নতুন শিক্ষাক্রমের বিজ্ঞান বই নিয়ে কিছু আলোচনা-সমালোচনা মূল ধারার সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও লক্ষ করা যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা বা আগ্রহ নিঃসন্দেহে ভালো খবর। প্রথমেই উল্লেখ করতে চাই, আমি এ বিজ্ঞান বই লেখার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমরা যারা এ বিজ্ঞান বই লেখার সঙ্গে জড়িত ছিলাম তারা অনেক পরিশ্রম করে বইগুলো লেখার চেষ্টা করেছি। যেহেতু পরীক্ষামূলক সংস্করণ, বইগুলোয় কিছু ভুলত্রুটি থাকতে পারে। যেকোনো ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিলে সেগুলো শোধরাতেও আমরা সচেষ্ট থাকব। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণীত ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর বিজ্ঞান অনুসন্ধানী পাঠ এবং অনুশীলন বইগুলোর ভালো বা ইতিবাচক দিকগুলো অনেক আলোচনা-সমালোচনার ভিড়ে খুব কমই দৃষ্টি পাচ্ছে। অথচ ইতিবাচক দিকগুলো হচ্ছে এ শিক্ষাক্রমের অন্যতম ভালো লাগার বিষয়। যাই হোক এ সম্পর্কে আমার কিছু ভাবনা তুলে ধরছি: 

১। আমাদের সবারই চাওয়া ছিল ছাত্রছাত্রীদের জন্য সহজে বোধগম্য বই প্রণয়ন করা। এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করার চেষ্টা করেছি। নতুন শিক্ষাক্রমে বিজ্ঞানের জন্য দুটি বই নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘‌অনুসন্ধানী পাঠ’ বইটিতে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের যেসব বিষয় জানতে হবে সেগুলো অধ্যায় অনুযায়ী সাজানো আছে। আর ‘‌অনুশীলনী বই’-এ বছরজুড়ে শিক্ষার্থীরা যেসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শিখবে সেগুলোর বর্ণনা ও নির্দেশনা দেয়া আছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর অনুসন্ধানী পাঠ বইয়ে যথাক্রমে ১৬টি ও ১৫টি অধ্যায় রয়েছে। এছাড়া অনুশীলন বইয়ে শিখন অভিজ্ঞতা রয়েছে যথাক্রমে ১৭টি ও ১২টি। এ বইগুলোর বিষয়বস্তু ওই শ্রেণীর জন্য উপযোগী করে নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে এবং এসব ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের জন্য যাতে সহজে বোধগম্য হয় বা তারা যেন নিজেরা পড়েই কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে পারে সে দিকটায় খেয়াল রাখা হয়েছে। 

২। পঞ্চম শ্রেণীতে যেহেতু নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে আসেনি, সেজন্য পরবর্তী শ্রেণীগুলোয় তারা কোন কোন বিষয়বস্তু পড়েছে তা দেখে নেয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণী ও তার পরবর্তী শ্রেণীগুলোতে বিষয়বস্তুর একটি ম্যাপিং করা হয়েছে, যাতে ষষ্ঠ শ্রেণীর বিজ্ঞান বই পড়তে এসে ছাত্রছাত্রীদের সুবিধা হয়। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে অনেকের মধ্যেই একটা উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে যে এখানে বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু কমিয়ে ফেলা হয়েছে বা বিজ্ঞানকে গুরুত্ব কম দেয়া হয়েছে। তাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষাক্রম রচনার সময়েই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষার পূর্বযোগ্যতা বিবেচনায় রেখে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুর একটা খসড়া ম্যাপিং করা হয়েছে যাতে এ ঝুঁকি না থাকে। অষ্টম ও এর পরবর্তী শ্রেণীগুলোর শিক্ষাক্রম চূড়ান্তকরণের সময় এনসিটিবি প্রয়োজনে এই ম্যাপিং পুনরায় নিরীক্ষণ করবে। 

৩। এ শিক্ষাক্রমের একটি বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে মুখস্থনির্ভরতা, গাইডবই, নোটবইয়ের নির্ভরতা কমানো বা একেবারেই নির্ভর না করা। তারা শিখবে বা জানবে অভিজ্ঞতার আলোকে। এখানে উল্লেখ্য, অনুশীলন বইটিতে বিভিন্ন শিখন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কীভাবে কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। 

৪। বইগুলো ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। উল্লেখিত অনুশীলন বই প্রথমবারের মতো ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এ অনুশীলন বইয়ের উপকারিতা ছাত্রছাত্রীরা পাবে এমন ধারণা থেকেই এ প্রচেষ্টা। 

কোনো বিষয়বস্তুকে সহজভাবে অনুধাবন করতে হলে অভিজ্ঞতার আলোকে জানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা তেমনই বিভিন্ন ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অনেকগুলো বিষয়বস্তু একসঙ্গে জানার ও বোঝার সুযোগ পাবে। 

৫। ষষ্ঠ শ্রেণীর বইগুলো নিয়ে ২০২২ সালে সারা দেশের ৬২টি স্কুলে পাইলটিং কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এ কার্যক্রমে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মতামত এমনকি স্কুল পরিচালনায় যারা যুক্ত থাকেন তাদের মতামতকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং যা হওয়া উচিত। বছরজুড়ে বিভিন্ন অংশীজনের এসব মতামত যাচাই করে সে অনুযায়ী শিখন কার্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকগুলো রিভিউ করা হয়েছে। সুতরাং এ যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম যখন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে তখন ছাত্রছাত্রীরা এর সুফল ভোগ করবে বলে আমরা আশাবাদী। 

৬। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বিভিন্ন দেশে চালু হয়েছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এবং চতুর্থ শিল্প বিল্পবের কথা চিন্তা করেও আমাদের শিক্ষাক্রমকে আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করার প্রয়োজন ছিল। এই লক্ষ্যে নতুন শিক্ষাক্রম শুরু করার ব্যাপারে অন্যান্য উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই। এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। 

৮। ষষ্ঠ শ্রেণীর বিজ্ঞান বিষয়ের জন্য পাইলটিং কার্যক্রমে যুক্ত শিক্ষকদের নিয়ে একটি গ্রুপ রয়েছে, যেখানে শিক্ষকরা কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোচনা করতে চাইলে সে সুযোগ রয়েছে। এ গ্রুপে শিক্ষকদের জন্য কোনো তথ্য থাকলে তা উপস্থাপন বা জানানোরও সুযোগ রয়েছে। আমার কাছে এ বিষয়গুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী মনে হয়। আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা চাইলে বইয়ের লেখকদের সঙ্গেও যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। সুতরাং কোনো বিষয়ে জানার থাকলে তারা তা সেখানে উপস্থাপন করতে পারছেন।

৯। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ অনেক। এসব চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও নতুন নতুন উদ্যোগের প্রয়োজন হতে পারে। নতুন এসব চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করতে হবে। আমাদের বসে থাকার সুযোগ নেই। তা না হলে আমাদের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাও থেকে যায়। 

১০। একটি অভিজ্ঞতার কথা বলে লেখাটি শেষ করতে চাচ্ছি। আমার সুযোগ হয়েছিল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গিয়ে নতুন শিক্ষাক্রম কীভাবে শিক্ষকরা পরিচালনা করছেন, ছাত্রছাত্রীরাই বা বিষয়টি কীভাবে নিয়েছে এবং অভিভাবকদের মতামত কী তা দেখার। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে যখন অভিভাকদের সঙ্গে কথা বলি, তারা প্রায় সবাই ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, তাদের সন্তানরা স্কুলে যেতে আগের থেকে বেশি আগ্রহী হচ্ছে এবং তারা স্কুলে যা যা করছে তা বাড়িতে গিয়ে তাদের বাবা মা বা অভিভাবকদের সঙ্গে শেয়ার করছে। যেমন একজন অভিভাবক বলেছিলেন, ‘‌ছেলে তো বাসায় এসে আকাশের তারা দেখে এবং আমাকেও ঘরের বাইরে এনে তারা দেখতে বলছে। ভালোই হলো, ছেলের কারণে অনেক দিন পর আকাশের দিকে তাকানো হলো’। এ বিষয়টি বলতে গিয়ে অভিভাবককে বেশ উৎফুল্ল মনে হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য, ষষ্ঠ শ্রেণীর বিজ্ঞান অনুশীলন বইটিতে ‘‌আকাশ কত বড়?’ শিরোনামে একটি শিখন অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে যা তাদের মহাকাশ সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে। 

ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান খান: অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট