আজ দুই মাসের ওপরে গৃহবন্দি—এ কথা আমি ভাবতেই পারছি না। মুক্তিযুদ্ধের সময় শত্রুবেষ্টিত হয়েও এমনটা ঘটেনি। খবরের কাগজ পড়ি না দুই মাসের ওপর। আমি যে ক্যাম্পাসে থাকি সেখানে হকার ঢোকা নিষিদ্ধ, কাগজ নিষিদ্ধ। এটাও কল্পনাহীন। আমি তিনটি কাগজ পেতাম, দুটো কিনতাম। এগুলো প্রতিদিন নিয়মিত পড়তাম, অর্থনীতির বিষয় নোট করতাম। এই কাজ বন্ধ। কাঁচা বাজারে সপ্তাহে একবার যেতামই। তাও বন্ধ। দুই মাসের ওপর। এই অবস্থা আমার একার নয়। আমার মতো লাখ লাখ লোকের, কোটি কোটি বিশ্ববাসীর। ঘরবন্দি অবস্থায় কোথায় কী ঘটছে পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। ঈদের ছুটি চলছে। ঈদ কেমন হচ্ছে বা হয়েছে বুঝতে পারছি না। এই ঈদ উপলক্ষে সারা দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়, লেনদেন হয়। ব্যবসায়ীদের এই ঈদের বেচাকেনা সারা বছরের বেচাকেনা। বাকি বছরটায় দৈনিক খরচ চলে। এমন মৌসুমটাই নষ্ট হয়ে গেল। বাজার, দোকান সেভাবে খোলেনি, সীমিত পরিসরে কেউ কেউ লুকিয়ে ব্যবসা করছে। এতে কি আর চলে। এবারের ঈদের আরেক বৈশিষ্ট্য হলো এই কয়দিন আগেই সবচেয়ে বড় ফসল—বোরো উঠেছে। টেলিভিশনে দেখলাম সরকার বলছে বোরো ফসল খুবই ভালো হয়েছে। এটা বললেই আমার দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। ফসল ভালো হওয়া মানেই কৃষকের বিপদ। কৃষক ধানের দাম পাচ্ছে কি, সরকার কি পুরোদমে ধান ক্রয়ে মাঠে নেমেছে? ধান-চাল গমনাগমনে কি গ্রামাঞ্চলে কোনো বাধা আছে? ফড়িয়া-দালাল-চাতালকলওয়ালারা কী করছে? তারা কি উদ্বৃত্ত ফসলের সুযোগ নিচ্ছে? কৃষকের হাতে কি ‘ক্যাশ’ গিয়েছে। অনেক প্রশ্ন। জবাব নেই। দৈনিক কাগজ যেহেতু পড়ছি না, তাই বিস্তারিত জানার কোনো উপায় নেই। টেলিভিশনের খবরে বিজ্ঞাপনই বেশি। আর তাদের খবর মনে রাখা কঠিন ব্যাপার। সব বিষয়ই সাময়িক। কৃষক যদি ‘ক্যাশ’ পেয়ে থাকে তাহলে সে তার নিজের জন্য একটা লুঙ্গি, স্ত্রীর জন্য একটা শাড়ি, মেয়ের জন্য শাড়ি-সালোয়ার কামিজ কেনার কথা। বহু জায়গায় লকডাউন অবস্থা। বহু জায়গায় দোকানপাট খোলা যাচ্ছে না। ‘চুরি’ করে দোকান খুলে দোকানিরা জরিমানার সম্মুখীন হচ্ছেন—এই খবরও আছে। এছাড়া কৃষকরা এই মাসে বিদেশ থেকে বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্সের টাকা পান। ধান বেচার টাকা, শ্রমের টাকা, রেমিট্যান্সের টাকা দিয়ে এই সময়ে গ্রামাঞ্চল থাকে ‘ক্যাশে’ রমরমা। এবারের চিত্রটি কী, তা বিশদভাবে জানার উপায় আমার কাছে নেই। অনলাইনে কিছু খবর আছে। তা খুঁজে খুঁজে বের করা বৃদ্ধদের জন্য বড়ই ঝামেলার বিষয়। দেখলাম, এবার ঈদে রেমিট্যান্সের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। এখন যদি ধানের বাজারও না থাকে তাহলে মহাবিপদ। সামনে আউশ ফসল লাগানোর সময়। এর প্রস্তুতি আছে তো কৃষকদের? ধানের ‘চারা’ পাওয়া যাবে তো। সার, বীজ, কীটনাশক ওষুধ নিয়ে সরকার প্রস্তুত তো। আর কত কাজ করবে? এখন চলছে মহা দুর্যোগ। লাখ লাখ লোককে খাওয়াতে হচ্ছে। বিশাল কর্মকাণ্ড। সুখবর যে সরকার ৫০ লাখ পরিবারকে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ক্যাশ দিয়েছে। প্রত্যেক পরিবার পাচ্ছে আড়াই হাজার টাকা করে। এই টাকা কিছুই না। কিন্তু বিপদের দিনে গরিবের কাছে এই টাকার মূল্য অনেক। কে দেয় গরিবকে টাকা? এই টাকা কি আউশ চাষে যাবে? না, তা হবে না। এটা নিতান্তই খাই-খরচার টাকা। এই টাকা বাদেও সরকার ধাপে ধাপে, সম্ভবত আট ধাপে সর্বমোট ১ লাখ ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এই টাকার বিরাট অংশই বিতরণ করা হবে ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংক এবার সমস্যা সমাধানের হাতিয়ার হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। ‘ক্যাশ রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট’-এর (সিআরআর) যে টাকা প্রত্যেক ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখতে হয়, তার পরিমাণ কমানো হয়েছে। ‘রেপো’ রেট কমানো হয়েছে। এতে ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ পাবে সস্তায়। ‘রিফিন্যান্স স্কিম’ প্রবর্তিত হয়েছে। ঋণ পরিশোধের সীমা বর্ধিত করা হয়েছে। শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের সংজ্ঞার্থে শিথিল করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে বাজারে ‘লিকুইডিটি’ বাড়বে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা তিনটি। প্রথমত সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়মতো টাকা সরবরাহ করতে পারবে তো? যা হয়, সরকারের টাকা আসতে সবসময়ই দেরি হয়। আমলারা অনেক জটিলতা সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয়ত বড় চিন্তা আমানতের (ডিপোজিট)। আমানত কোথায়? লোকের আয় নেই, আয় হ্রাস পেয়েছে। সঞ্চয় নেই। অনেকেই কর্মহীন। একমাত্র সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তা ছাড়া কারো চাকরির নিশ্চয়তা নেই। বেতনের নিশ্চয়তা নেই। আমিই জানি একটি খবর। দুই বন্ধু তাদের ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। তারা আর টানতে পারছে না। ‘বুয়া’রা কর্মহীন, ‘সাফাই’ কর্মীরা কর্মহীন। সেলুন কর্মীদের ধারেকাছেও কেউ যায় না ভয়ে। তারা কর্মহীন। সু পালিশওয়ালার কাজ নেই। এ রকম শত প্রকারের কর্মী-শ্রমিকের কোনো কাজ নেই, রোজগার নেই। এক খবরে দেখলাম, এক ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা ব্র্যান্ড তাদের ঢাকার অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। ৬৯ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। ওই কোম্পানির কাছে বাংলাদেশী সাপ্লাইয়াররা পাবে ৬৯ মিলিয়ন ডলার। ‘উবারইটস’ নামের একটি ‘ফুড ডেলিভারি কোম্পানি’ জুন মাস থেকে তাদের ঢাকার কার্যাবলি বন্ধ করে দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এতে অনেকের চাকরি যাবে। ‘সিয়ারস’ নামের একটি কোম্পানি বাংলাদেশী সাপ্লাইয়ারদের ৫০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করছে না। এ ধরনের ছোট-বড় খবরে ভরা বাজার। এমতাবস্থায় হাজার হাজার লোক কর্মচ্যুতির আশঙ্কায় ভুগছে। এত ‘সঞ্চয়’ আসবে কোত্থেকে। ব্যাংকের ‘আমানত’ আসবে কোত্থেকে? এমনিতেই ‘নয়-ছয়’ সুদনীতি কার্যকর করে আমানতকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ৬ শতাংশ সুদ, ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি। তাহলে আমানতের ওপর সুদ কোথায়? আর যদি এভাবে আমানত বৃদ্ধি না পায় তাহলে সরকারের লাখ কোটি টাকার প্রণোদনার কাজ কীভাবে এগোবে এই চিন্তা সবার।
সবচেয়ে বড় চিন্তা ব্যাংকারদের। এমনিতেই তারা প্রতিদিন ‘গাল’ খাচ্ছে। তারা তিরস্কৃত সর্বত্র। মিডিয়ার একটা অংশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকারদেরও ‘গাল’ দেয়। দেয় এই বলে যে ‘খেলাপি ঋণ’ বেড়ে যাচ্ছে। খুবই সত্য কথা। মুশকিল হচ্ছে প্রণোদনার কাজ এগিয়ে গেলে কি খেলাপি ঋণ কমবে? শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের সংজ্ঞা বদল করা হচ্ছে। অনেক ঋণকে সাময়িক সুবিধা দিয়ে তার পরিশোধ সীমা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকারদের আশঙ্কা এসব ঋণ শেষ পর্যন্ত ‘মেয়াদি ঋণে’ পরিণত হবে। তার রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক চাপ যদি প্রণোদনার ক্ষেত্রে কার্যকর হয়, তাহলে খেলাপি ঋণ আগামী দিনে বাড়তে পারে। এসব দুশ্চিন্তার মধ্যেই আসছে বাজেট। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। বাজেটের আকার কী হবে জানা যায়নি। তবে, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি’ যদি কোনো সূচক হয়, তাহলে বলাই চলে বাজেটের আকারও ছোটই হবে। এক খবরে দেখলাম ২০২০-২১ অর্থবছরের উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণ হবে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এটা গেল অর্থবছরের থেকে সামান্য বেশি। স্বাভাবিক সময় হলে ‘এডিপি’র আকার আরো বেশি হতো। বলা হচ্ছে, ‘এডিপি’তে অগ্রাধিকার পাবে পরিবহন খাত, তারপর ফিজিক্যাল প্ল্যানিং, জল সরবরাহ ও গৃহনির্মাণ। বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যের স্থান এর পরে। এখানে বোঝার সমস্যা। কভিড-১৯ আজকে সারা দেশে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে বোঝাই যায় আমাদের স্বাস্থ্য খাত সেকেলে। যে ভাইরাস চীন থেকে এসেছে তা থাকতে এসেছে। এটা দূর করার মতো ওষুধ এখনো বাজারে আসেনি। শত শত লোক ধরা খাচ্ছে। হাজার হাজার লোক ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। বিপদের দিন গুনছে। এর মধ্যেই সংঘটিত হয়ে গেল ‘আম্পান’ নামের আরেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ভেঙেছে। মানুষের চিকিৎসা দরকার, খাবার-বিশুদ্ধ পানি দরকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যই তো অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল। না, তা হচ্ছে না। গত কয়েক বাজেটেই এ অবস্থা। এখন দেখতে হবে রাজস্ব বাজেট কী হয়। মুশকিল হচ্ছে, এডিপিতে টাকা না বাড়লে সরকারি বিনিয়োগের অবস্থা কী দাঁড়াবে। আমরা সরকারি বিনিয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। বেসরকারি বিনিয়োগ খুবই কম। এমতাবস্থায় ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের অপেক্ষায় আমরা। মধ্যবিত্তের হাতে কি ‘ক্যাশ’ আসবে? সাধারণ কর্মকর্তাদের আয়কর কি কমবে? এসব প্রশ্ন সবার মনে।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










