মব সহিংসতাকে প্রায়ই হঠাৎ ঘটে যাওয়া, আবেগপ্রসূত ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। এ বর্ণনা সুবিধাজনক। এতে মবকে উন্মত্ততার বিস্ফোরণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ উপেক্ষা করা হয় সেই ব্যবস্থাকে, যা নিরন্তর হতাশা, ক্ষোভ ও বাতিলযোগ্য মানুষ উৎপাদন করে। কিন্তু মব কোথাও থেকে হঠাৎ জন্ম নেয় না। এটি কাঠামোগত সহিংসতার দৃশ্যমান রূপ।

মব সহিংসতাকে আইনহীনতা বললে মূল বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মনে হতে পারে সহিংসতার ঘটনাগুলো শৃঙ্খলার অনুপস্থিতি থেকে তৈরি। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে এর মধ্যেও একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

মব সহিংসতার ভিত্তি কী? এ প্রশ্নের নানা উত্তর হতে পারে। রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব, অনানুষ্ঠানিক শ্রম, স্থবির মজুরি ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি একটি ধ্বংসোন্মুখ জনগোষ্ঠী তৈরি করে, যারা সবসময় অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের মধ্যে সংহতি নেই, কারণ তারা টিকে থাকার প্রাণপণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ভয়টা তারা চর্চা করে সামাজিকভাবে। এ পরিস্থিতিতে সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র নয়। এর মাধ্যমে মানুষ সেই ব্যবস্থার ভেতর থেকে কিছু এজেন্সি পুনরুদ্ধার করতে চায়, যা তারা মনে করে তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে মব সহিংসতা অযৌক্তিক নয়। এটি ভুল পথে পরিচালিত যুক্তিবোধ।

বিশেষত গ্লোবাল সাউথে পুঁজিবাদী অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে অসম বিকাশের ওপর। সম্পদ ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। ফলে আঞ্চলিক ও শ্রেণীগতভাবে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে বাদ পড়ে যায় উল্লেখযোগ্য একটা অংশ। অথচ বাজারের অস্থিরতার সামনে তাদের রাখা হয় পুরোপুরি উন্মুক্ত। এ বৈপরীত্যগুলো সামাল দেয়ার বদলে রাষ্ট্র প্রায়ই অবহেলা বা বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। কল্যাণের জায়গা নেয় পুলিশি ব্যবস্থা, পুনর্বণ্টনের জায়গা নেয় নজরদারি। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ হঠাৎ শান্তিপ্রিয় উদারপন্থী হয়ে উঠবে কীভাবে? তারা যে তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান শত্রু খুঁজে নেবে—এটাই কি স্বাভাবিক নয়?

মব সহিংসতাকে আমরা বিক্ষিপ্ত জনস্রোত হিসেবে দেখি। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তা বিক্ষিপ্ত। এর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। অভিবাসী, সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী, নারী, ধর্মীয় ‘অপর’ গোষ্ঠী। এ লক্ষ্যগুলো কাকতালীয়, তা কিন্তু না। রাজনৈতিক অভিজাত, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা নির্মিত বয়ান থেকেই এগুলো তৈরি হয়। যখন অর্থনৈতিক ক্ষোভকে ঊর্ধ্বমুখী করা যায় না, তখন তা পাশের দিকে প্রবাহিত হয়। এটাকে যুক্তির ব্যর্থতা না বলে ক্ষমতার সাফল্য বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

এতে অভিজাতরা দ্বিগুণ লাভবান হয়। প্রথমত, কাঠামোগত শোষণ অক্ষত থাকে। দ্বিতীয়ত, দরিদ্রদের মধ্যকার সহিংসতা আরো দমনপীড়নের বৈধতা উৎপন্ন করে। কারফিউ, জরুরি আইন, বর্ধিত পুলিশি ক্ষমতা ইত্যাদির পথ প্রশস্ত হয়। রাষ্ট্র নিজেকে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী নিরপেক্ষ মধ্যস্থ হিসেবে হাজির করে। কিন্তু বাস্তবে সে নিজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিণতিই সামাল দেয়। এ অর্থে, মব সহিংসতা রাষ্ট্রবিরোধী নয়। বহু ক্ষেত্রে এটি রাষ্ট্রের সমান্তরালে চলে।

অনেক সময় মব কার্যত নীরব অনুমোদন পায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অন্ধের মতো আচরণ, মামলা ও বিচারের ধীরগতি ইত্যাদির মারফত। রাজনৈতিক নেতারা সহিংসতার নিন্দা করেন বটে, কিন্তু ভুক্তভোগীর নাম উচ্চারণ করেন কমই। এর একটা অস্বস্তিকর দিক হলো, মব প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস রক্ষার অনানুষ্ঠানিক বাহিনী হিসেবেও কাজ করতে পারে। তারা এমন কাজ করে যা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকাশ্যে করতে পারে না।

কেন ট্রানজিশন পিরিয়ডে মব সহিংসতা বেড়ে যায়? রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণে এর উত্তর মিলবে। নির্বাচন, অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারী, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন—এ সময়গুলো অনিশ্চয়তা বাড়ায়। যারা আগে থেকেই প্রান্তিক, তাদের কাছে এ অনিশ্চয়তা মড়ার ওপর খাড়ার ঘাঁ হয়ে দাঁড়ায়। তখনই সামাজিকভাবে চর্চিত সেই বিলুপ্তির ভয় হয়ে ওঠে আরো বেশি সুসংগঠিত।

সুতরাং শুধু মবকে দোষারোপ করা মানে ব্যবস্থাকে দায়মুক্ত করা। এ ব্যাপারে উদারপন্থী প্রতিক্রিয়া আমাদের পরিচিত। আইন-শৃঙ্খলা, নাগরিক শিক্ষা, নৈতিক সংযমের আহ্বান—এ সমাধানগুলো সহিংসতাকে স্রেফ আচরণগত সমস্যা হিসেবে দেখে, কাঠামোগত ফলাফল হিসেবে নয়।

মব সহিংসতা কমাতে হলে যেসব শর্ত এটাকে কার্যকর করে তোলে সেগুলো ভাঙতে হবে। এর মানে চ্যারিটি নয়, প্রয়োজন সম্পদের পুনর্বণ্টন; রাজনৈতিক ভাষণ নয়, প্রয়োজন কর্মসংস্থান; নির্বাচনী ইশতাহার নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি। মবকে রাজনীতির বিপরীত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর স্বতন্ত্র রাজনীতি আছে। সেই রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ জরুরি। সামাজিক শান্তিকে নিছক সাংস্কৃতিক মুক্তির ছাঁচে ফেলে দেখলে চলবে না, এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক অর্জনটাও নিশ্চিত করতে হবে।

যতদিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সামাজিক স্থিতিশীলতায় অংশীদারত্বহীন উদ্বৃত্ত মানুষ তৈরি করতে থাকবে, ততদিন মব বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, নিয়মিত স্মারক হিসেবেই ফিরে ফিরে আসবে আর মনে করিয়ে দেবে, কাঠামোগত সহিংসতা শেষ পর্যন্ত একটি শরীরী রূপ দাবি করে।

আরাফাত ইমরান: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়