বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাত বেশ এগিয়েছে। জেলা শহরেও এখন বড় বড় স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাও প্রসারিত হয়েছে। তবে হতাশার বিষয় হলো, সেবার মানে তার প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে না। জটিল অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষকে এখনো রাজধানীমুখী হতে হয়। বর্তমানে দেশে অসংক্রামক রোগ বিশেষ করে হৃদরোগে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। যদিও গত দেড় দশকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দেশে হৃদরোগের চিকিৎসার পরিসর বেড়েছে এবং হৃদরোগের জন্য একাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশেষায়িত চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। হৃদরোগে আক্রান্ত হলে রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা দিতে হয়, যা অনেক সময় হাতের কাছে পাওয়া যায় না। ফলে হৃদরোগে মৃত্যুর হারও বাড়ছে। অথচ দেশে হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যাপক অগ্রসর হয়েছে। তবে তার সবই রাজধানীকেন্দ্রিক। এক্ষেত্রে হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এসব সেবা নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে হবে। 

হৃদরোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দাবি অনুযায়ী হৃদরোগের চিকিৎসার শতকরা ৯৫ ভাগ দেশেই করা সম্ভব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ভাষ্য মতে, দেশে হৃদরোগের চিকিৎসায় এখন দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে। ফলে হৃদরোগের চিকিৎসায় বিদেশনির্ভরতা কমে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে হৃদরোগ চিকিৎসাসেবা জেলা পর্যায়ে এখনো পৌঁছেনি। হৃদরোগ চিকিৎসা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের নানা অর্জনের দাবি থাকলেও দেশে হৃদরোগের চিকিৎসা সুবিধার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা ও প্রকাশনায় উঠে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে করা ‘ফোর ডিকেডস অব কার্ডিয়াক সার্জারি ইন বাংলাদেশ: আ নোবেল জার্নি দ্যাট স্ট্যাটেড উইথ দ্য হেলপ অব জাপান’ শীর্ষক গবেষণায় দেখানো হয়েছে দেশে তুলনামূলকভাবে কার্ডিয়াক সার্জারি ও চিকিৎসা কেন্দ্র বাড়লেও বর্তমানে যে সুবিধা ও ব্যবস্থা রয়েছে তা বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে দেশে হৃদরোগে অস্ত্রোপচারের সুবিধা রয়েছে ৩২টি চিকিৎসা কেন্দ্রে। এর মধ্যে চারটি সরকারি, একটি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত ও একটি স্বায়ত্তশাসিত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সঙ্গে ২৬টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা সুবিধার ৯৫ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। বর্তমানে ঢাকা বিভাগের সরকারি ও বেসরকারি নিয়ে ২৪টি হাসপাতাল, চট্টগ্রাম বিভাগের চারটি, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর ও সিলেট বিভাগে একটি করে হাসপাতালে রয়েছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২৫০ জন কার্ডিয়াক সার্জারি রয়েছেন। 

বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশে যথেষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও ঢাকার বাইরে তাদের পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে আমাদের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত দুর্বলতা। কোনো কার্ডিয়াক সেন্টার বা সিসিইউ (করোনারি পরিচর্যা কেন্দ্র) কার্যকরীভাবে চালানোর জন্য ন্যূনতম একজন কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞ, কার্ডিয়াক সার্জন, ভালো এনজিওগ্রাম ইত্যাদি সুবিধা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দেশের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট ও প্রশিক্ষিত নার্স নেই। অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সও নষ্ট হয়ে আছে বছরের পর বছর। হৃদরোগের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পাশাপাশি বিশেষ অনেক উপকরণ প্রয়োজন হয় সেসবের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। 

মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির পথ দেশে যেমন অমসৃণ, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণও। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল। হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়ার কারণেও মৃত্যুহার বাড়ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচে চিকিৎসা হলেও তা সংখ্যায় অপ্রতুল আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হৃদরোগ চিকিৎসা এখনো অত্যধিক ব্যয়বহুল, যা সাধারণের নাগালের বাইরে। সঠিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব ও আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কারণেই দেশে কার্ডিয়াক সার্জারির সংখ্যাও কম হচ্ছে। একই সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের প্রাথমিক পর্যায়ে চিহ্নিত করতে না পারায় রোগীর সংখ্যা আরো বেড়ে চলছে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাব অন্যতম একটা ভূমিকা রাখে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনুযায়ী সেটা যথেষ্ট মাত্রায় হচ্ছে না। অসংক্রামক রোগের মধ্যে হৃদরোগের ভুক্তভোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেজন্য হৃদরোগ যেসব কারণে প্রভাবিত হয়, সেসব ঝুঁকি কমানোর জন্য স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে তেমন একটি সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেই। কেবল কাগজে-কলমে কার্যক্রম থাকলেও বাস্তবিক অর্থে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় হৃদরোগের নির্দিষ্ট বিভাগ রয়েছে। বেশির ভাগ জেলা বা জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ও সিসিইউ (করোনারি পরিচর্যা কেন্দ্র) রয়েছে। সব জেলা হাসপাতালে এ ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কার্ডিওলজির কনসালট্যান্ট যারা আছেন তারাও সেখানে দীর্ঘমেয়াদি হার্টের রোগের চিকিৎসা করতে পারবেন। মেডিসিনের কনসালট্যান্টরা আছেন তারাও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে পারবেন। তবে হৃদরোগ প্রতিরোধে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম তৃণমূল পর্যন্ত চলছে। উপজেলা হাসপাতালে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের (এনসিডিসি) কর্নার করা হয়েছে। সারা দেশে এ ব্যবস্থা করতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। যেসব দীর্ঘমেয়াদি রোগ হৃদরোগকে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ন্ত্রণে সরকারের যথাযথ কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কোনো স্তরেই হৃদরোগের সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, এটাই বাস্তবতা। 

স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে আর্থিক বরাদ্দ বাড়াতে হবে বিশেষ করে হৃদরোগে চিকিৎসার জন্য। স্বাস্থ্য খাতে আমাদের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি-বিচ্যুতি যা এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ খাতকে দুর্নীতিমুক্ত রেখে বর্ধিত বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া হৃদরোগবিষয়ক নিয়মিত গবেষণা, সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে লজিস্টিক সহায়তাসহ বিশেষজ্ঞ হৃদরোগ চিকিৎসক এবং সরকারি হাসপাতালগুলোয় বেড সংখ্যা বাড়াতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ের জেনারেল হাসপাতালগুলোয় হৃদরোগের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগীয় হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করা জরুরি।