দেশে হঠাৎ করেই লোডশেডিং বেড়ে গিয়েছে, ৪ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের পরই এ ভোগান্তির শুরু। চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশেই এখন প্রতিদিন একাধিক লোডশেডিং হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় রসদ জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়ায় এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। গত জুলাই থেকে শুরু হওয়া এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ে এখন আর নির্দিষ্ট সময় মানা হচ্ছে না। যখন-তখন হুট করে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। অথচ বিগত কয়েক বছর যাবত আমরা লোডশেডিংকে ভুলেই যেতে বসেছিলাম। নিশ্চিত নির্ভাবনায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করার দিনগুলোয় অনেক বাসায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য আইপিএসের ব্যাটারি রিচার্জের সংযোগ খুলে রাখা হয়েছিল। কারণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকায় আইপিএস ব্যবহারের প্রয়োজন হচ্ছিল না।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও হচ্ছিল বেশ, কেননা প্রি-পেইড মিটারে কার্ডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় সাধারণ নাগরিকরা এমনিতেই সংযমী হয়ে গিয়েছিল। এ রকম শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হওয়ার দিনগুলোয় বেধে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ধাক্কায় পুরো পৃথিবীই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পাইপলাইনে জ্বালানি তেল আমদানি কমে যায়। এর সঙ্গে চলমান গ্যাস সংকট ও কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ঘাটতি যোগ করল সংকটের নতুন মাত্রা।

‘গ্রাম হবে শহর’ এ ধারণার আলোকে চলতি বছরের ২১ মার্চ ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের পায়রা তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র উদ্বোধনের পর মুজিব বর্ষে দেশকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার পর দেশে বিদ্যুতের সংকট নেই এমন ধারণাই সবার মনে পোক্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে ‘দিন বদলের ইশতেহার’ অনুযায়ী বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের যে ধারণা তার জন্য শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা একটি অবশ্যম্ভাবী দাবি ছিল।

এখন বাস্তবতা হচ্ছে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের নানা উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু বিশ্ব যদি সংকটে পড়ে, তাহলে তো বাংলাদেশও এর বাইরে যাবে না। সে হিসেবে আমাদের এখন বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার কোনো বিকল্প নেই।

ইদানীং বিশেষ করে ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের পর একটা বিষয়ই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি হলো আমাদের আদি যুগে ফিরে যাওয়া এবং প্রয়োজনে চেরাগ বাতি ব্যবহার করা। খোদ রাষ্ট্রপ্রধান যখন সবাইকে সাশ্রয়ী হতে বলেন সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। নতুবা সবাইকেই ভুগতে হবে এটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এর মধ্যেই জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রতিদিন একবারের লোডশেডিং যখন তিন-চারবারে পৌঁছে গিয়েছে, সেটিই আমাদের ভাবাচ্ছে।

শীত এলে নভেম্বর মাসে লোডশেডিং কমতে পারে বলা হচ্ছে, তবে আগামী বছরের আগে যে চলতি সংকট দূর হবে না সেটি বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে জানিয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে আমরা সভ্যতার চরম উত্কর্ষের এ যুগে বিদ্যুতের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই পুরোদমে চলতে শুরু করেছি, সেখানে দীর্ঘসময় বিদ্যুিবহীন থাকার কথা চিন্তা করাও দুষ্কর, কারণ জীবনযাত্রার সবকিছুই বিদ্যুৎ নির্ভর হয়ে গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ৪ অক্টোবর দেশের অধিকাংশ অঞ্চল বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাটা রীতিমতো ভয়াবহ একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জাতীয় গ্রিড অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় সে দিন ঢাকাসহ সারা দেশই অন্ধকারে ছেয়ে যায়। পেট্রোল পাম্পগুলো থেকে ড্রামের পর ড্রাম ডিজেল কিনে ভবনগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জেনারেটরের রসদ জোগানো হয়।

ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে এলেও প্রশ্ন উঠেছে এমন বিপর্যয় অদূর ভবিষ্যতেও ঘটবে না তো? এরই মধ্যে এক মাসের ব্যবধানেই দ্বিতীয়বারের মতো গ্রিড বিপর্যয় এবং ২০১৪ সালের ১ নভেম্বরের ব্ল্যাকআউটের ঘটনা আমাদের মনে এ প্রশ্নকে কঠিনভাবে জাগিয়ে তুলেছে। গত ৬ সেপ্টেম্বরও জাতীয় গ্রিডে মাঝারি বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। ফলে কুষ্টিয়া, যশোরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো প্রায় দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। তারও আগে ২০১৭ সালের ৩ মে বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে, তখন গ্রিড বিপর্যয়ের ফলে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমের ৩২টি জেলা কয়েক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে গ্রিড বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কতটুকু আছে সেটি নিয়ে সাধারণত চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হলেই গ্রিড বিপর্যয় হতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা যে প্রয়োজনের তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না, সেটি ফুটে উঠেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য এলাকাভিত্তিক শিডিউলের পরও এমন গ্রিড বিপর্যয় জনমনে নানা প্রশ্নের ডালপালা জন্মায়। যার উত্তর এরই মধ্যে সবার সামনে চলে এসেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গ্রিড বিপর্যয়-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গ্রিড বিপর্যয় অস্বাভাবিক নয়। এমন কারিগরি ত্রুটি হতে পারে বলে উনি জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী বিদ্যুতের গ্রিড বিপর্যয় এড়াতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ রিস্টোরের পরিবর্তে অটোমোশনে যাওয়া এবং গ্রিডকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তর করার বিষয়টিতে জোর দিতে হবে।

এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে জোর দেয়া প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গিয়েছে, বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া বিল ১৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। সে কারণে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কেউ কেউ উৎপাদন বন্ধ রাখছে। আর গ্যাসের অভাবে অর্ধেকের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে সব সময় অলস পড়ে থাকে। এদিকে সক্ষমতা থাকার পরও জ্বালানি তেলের খরচ কমাতে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে না।

এসব ক্ষেত্রে কোনো সুখবর নেই সেটিও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন। এখন আসলে সামর্থ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে নাগরিকদের মিতব্যয়ী হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই।

রাত ৮টার সময় শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ রাখার কথা বললেও সেটি নির্দেশনা প্রদানের প্রথম কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আর পালন করা হয়নি। রাত ৮টার পরও রাস্তায় বিলবোর্ড জ্বলতে দেখা গিয়েছে। বন্ধ থাকেনি রঙবেরঙের মরিচবাতি দিয়ে আলোকসজ্জাও। এমনকি অব্যবস্থাপনার নিদর্শন হিসেবে অতীতের মতো দিনের আলোয় সড়কবাতিও জ্বলেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাত ৮টায় দোকান বন্ধ করলেই কী সমাধান হয়ে যাবে? বা বিয়েবাড়িতে আলোকসজ্জা বন্ধ করলে? কত দোকানে তো দিনের সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা রাত ৮টার পরই শুরু হয়। এ কারণেই সরকারি নির্দেশনার পরও দোকানের সামনের বাতি বন্ধ করে ভেতরে মাত্র একটা বাতি জ্বেলে বেচাকেনা চলেছে। আর বিয়েবাড়ির সাজসজ্জার আয়োজন করে যাদের ব্যবসা টিকে আছে, তারাই বা এ ব্যবসার ক্ষতি কীভাবে পোষাবেন?

রাস্তার পাশে এলইডি ডিসপ্লেতে বিজ্ঞাপন ব্যবসার প্রচারেরই অংশ। মিতব্যয়ী হওয়ার কথা বলে এসব সাময়িকভাবে হয়তো বন্ধ রাখা যাবে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তিতে তো এসব বন্ধ করা যাবে না। তবে অফিস টাইম এগিয়ে নিয়ে এসে দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের যে চিন্তা করা হচ্ছে সেটির উদ্যোগ হিসেবে আগের ম্যানুয়াল বিলবোর্ডই এটির সমাধান হতে পারে।

পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করতে হবে, জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে সূর্যের আলো থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ শক্তিকে কাজে লাগানোর যে প্রচেষ্টা আমাদের দেশে শুরু হয়েছিল সেটিও এখন ধীরগতিতে এগুচ্ছে। এর ব্যবহার বাড়াতে হবে।

তবে ডে লাইট সেভিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চমত্কার একটি পদ্ধতি ২০০৯ সালে বাংলাদেশে শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু অব্যবস্থাপনা আর এর প্রয়োজনীয়তা প্রচারের অভাবে সবার স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া না পেয়ে সেটি সে বছরেরই ৩১ ডিসেম্বর বন্ধ করে দেয়া হয়। এদিকে বর্তমানে সরকারি অফিস সকাল ৮টায় নিয়ে আসাকে বলা যায় যে ডে লাইট সেভিংয়ের মতো করেই চিন্তা-ভাবনার ফসল। কিন্তু এটি সরকারি অফিস পর্যায়েই রয়ে গেছে, বেসরকারি অফিসগুলোয় আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন শহর থেকে গ্রামেগঞ্জে অবাধে ছড়িয়ে গিয়েছে, এসবের পেছনেও প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। কঠোরতা প্রয়োগ করে এসব রিকশা বা অটোরিকশাকে হয়তো ক্ষেত্রবিশেষে মূল সড়ক বা মহাসড়কে উঠতে দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশকেও মানবিক ভূমিকা পালন করতে হয়। কারণ পুলিশ নিম্ন আয়ের এসব রিকশাচালকের রিকশা আটক করার পর সেটি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে সমালোচনাও কম হয় না।

তবে দেশ যদি সংকটে ভোগে, তখন নিম্ন আয়ের এসব মেহনতি মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের কথাও ভাবতে হবে। কারণ কারো পেটে লাথি মেরে জনগণের মন জয় করা যাবে না।

আবার এতদিন বিদ্যুতের স্বাভাবিক সরবরাহ পেয়ে অফিস এবং বাসায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার বেড়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এসির তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা প্রয়োজন। সে সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আয়োজন ব্যতীত অফিসের রুটিন কাজ করার সময় এসির তাপমাত্রা কমানোর প্রয়োজন যেন না হয়, সে জন্য শীতকাল ছাড়া কোট-স্যুট না পরাই উচিত।  

পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় আমরা অদূর ভবিষ্যতে আরও ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকির মধ্যে আছি। এ রকম পরিস্থিতিতে সবার বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযমী হওয়া জরুরি। এটা শুধু সাধারণ জনগণের ক্ষেত্রে নয়, প্রশাসনের সর্বস্তরেও প্রয়োগ হতে হবে, তাহলে আমরা সবাই মিলে চলমান সংকটকে একদিন কাঠিয়ে উঠতে পারব এ আশা করা যায়।

 

তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক