বিদায় ২০২০। আর কয়েক দিন পরই একটি বছরের যবনিকাপাত হয়ে নতুন বছরের সূর্যোদয় হবে। এভাবে একটির পর একটি বছর কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। বয়স বাড়ছে পৃথিবীর। বয়স বাড়ছে আমাদের। একটি বছর শেষ হয়। মানুষ সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে আনন্দ-উৎসবে নতুন বছরকে বরণ করে। কিন্তু কেউ জানে না, কী অপেক্ষা করছে তার জন্য অনাগত দিনে।

২০২০ সালটা শুরু হয়েছিল এ জনপদে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে। গত ১৭ মার্চ ছিল এ দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘মুজিব বর্ষ’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বছরব্যাপী রঙ-বেরঙের নানা বর্ণিল আয়োজনের মাধ্যমে ঘোষিত ‘মুজিব বর্ষ’ উদযাপনের সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল। কথা ছিল, ১৭ মার্চ কয়েকজন বিশ্বনেতার উপস্থিতিতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে জন্মশতবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ‘মুজিব বর্ষ’ উদযাপনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ওই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তি ও কর্মজীবন নিয়ে হলোগ্রাফিক উপস্থাপনা ও থিম সং পরিবেশনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আতশবাজি, শত শিশুর কণ্ঠে গানসহ বর্ণাঢ্য আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। অনুষ্ঠানে দেড় লাখ মানুষের সমাগমের পরিকল্পনা করেছিলেন আয়োজকরা। করোনা নামের প্যান্ডেমিকের কারণে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠান স্থগিত করতে হয়। তবে পরিবর্তিত পরিকল্পনা মোতাবেক জনসমাগম পরিহার করে বছরজুড়ে মুজিব বর্ষ পালন অব্যাহত রাখার এবং বিদেশী অতিথিদের উপস্থিতিতে যেসব অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো পরবর্তী সময়ে সুবিধাজনক কোনো একটি সময়ে আয়োজনের সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়।

কঠিন একটি বছর গেল। নিকট অতীতে মানুষ আর এ রকম কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি। ভিশন-২০২১ সামনে নিয়ে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছিল শান্ত অথচ দৃঢ় পদে, তখন করোনার এই থাবা বড় আকারের ঝাঁকুনি দিল সার্বিক অগ্রযাত্রায়। গত ৮ মার্চ যখন প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়, মানুষ তখনও বুঝে উঠতে পারেনি, কী ঘোর দুর্দিন ঘনিয়ে আসছে। সংক্রমণ ঠেকাতে যখন সবকিছু এক রকম বন্ধ করে দেয়া হলো, মানুষ উত্তাপটা ধীরে ধীরে টের পেতে শুরু করল। দুই-আড়াই মাসের ‘লকডাউনে’ চারদিকে নাভিশ্বাস উঠল। অনেক লোক তাদের জীবিকা হারিয়ে পথে বসার জোগাড় হলো। শেষে এক রকম বাধ্য হয়ে করোনা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে সবকিছু খুলে দিতে হলো।

সৌভাগ্যবশত, পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় এ দেশে করোনা তুলনামূলকভাবে কম ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রাথমিক যে ধাক্কাটা আসে, তা দ্রুত সামলে নেয়া সম্ভব হয়। তবে দীর্ঘ সময় কলকারখানা বন্ধ থাকায় অনেক লোকজন চাকরি হারায়, উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিকে উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়া, অন্যদিকে ভোক্তা রাষ্ট্রগুলোও করোনার থাবায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে রফতানিমুখী শিল্পগুলোর অনেক অর্ডার আটকে যায়। সরকার আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করে শিল্প-বাণিজ্যে উদ্ভূত প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও পদ্ধতিগত জটিলতা এবং এ ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রমে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের অনেকেই সুযোগটি ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারেনি বলে বিভিন্ন সময়ে কথা ওঠে। দোকানপাট ও বিপণিবিতানগুলো বন্ধ থাকার কারণে ব্যবসায়ীরা এবং এগুলোর ওপর নির্ভরশীল কর্মচারীরা গুরুতর সংকটে নিপতিত হয়। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে যখন দেশে অর্থনীতির চাকা এভাবে স্থবির হয়ে পড়ে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীরা দেশে ফিরতে শুরু করে। ‘লকডাউন’ তুলে নেয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তাছাড়া একই সময়ে বিশ্বের অনেক দেশেই পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ফলে আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দুয়ার আবারো খুলতে শুরু করে। প্রবাস প্রত্যাগতরাও পুনরায় তাদের কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করে। সমস্যা দেখা দেয়, শীতের আগমনে বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে করোনার প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। তাছাড়া অনেক দেশে নতুন ধরনের এবং অধিক সংক্রামক করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি সৌদি আরব এক সপ্তাহের জন্য সব ধরনের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করে। ব্রিটেনে নতুন ধরনের করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর ইউরোপেও এ রকম আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিমান যোগাযোগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা ঘটেছে।

