে থাকবে আরেক শ্রেণীর মানুষের বাঁচার প্রশ্নের কথা, যারা চক্ষুলজ্জায় হাত পাততে পারে না, অথচ আধপেটা থাকে, চিকিৎসাহীন থাকে, বাজারে যেতে ভয় পায়, সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণী। পরে সাথে সাথেই রয়েছে দৃষ্টির আগোচরে পড়ে থাকা ছোট, অতি ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজের মালিকরা, যাদের কথা কেউ বলে না। এভাবে প্রশ্নপত্রে ধীরে ধীরে আসতে থাকবে—বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কথা, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার কথা, আসবে ব্যাংকে সুদহারের পরিবর্তনের কথা, যা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে জড়িত ও সম্পর্কিত। অবশ্যই প্রশ্ন থাকবে রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর, যা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা দিতে নারাজ। কারণ তাতে ব্যবসার ক্ষতি হবে, রফতানির ক্ষতি হবে—আবার চাকরিজীবী ও মধ্য-আয়ীদের রাজস্ব দেয়ার ক্ষমতা নেই, থাকলেও সীমিত। থাকবে উন্নয়ন বাজেট বা উন্নয়ন প্রকল্পের কথা—বড় বড় মেগা প্রকল্পের কথা। এসব কি মন্থর করা হবে। করলে সিমেন্ট, ইট-বালি, রড-স্টিলের ব্যবসার কী হবে, কী হবে ব্যাংকের অবস্থা। আবার শোনা যাচ্ছে, প্রশ্ন থাকবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ কীভাবে দেশে ফেরত আনা যায় তার ওপরও। তালিকা বাড়ানো যায়। এতে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার আকার বড় হবে বৈকি। এমনিতেই তিনি তার কথা রাখতে পারেননি। মন্ত্রিত্ব গ্রহণের পর বলেছিলেন, তার বাজেট বক্তৃতা হবে খুবই ছোট। দেখা যাচ্ছে, সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত মুহিত সাহেব তার বক্তৃতা শেষ করেছিলেন ১৫৬ পৃষ্ঠার বাজেট ঘিরে। অথচ আ হ ম মুস্তফা কামাল সাহেবের আমলারা এরই মধ্যে তার হাতে ১৯২ পৃষ্ঠার বাজেট ধরিয়ে দিয়েছেন (২০২১-২২ বাজেট)। এমতাবস্থায় সংক্ষেপে তিনি কীভাবে এবারের পরীক্ষা দেবেন, তা নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। কোন প্রশ্নটির উত্তর তিনি প্রথম দেবেন? সব প্রশ্নই আগুনের মতো। হাত পোড়ে পোড়ে অবস্থা। তাই এবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের নৈপুণ্য, দক্ষতা, কুশলতা, সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ইত্যাদি সবকিছু দারুণ পরীক্ষার সম্মুখীন।
বাজেটকে দেখা যায় অনেক দৃষ্টিতে। সাধারণ মানুষ, মধ্যবিত্তের দৃষ্টিতে, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দৃষ্টিতে, আবার দেখা যায় রাষ্ট্রনেতার দৃষ্টিতে। রাজনৈতিক নেতারা দেখেন এক দৃষ্টিতে, আবার ‘স্টেটসম্যান’রা দেখবেন অন্য দৃষ্টিতে। এবার গেল কভিড-১৯-এর ভয়াবহ বিপর্যয়। এ বিপদ কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেনের অযাচিত যুদ্ধ। সারা বিশ্ব এখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন। শ্রীলংকা ডুবেছে, পাকিস্তান ডোবে ডোবে। দুই জায়গাতেই সরকার বদল হয়েছে। তুরস্কে মূল্যস্ফীতির হার ৭০-৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। ইউরোপ-আমেরিকা মূল্যস্ফীতিতে আক্রান্ত। খাদ্যের অভাব হচ্ছে অনেক দেশে। দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছেন অনেকেই। উন্নয়নের কথা এখন কোথাও