দিনের আলো ফোটার পর পত্রিকা স্টলে
মানুষের উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি এখনো মুগ্ধ করে। সাইকেলে করে কিংবা
হাতের বাহুতে পত্রিকা নিয়ে সবার বাসায় পৌঁছে দেয়া অথবা দোকানের বদ্ধ শাটারের নিচে রেখে আসা হকারদের ব্যস্ততাও
চোখে পড়ার মতো।
হ্যাঁ, পাঠক এখনো পত্রিকা পড়ে।
সকালের নাশতার টেবিলে
গরম চায়ের সঙ্গে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার ভাঁজ খোলার
মতো পাঠক এখনো রয়েছে। কিন্তু বদলে গেছে পাঠকের মনোজগতের সামগ্রিক অবস্থান। পাঠক
এখন নতুন কিছু জানতে চায়, আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে জেনে যাওয়া খবরের হুবহু
বর্ণনা পত্রিকার পাতায় দেখতে চায় না। এজন্য দৈনিক পত্রিকাগুলোয় আগের দিনের খবরের পেছনের খবর বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ মত
এবং নতুন করে তৈরি করা নিজস্ব সংবাদ পাঠকমনে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। যে খবর পাঠকের
মনে একটা আবহ তৈরি করে, মত জানাতে বাধ্য করে, সে খবরটিই এখন প্রকৃত খবর হিসেবে
গণ্য হয়। অবশ্য সাংবাদিকতার শুরু থেকেই পাঠককে সংবাদ পড়ানোর ক্ষেত্রে এমনটি
বিবেচনা করা হতো।
পত্রিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হচ্ছে, পাঠকের মতামত জানতে চাওয়া বা
পত্রিকায় পাঠকের লেখার সুযোগ করে দেয়া। ইদানীং অবশ্য আমাদের সবকিছু নিয়ে মত
প্রকাশের জানালা উন্মুক্ত হয়ে গেছে। আগে যেখানে পত্রিকায় পাঠকের কলামে চিঠি পাঠিয়ে
দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন চাইলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনের
আগল খুলে কথা বলা যায়। যেখানে কোনো বাধা-নিষেধ না থাকায় কথা বলার চর্চাটাও বেড়ে
গেছে। আর এর ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই এসব মাধ্যম এখন বিশ্ববাণিজ্যেরও অংশ। ফেসবুকে
যেকোনো কনটেন্ট বানিয়ে
ভিউ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন অনেক সহজ হয়ে গেছে। সরকারও এখানে খুব একটা
নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যে কারণে বিভিন্ন বিধি-নিষেধ জারি করেও আখেরে কাঙ্ক্ষিত
সুফল পাওয়া যায়নি। তবে সাইবার ক্রাইম অ্যাক্টের মাধ্যমে ক্ষেত্রবিশেষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ ভালো কিছু কাজ করতে
সক্ষম হচ্ছে, যা আসলেই
প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে।
মানুষ মূলত ফেসবুকে কী দেখে? ইদানীং আমাদের বেডরুম থেকে ওয়াশরুমও ফেসবুকের
কনটেন্ট হয়ে গেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, নিজেদের প্রাইভেসি রক্ষা না করে আমরা ফেসবুকে
আমাদের ব্যক্তিগত ছবিগুলো উন্মুক্ত করে দিচ্ছি। ফলে ফেসবুকের ট্রিলিয়ন ডলারের যে
বাণিজ্য হচ্ছে সেখান থেকে এর ব্যবহারকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ লাভবানও হচ্ছে। আর
এতেই আমরা সন্তুষ্ট, সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি সহজে যোগাযোগের একটি মাধ্যম পেয়ে।
যার ফলে এখন মুঠোফোন সেবাদাতা
সংস্থাগুলো ইন্টারনেটের জন্য এমনকি শুধু ফেসবুক ও
ইউটিউব ব্যবহারের জন্য আলাদা অফার দিচ্ছে। কারণ মানুষ এখন ভয়েস কলের চাইতে
মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপ এবং ইমুতে কল করে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। যে
কারণে সেলফোন অপারেটররা ডাটা ও মিনিটের
বান্ডেলের প্যাকেজ সংখ্যা বাড়িয়েছে।
এ ধারাবাহিকতায় পত্রিকা ও টেলিভিশন
চ্যানেলগুলোও ফেসবুক ও ইউটিউবে কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে। সবার আগে সর্বশেষ সংবাদ
দিতে এখন আর টেলিভিশনের স্ক্রলের অপেক্ষা করতে হয় না। ফেসবুকের নিউজফিডেই সবার আগে