করোনার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর। সেই মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। সরকার কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে অফিস-আদালত, দোকানপাট, শিল্প-কারখানা খুলে দিলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার ঝুঁকি নেয়া যায়নি। একটি পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে ক্লাস নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে  বসবাসরত ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে এ ব্যবস্থায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিপত্তি দেখা দেয় পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে। একটি পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গড়ের ভিত্তিতে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। নভেম্বরের শেষ নাগাদ করোনার প্রকোপ অনেকটা কমে আসায় অনেকেই আশায় দিন গুনছিলেন, হয়তোবা কিছুদিনের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। শীত শুরু হতে না হতেই যেমনটি আশঙ্কা করা হচ্ছিল, দেশে করোনার প্রকোপ আবার বাড়তে শুরু করে।

এমন অবস্থায় আমাদের মাঝে আসছে নতুন বছর। আগামী বছরে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। আগামী মার্চে সবাই সাড়ম্বরে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কিন্তু সে সুযোগ সত্যিই আসবে তো? করোনা সংক্রমণে যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তা সহসা কমে আসবে বলে কি আশা করা যায়? একমাত্র ভরসা বোধহয় টিকা। এরই মধ্যে ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্নার টিকা আমেরিকার মতো দেশে রেগুলেটরি অথরিটির অনুমোদন পেয়েছে। আরো কিছু টিকা হয়তো শিগগিরই অনুমোদন পাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব টিকা আমাদের মতো দেশগুলোয় কবে নাগাদ এসে পৌঁছতে পারে? আশা করা হচ্ছে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নাগাদ টিকার প্রথম চালানটি আমাদের হাতে এসে পৌঁছতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান অনুসারে, গণহারে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করতে ২০২১-এর মাঝ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। সবার কাছে টিকা পৌঁছানোই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়, পর্যাপ্তসংখ্যক টিকা উৎপাদনের প্রশ্নও জড়িত আছে। বিশ্বজুড়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সুষ্ঠুভাবে টিকা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গড়ে ওঠা জোট কোভ্যাক্স এ জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর জন্য ২০২১ সালের মধ্যে ২০০ কোটি টিকার ডোজ নিশ্চিত করতে চায়। তারা আশা করছে, এতে প্রতিটি দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ২০ শতাংশ মানুষ টিকা লাভে সক্ষম হবে। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান আদর পুনাওয়ালার মতে, ‘দুনিয়ায় সবার কাছে করোনা টিকা পৌঁছে দিতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগবে।’

সব মিলিয়ে আমরা যে অনিশ্চিত অবস্থায় আছি, কবে নাগাদ এখান থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি বলা মুশকিল। তবে করোনা এক অর্থে আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশসহ প্রায় সর্বত্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে বেহাল, তা এতটা নগ্নভাবে আগে কখনো উন্মোচিত হয়নি। এই মহামারী দেখিয়ে দিল, আমাদের মতো দেশের জনসাধারণের একটি বিরাট অংশের সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই। অর্থনৈতিক কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে তাদের দু-চার মাস ভর্তুকি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখাও অনেক কঠিন। অনলাইন এডুকেশন ও অফিস কার্যক্রমের মতো ব্যবস্থা চালু এবং তজ্জন্য ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের দ্রুত সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন সাধন যে কতটা জরুরি এবং এক্ষেত্রে আমরা যে এখনো অনেক পিছিয়ে আছি, এ বিপদে না পড়লে হয়তো আমরা কখনই ওভাবে বুঝতে পারতাম না। তবে সবকিছুর যেমন একটি শেষ আছে, আল্লাহ চাহে তো এ বিপদ থেকেও নিশ্চয়ই একদিন আমরা বেরিয়ে আসতে পারব। আমাদের নেমে পড়তে হবে মেরামতে। ভাবনার বিষয় হলো, আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের যে বিপুল ক্ষতি হয়ে গেল, তা আমরা পুষিয়ে নিতে পারব তো? যদি পারি তো কীভাবে, কত দিনে, কী কর্মপরিকল্পনায়?

 

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন: অধ্যাপক

ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়