নেই। সর্বত্র ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। প্রাণে বাঁচার প্রচেষ্টা। কতদিন এমনভাবে চলবে, তা কেউ জানে না। কারণ অনেকেরই মতে, এটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নয়। এটা কার্যত রাশিয়া-আমেরিকা ও ইউরোপের যুদ্ধ। ছায়া যুদ্ধ। যতই দিন যাচ্ছে ততই বাড়ছে অনিশ্চয়তা, বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। বিশেষ করে চাল-ডাল-নুন-তেল, ভোগ্যপণ্যের মূল্যে লেগেছে পেট্রলের আগুন। আমরাও এর থেকে মুক্ত নই। আমদানির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ডলারের দাম বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। আমদানি অনেক বেশি, রফতানি কম, রেমিট্যান্স কম। বোরো আমাদের প্রধান ফসল—তা উঠেছে। সিলেটে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বন্যা আক্রান্তও সিলেট। এমতাবস্থায় ভরা মৌসুমেই চালের দাম বাড়ছে। গরিব মানুষ কেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জান যায় যায়। এর মধ্যে গ্যসের দাম বাড়ানো হয়েছে। খবর মিলছে, বিদ্যুৎ
ও তেলের দাম বাড়বে। কারণ ভর্তুকি হ্রাস ছাড়া গতি নেই। যদি তা-ই হয় তাহলেই মরণ এবার। বর্তমান বাজারেই প্রাণ ওষ্ঠাগত। আরেক দফা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের দাম বাড়লে বাজারের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়া হবে। এই মুহূর্তে মানুষের সব চিন্তা এখানেই সীমাবদ্ধ। বাজেটে না জানি কী হয়! কেউ ‘প্রবৃদ্ধির হার’ নিয়ে এখন ভাবিত নয়। প্রবৃদ্ধি দিয়ে কী হবে, যদি পেটে ভাত না থাকে; বিদ্যুৎ, ফ্রিজ, টেলিভিশন না চলে, গাড়ি না চলে। উপরন্তু সাধারণ মানুষ যদি খেতে না পায়। এখন পর্যন্ত সরকার এক্ষেত্রে ভালো করেছে। আগামীতে কী করবে তা-ই সবার চিন্তা। মূল্যস্ফীতির কবল থেকে মানুষকে কীভাবে বাঁচানো যায়। সব কুল রক্ষা করে সর্বোচ্চ অধিকার দিতে হবে গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে বাঁচাতে। গরিবদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়বে—আকারে ও পরিমাণে। তা হতেই হবে। দরিদ্রদের স্বল্পমূল্যে, বিনামূল্যে খাবার দিতেই হবে। ছোট ছোট ও অতিক্ষুদ্র গ্রামীণ উদ্যোগগুলোকে বাঁচাতে হবে। খোলাবাজারে পণ্য বিতরণ অব্যাহত রাখতে হবে। লোকের কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। মূল্যস্ফীতির কবল থেকে মানুষকে বাঁচাতে হলে দুটো পদক্ষেপ দরকার হবে। দরিদ্রদের জন্য, অতিদরিদ্রদের জন্য এক ব্যবস্থা, আবার নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য আরেক ব্যবস্থা। গরিব ও অতিদরিদ্রদের জন্য চিন্তাভাবনা হয়। সবাই তাদের কথা বলে। বলতেই হবে। তবে একশ্রেণীর লোকের কথা কেউ বলে না। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা তাদের নিজেদের কথা বলে। গরিব ও অতিদরিদ্রদের কথা আমরা সবাই বলি। কিন্তু যারা দুঃখে আছে, কষ্টে আছে অথচ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না, যারা টিসিবির ট্রাক সেলে লাইন দিয়ে পণ্য তুলতে পারে না তাদের কথা কেউ বলে না। এমনকি নগর দরিদ্রদের কথা বলার লোকও আছে। অথচ যে মধ্যবিত্তকে সবাই বলে তারাই হচ্ছে বাজার অর্থনীতির প্রাণ। তাদের কথা কেউ বলে না। কিন্তু তারা যে দিনে দিনে নিঃশেষ হচ্ছে তার খবর কি বাজেটপ্রণেতারা রাখেন?
