ঢাকার যানজট নিত্যদিনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। দিন দিন ব্যস্ত এ নগরীতে বেড়েই চলেছে দুর্ভোগ। যদিও যানজট কমাতে ব্যবস্থা যে নেয়া হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। দুর্ভোগ কমাতে বাস্তবায়ন করা হয়েছে ও হচ্ছে বড় বড় প্রকল্প। নির্মাণ করা হয়েছে সড়ক, মহাসড়ক, ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো আধুনিক সব যোগাযোগ ব্যবস্থাও। তবে কোনো কিছুই নগরবাসীকে একটু স্বস্তি এনে দিতে পারছে না। বরং চলমান মেগা প্রকল্পগুলো চলাচলে দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। তার ওপর সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজধানীর দুর্ভোগে নতুন সংযোজন মোটরসাইকেলে অনিয়ন্ত্রিত রাইড শেয়ারিং। বিপুলসংখ্যক বাইকচালকের দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

রাজধানীতে নিয়মিত চলাচল করা মানুষের কাছে বিরক্তিরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বাইকচালকরা। ফুটপাত বা সড়কের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাদের কোথায় যাবেন প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়। পরিস্থিতি এমন যেন রাইড নিতেই আপনি রাস্তায় নামছেন। আপনি রাস্তার এক পাশ থেকে আরেক পাশে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন, সেখানেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে ‘যাবেন কোথায়?’

কয়েক বছর থেকেই রাজধানীতে বাড়ছে মোটরসাইকেল ব্যবহার। বিশেষ করে করোনা মহামারী শুরুর পর গণপরিবহনে চলাচল কভিড সংক্রমণের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বাহনটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে তীব্র যানজটের এ শহরে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে মোটরসাইকেলের বিকল্পও খুব কম। তবে অনিয়ন্ত্রিত এ পরিবহন ব্যবস্থাটি অনেক দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ।

মহামারীর শুরুর দিকে বাইকে রাইড শেয়ারিং উবার ও পাঠাওয়ের মতো অ্যাপভিত্তিক ছিল। কিন্তু অধিক লাভের জন্য তারা এখন অ্যাপের পরিবর্তে সরাসরি ভাড়া মিটিয়ে যাত্রী পরিবহন করতেই বেশি পছন্দ করছেন। এড়িয়ে চলছেন অ্যাপভিত্তিক রাইড। এটা চালক ও যাত্রী উভয় পক্ষের জন্যই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ রাইড শেয়ারিংয়ে ছিনতাই এমনকি খুনের মতো ঘটনাও সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। যদিও অ্যাপভিত্তিক হলে সেখানে চালক ও যাত্রীর সব তথ্য সংরক্ষিত থাকায় এমন ঘটনার ঝুঁকি কমে যায়। সেক্ষেত্রে এমন ঘটনায় তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যায়। এমন কয়েকটি ঘটনা তদন্ত করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও চালক ও যাত্রীদের প্রতি অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের আহ্বান জানিয়ে আসছে বারবার।

এখন ঢাকার রাস্তায় নামলেই মনে হয় মোটরসাইকেল যেন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। সড়কের মোড়ে মোড়ে এমনকি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকছেন অনেক চালক। আবার দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে তারা অবৈধ বিকল্প পথও বের করছেন। ফুটপাতের ওপর দিয়ে বাইক চালানো নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ব্যস্ত এ নগরীর ফুটপাতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বিকট হর্নের শব্দে আঁতকে উঠতে হয়। হাঁটার রাস্তায় জায়গা করে দিতে হয় বাইকচালককে।