নিউজ চলে আসে। এক্ষেত্রে ভূঁইফোড় অনলাইন নিউজপোর্টালগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
করার পরও প্রতিনিয়ত এরকম কপি-পেস্টনির্ভর
পোর্টালের সংখ্যা বাড়ছে। এজন্য পাঠকরা এখনো প্রিন্ট ভার্সন থাকা পত্রিকাগুলোর
অনলাইন ভার্সনে নির্ভরযোগ্য সংবাদের আশায় প্রবেশ করে। অবশ্য বেশকিছু অনলাইন
পোর্টাল সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ভালো করছে। কিন্তু তার পরও প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম গুজবের ভিড়ে সঠিক
সংবাদ পরিবেশনে মূল ধারার নিউজ পোর্টালগুলোকে হিমশিম খেতে হয়।
প্রকৃতপক্ষে আমরা শতফুল ফুটতে
দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থার মতে, গণমাধ্যমে বার্ষিক ৩ হাজার
কোটি টাকার যে বাজার রয়েছে সেখানে উপার্জন করে চলার মতো মানসম্মত কনটেন্ট কি সবাই তৈরি করতে পারছে? যদি সেটি না হয়,
অন্যের সংবাদ কপি-পেস্ট
করেই চলতে হয়, তাহলে তো একসময় এসব পোর্টাল বন্ধ হয়ে যায়। এরকম অনিশ্চয়তার মাঝেও
কিছু মানুষ প্রয়োজনীয় জনবল না থাকার পরও বিভিন্ন নামে ডটকম খুলে বসছেন, যা
প্রকারান্তরে নিউজ পোর্টালের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। কিন্তু দেশের মিডিয়া খাতে নতুন কোনো
অবদান তৈরি হচ্ছে না।
এছাড়া বেশ জোরেশোরে জানান দিয়ে
নতুন মিডিয়া হাউজ এলেও চলমান
স্রোতে মিশে যেতে হচ্ছে। পাঠক কী জানতে
চায়, পড়তে চায়, দেখতে চায় সেটি নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হলেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা
কঠিন হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে পুরনো মিডিয়া হাউজগুলো সময়ের সঙ্গে নিজেদের আপডেট করে
নিচ্ছে। সবারই চোখ এখন ডিজিটাল মিডিয়ায়, কে কত নিত্যনতুন তথ্য সবার আগে প্রকাশ
করতে পারছে সেটি নিয়ে চলছে দুর্বার পরিকল্পনা।
এরই মাঝে পাঠকের মন বদলাচ্ছে, পাঠক
নতুন কিছু চায়। এই যে উপসম্পাদকীয় লিখছি এটি নিয়েও মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে পাঠকের
মনের চাহিদাগুলো। পাঠকের অনুভূতির বাস্তবতাগুলো। এ অনুভূতি এখন বৈশ্বিক,
অন্তর্জালে পাঠক ছড়িয়ে আছে পুরো বিশ্বজুড়ে। যখন প্রবাসে থাকা বাংলাদেশীরা অনলাইনে পত্রিকার সংবাদ পড়েন সেটি আমাদের
অনুপ্রাণিত করে। পত্রিকা বা অনলাইন পোর্টালে এখন বিজ্ঞাপন আসার বড় উৎস হয়ে গেছে পাঠকের সংখ্যা। এক্ষেত্রে যেসব পোর্টাল যত
বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারছে তাদের উপার্জনও তত বাড়ছে।
তবে এক্ষেত্রে আমাদের দেশে টাকা
দিয়ে সংবাদ পড়ার মানসিকতা এখনো বৃহৎ পর্যায়ে
তৈরি হয়নি। যে কারণে বাংলা দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে শুধু শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিক ব্যতীত সব দৈনিক পত্রিকাই
পাঠককে বিনামূল্যে ই-পেপার পড়ার সুযোগ দিয়েছে। অথচ উন্নত রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রে অর্থের
বিনিময়ে নিউজ পড়ার সংস্কৃতি শুরু হয়ে গেছে। পুরো বিশ্বই যখন প্রিন্ট মিডিয়া ছেড়ে
অনলাইন প্লাটফর্মে ঝুঁকছে, তখন আমরা ছাপা
পত্রিকার জন্য প্রতিকূল হয়ে আসা সময়েও বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছি।
এক্ষেত্রে মান নিশ্চিত করার বিকল্প
কোনো উপায় নেই। দেশের পাঠক এখনো টাকা দিয়ে পত্রিকা পড়ে, এটি বাংলাদেশের মিডিয়া
হাউজগুলোর জন্য অনেক বড় পাওয়া। এটি ধরে রাখার জন্য অবিচল প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে
হবে। এজন্য পাঠকের মন বুঝতে হবে, পাঠকের অনুভূতিকে মূল্যায়ন করতে হবে। একটা বিষয়
গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা দরকার, পাঠক আছে বলেই পত্রিকা টিকে আছে। পাঠক
পত্রিকা পড়ে বলেই বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের পণ্যের প্রচারের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন
দেন। এজন্য পাঠকের মনোজগতে বিচরণ করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে এ সময়ের গণমাধ্যমের।
বস্তুত পত্রিকা হাতে নিয়ে যদি
প্রথম থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে পড়ার মতো নতুন কোনো সংবাদ পাঠকের চোখে
না পড়ে, তাহলে সে পত্রিকা প্রকাশ করা অর্থহীন। অথচ দুঃখজনকভাবে শীর্ষস্থানীয়
কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া বেশির ভাগ
পত্রিকাই পাঠককে পড়ানোর মতো সংবাদ প্রকাশ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একজন পাঠক যে খবর
আগের দিনই ফেসবুক বা টিভি চ্যানেলের
মাধ্যমে জেনে গেছে, সে সংবাদে কোনো নতুন তথ্য বা বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত না করেই যদি
সেটি পাঠকের কাছে তুলে দেয়া হয় তাহলে তো সে পত্রিকা পাঠক পড়বে না। এজন্য সেলফ
সেন্সরশিপের মাঝেও খবরের পেছনের খবর তুলে
আনার সাহসী সাংবাদিকতাটুকু করার প্রচেষ্টা অন্তত থাকতে হবে।
পাঠক সংবাদ পড়তে চায়, নতুন কিছু
জানতে চায়। সেই সঙ্গে পাঠক এটাও চায় যে পত্রিকা যেন পাঠকদের মুখপত্র হয়ে ওঠে।
এজন্য পাঠকের চিঠি নামে একটি বহুল প্রচলিত অধ্যায় ছিল, যেটি বেশির ভাগ পত্রিকায় এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে পত্রিকার
ওয়েবসাইটে খবর পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক মন্তব্য প্রকাশ করার নতুন এক বাস্তবতা
যুক্ত হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে পত্রিকার পাঠকদের মনোজগতের স্বরূপ বোঝার জন্য সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যের ঘর এখন যেমন গুরুত্ব পাচ্ছে তেমনি এটি বিনোদনের নতুন
মাধ্যমেও পরিণত হয়ে গেছে।
পাঠকের মতামত বা সংবাদের সঙ্গে
সংযুক্তিতে বর্তমানে নাগরিক সাংবাদিকতারও প্রচলন হয়েছে, যা দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে
উঠছে। এজন্য পত্রিকাগুলোর দায় আরো বেড়ে গেছে পাঠকদের কাছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো
টিভি সেটের দর্শক হারাচ্ছে। এ কারণে
টিভি প্রোগ্রামগুলোও এখন ফেসবুক ও ইউটিউবের দিকে ঝুঁকে গেছে। সবমিলিয়ে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন টিভি দর্শক এবং পত্রিকার
পাঠকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
এ নতুন বাস্তবতায় মিডিয়া
হাউজগুলোকে মানিয়ে নিতে হবে। ক্রমশ সাংবাদিকতা পেশায় যেমন ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি
যুক্ত হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। যে কারণে তরুণ প্রজন্মের একাংশ এখনো মিডিয়ায় কাজের জন্য উন্মুখ। তাই তো হাসিমুখে নিজেদের অনেক
চাহিদা জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিনিয়ত সংবাদের পেছনে ছুটছে সম্ভাবনাময়ী তরুণরা। মেধাবী এ
তরুণদের আগলে রাখতে হবে। অন্য কোনো পেশায় না গিয়ে যারা সাংবাদিকতা পেশায় আসছে
তাদের মনে রাখতে হবে এটা অন্য
পেশার মতো না। যে কারণে একজন সাংবাদিককে যেমন সবসময় নিজ দায়িত্বের প্রতি সচেতন
থাকতে হয়, তেমনি সমান্তরালে পেশাদারিত্বের সে জায়গাটুকু নিশ্চিত করার জন্য মিডিয়া
হাউজগুলোরও সচেতন থাকা উচিত। এ পেশা যেন বিলুপ্ত না হয়ে যায়, সেজন্য সময়ের সঙ্গে
মানিয়ে নেয়ার যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে সেটিকে গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট সবারই আমলে নিতে
হবে। পরিশেষে ভালো থাকুক এ দেশের সাংবাদিকতা এবং পাঠক চাহিদা মেটানোর মতো নিউজ
কনটেন্ট তৈরি অব্যাহত থাকুক সেটিই প্রত্যাশা করছি।