কিছুদিন আগেই ইকোনমিস্টের একটা প্রতিবেদনে আমেরিকার মধ্যবিত্তের করুণ সব কাহিনী পড়লাম। যুবক-যুবতীরা সংসার করে না। কারণ সংসার চালানোর মতো আয় নেই। সন্তান নিতে পারে না। কারণ সন্তানের দুধের পয়সা তাদের নেই। তাদের মাথার ওপর ছাউনি নেই। চিকিৎসার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। হতাশায় তারা এখন মাদকগ্রস্ত হচ্ছে। সপ্তাহের দুদিন ড্রাগ নিয়ে দুনিয়া ভুলে থাকতে চাইছে। আমরা নিশ্চয়ই এমন বাংলাদেশ চাই না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত জড়িত। তাদের আকাঙ্ক্ষাই জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশকে। অথচ সেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত হারিয়ে যাচ্ছে—অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে। দেশ হয়ে পড়ছে শুধু ধনী ও দরিদ্রদের দেশ। এটা কাম্য নয়। তাদের আয়ের উৎস সংকুচিত। সঞ্চয়পত্রের সুদহার হ্রাস করা হচ্ছে, এর ঊর্ধ্বতম সীমা কমানো হয়েছে সুদ খরচের কথা বলে (অথচ সর্বত্র অদক্ষতা, চুরি, অপব্যয়, মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়)। আবার কমানো হয়েছে ব্যাংকের আমানতের ওপর সুদহার। এবার কী করবে সরকার? বাংলাদেশ ব্যাংক ‘রেপো’ হার বাড়িয়েছে। ডলারের দর ঠিক করবে বাজার। তাহলে আমানতের সুদহার নির্ধারণের বিষয়টি বাজার প্রতিযোগিতার ওপর ছেড়ে দেয়া হবে না কেন? আমানতের সুদহার বাড়লেও মধ্যবিত্তের সুদ আয় কিছুটা বাড়ে। বয়স্কদের জন্য ১ শতাংশ সুদ বেশি দেয়া যায় নাকি? এবারের বাজেটে এসব চিন্তা থাকবে কি? থাকা দরকার। কারণ তাদের আয়, বাজারে যাওয়ার টাকা না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য সবই অচল হবে। শুধু বিদেশী বাজারের ওপর নির্ভরশীলতার পথ যে কত আত্মধ্বংসী তার উদাহরণ শ্রীলংকা। এমনকি চীনও অভ্যন্তরীণ বাজারে গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারত বলছে ‘আত্মনির্ভর ভারত’।
গরিবদের খাবার জোগানো, মধ্যবিত্তের আয়বর্ধন, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি, বেকার ও কর্মহীনদের বাঁচানোর ব্যবস্থা, দুস্থ মানুষকে রক্ষা করা, দুর্বল শ্রেণীর মানুষের পাশ দাঁড়ানোর প্রশ্নেই এবার অর্থমন্ত্রী মহোদয়কে কুশলী হতে হবে। প্রশ্ন তাহলে রাজস্ব আসবে কোথা থেকে? শ্রীলংকা অতিরিক্ত হারে ব্যবসায়ীদের কর কমিয়ে, ব্যবসায়ীদের নানা সুবিধা দিয়ে আজ বিপদে পড়েছে। আমাদের সে পথে এগোতে হবে না। একটা উদাহরণ দিই ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের’ ওপর নির্ভর করে পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে ‘ক্যাশ প্রণোদনা’ দেয়া হয়। খবরের কাগজে দেখলাম ‘ভ্যালু অ্যাডিশন’-এর হার কমিয়ে তাদের এবার নগদ প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। কেন? এ শিল্পের বয়স কত? ‘ভ্যালু
অ্যাডিশন’ বাড়ানোর জন্য দেশীয় শিল্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। তাহলে ‘ভ্যালু অ্যাডিশন’ কমবে কেন? যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রথম মেয়াদে শুক্র ও শনিবার ছুটি ঘোষণা করেন তখন বলা হয়েছিল পোশাক শিল্প ‘শেষ’। কোটা তুলে দেয়ার পরও বলা হলো এ শিল্প ‘শেষ’। কি শিল্পটি ‘শেষ’ হয়েছে, না তার রফতানি শনৈঃ শনৈঃ বেড়েছে। তার পরও কেন এই অযৌক্তিক সুবিধা এবার দেয়া হলো? এ উদাহরণ দিয়ে আমি বলতে চাই প্রয়াত মুহিত সাহেবের কথা, প্রয়াত সাইফুর রহমানের কথা। তারা উভয়ই ভিন্ন সময়ে বলেছেন, ‘একশ্রেণীর
ব্যবসায়ী শুধু নিতেই জানে, দিতে জানে না।’ দেয়া তো দূরের কথা, বরং অনেকেই টাকা বিদেশে নিয়ে গেছেন। এমতাবস্থায় অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের কাজ হবে এবার বড় বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিকে বলা, দেশের জন্য কিছু অবদান রাখতে, যাতে সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বহাল রাখতে পারে। যাতে অর্থনীতির সামগ্রিক কাঠামোটি ঠিক রাখা যায়। আজকের আলোচনায় আমি শুধু মূল্যস্ফীতি ও আয়বর্ধনের দিকেই দৃষ্টি দিয়েছি। বাকি বিষয় যথাযথ অগ্রাধিকার পাবে সন্দেহ নেই। তবে এবারের বাজেট হোক ‘দরিদ্র, অতিদরিদ্র ও মধ্যবিত্তবান্ধব বাজেট’। এর জন্য যা যা করা দরকার তা-ই করা হোক।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