ঢাকাকে বলা হয় রিকশার নগরী। তিন চাকার এ বাহন বাংলাদেশের বাইরে আর কোনো দেশেই এত পরিমাণে নেই। ঢাকার বিশাল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রিকশার ওপর নির্ভরশীল। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকডর্সের ২০১৫ সালের প্রকাশনা অনুযায়ী, ঢাকার ৪০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত চলাচলের ক্ষেত্রে রিকশা ব্যবহার করে। তবে বর্তমানে ঢাকার সড়কে তাকালে রিকশার চেয়ে মোটরসাইকেলই বেশি দেখা যায়। রাইড শেষ করতে তারা এত দ্রুত বাইক চালায় যে পেছনে বসে বারবার সাবধানে চালানোর কথা বলতে হয়। একটু ফাঁকা জায়গা পেলে সেখান দিয়েই যাওয়ার চেষ্টা করেন তারা। হরহামেশাই ভাঙছেন সিগন্যাল থেকে শুরু করে গতিসীমা পর্যন্ত সব ট্রাফিক আইন। এতে সড়কে বাড়ছে বিশৃঙ্খলা। প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।

গত ২০ নভেম্বর প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ১৯ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৩টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বছরের প্রথম ১০ মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৭৬৪ জন ছিল শিক্ষার্থী, যা মোট মৃত্যুর ৩৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এছাড়া নিহতদের মধ্যে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ মোটরসাইকেলে আঘাতপ্রাপ্ত পথচারী।

আবার রাজধানীতে বিদ্যমান গণপরিবহনের বাস্তবতায় মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিংকে অস্বীকার করার উপায় নেই। ট্র্যাফিক জ্যামে বিপর্যস্ত এ শহরে একটু দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার জন্য অনেকে বাধ্য হয়েই বাইকচালকের শরণাপন্ন হন। আবার খাতটিতে এখন বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানও রয়েছে। এজন্য গণপরিবহনের অংশ হিসেবে মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিংকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। যেভাবে দিনকে দিন মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে একদিন এটি রাজধানীর গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে। কারণ অদক্ষ, বেকার ও সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা নামমাত্র কাগজপত্রে মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ছেন বাড়তি উপার্জনের আশায়।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, দেশে যে পরিমাণ নিবন্ধিত মোটরসাইকেল আছে তা মোট যানবাহনের ৭০ শতাংশ। আর শুধু ঢাকা শহরেই নিবন্ধিত মোটরসাইকেল সাড়ে চার লাখের মতো। ২০২১ সালে সারা দেশে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ১৫০টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে। এ সময়ে রাজধানীতেই নিবন্ধিত হয়েছে প্রায় এক লাখ মোটরসাইকেল।

এমনিতেই ঢাকার ফুটপাতগুলোর পুরোটা নগরবাসী ব্যবহার করতে পারে না, বেশির ভাগই দখল হয়ে আছে। অবৈধ পার্কিংয়ের মাধ্যমে দুই লেনের সড়ককে অর্ধেক লেনে নামিয়ে এনেছে যাত্রীবাহী লোকাল বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন। কোথাও কোথাও সড়কের একাংশ দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ট্রাক-টেম্পো-লেগুনা-অটোস্ট্যান্ড। দখল হয়ে গেছে বিভিন্ন ফ্লাইওভারের নিচের অংশও। বিভিন্ন বাস টার্মিনালের সামনের রাস্তাগুলো পরিণত হয়েছে পার্কিং জোনে। এছাড়া ঢাকার প্রায় সব সড়ক ও ফুটপাতের একাংশ চলে গেছে হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানির দখলে। সড়কের জায়গা দখল করে প্রতিনিয়ত ভাড়া আদায় করছে প্রভাবশালীরা।

তাছাড়া অনেক আগে থেকেই ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। খোঁড়াখুঁড়ি, কাটাকুটি, নতুন নির্মাণ, মেগা প্রকল্প, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা এবং মৌসুমি বৃষ্টিতে অধিকাংশ রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এসব রাস্তায় চলতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথেই কাটাতে হচ্ছে নিরূপায় নগরবাসীকে। 

রাজধানীর সড়কগুলোয় চলমান থাকা উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্পগুলোও দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ দুর্ভোগ একদিন, সপ্তাহ বা মাসের নয়। এ অবস্থা চলছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। কিন্তু নগর কর্তৃপক্ষ অথবা সরকারের কোনো পর্যায় থেকেই এ দুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমন অবস্থায় নগরবাসী যেন অসহায়, নিরুপায়।

 

মো. শিহাবুল ইসলাম: সাংবাদিক