ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাঙালির জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাকে উচ্চতর শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য একটি কলেজ স্থাপন ছিল বেশ জরুরী। এসময়ে ‘বাঙলা কলেজ’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন শিক্ষাবিদ আবুল কাসেম। জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ ছিলেন তাঁর এ কাজের একনিষ্ঠ সাথী। ‘বাঙলা কলেজে বাংলা মোল্লা সৃষ্টি করে ছেলেদের মাথা খাওয়ার জোগাড় করেছেন আবুল কাসেম’, এ জাতীয় নানা কুৎসা ছড়ানো হয় তখন। প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের অসীম ধৈর্য্য, সাধনা ও ত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে ‘বাঙলা কলেজ’ প্রতিষ্ঠা পায়।

বাংলা ভাষার স্বপক্ষে প্রচার আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র এবং অধ্যাপকের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘তমদ্দুন মজলিশ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন সৃষ্টি হয়। এই সংগঠন রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে আলাপ-আলোচনা, সভা-সমিতি প্রভৃতি নিয়ে সক্রিয় হয়। তাঁরা ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা না উর্দু’ এই নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। তাতে লিখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদের সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ। পুস্তিকাটির শুরুতে তমদ্দুন মজলিশের পক্ষে ভাষা বিষয়ক একটি প্রস্তাব সংযোজিত হয়। সেটি লিখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং তমদ্দুন মজলিশের প্রধান ব্যক্তিত্ব আবুল কাসেম।

  প্রথম বর্ষের কলেজের ছাত্র ও অনুষদদের সাথে অধ্যক্ষ আবুল কাশেম (১৯৬২), উৎসঃ প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের পুত্র মাহমুদ বিন কাসেম এর পারিবারিক সংগ্রহ থেকে


ভাষা বিষয়ক সেই প্রস্তাবের বাস্তব রূপায়নে কাজ করেন শিক্ষাবিদ আবুল কাসেম। তিনি ‘বাঙলা কলেজ’ স্থাপনে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পঞ্চান্নতে প্রতিষ্ঠা পায় বাংলা একাডেমি। ছাপ্পান্নতে বাংলা ভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি অর্জন করে। এতে করে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় বহুগুণ। ১৯৫৯ খ্রিঃ হতে ১৯৬১ খ্রিঃ পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কার্জন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানের বক্তা হিসাবে জনাব কাসেম বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। একটি সভায় তিনি বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তান বহু আগে থেকে উর্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করে উর্দুকে সরকারী ভাষা ও সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যমরূপে গড়ে তোলার সঠিক প্রচেষ্টায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে, উর্দু কলেজকে পাকিস্তান সরকার বিপুল অর্থ ও জমি দিয়ে সাহায্য করেছেন। অথচ এত আন্দোলন সত্বেও বাংলাকে সর্বস্তরে চালু করার উদ্দেশ্যে আমরা বাঙলা কলেজ গড়ে তুলতে পারলাম না। সরকারও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ  নীরব ভূমিকা পালন করছে। সেই সভাগুলিতে আমি এও বলেছিলাম : সরকার এগিয়ে না আসলে আমরা নিজেরাই অদূর ভবিষ্যতে বাঙলা প্রচলন করে দেখাবার উদ্দেশে বাঙলা কলেজ স্থাপন করব।’

 ‘বাঙলা কলেজ’ স্থাপনের উদ্যোগকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য ‘বাঙলা কলেজ প্রস্তুতি কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটির প্রথম সভা হয় ১৯৬১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে। পরবর্তী সভাগুলো ১৯ ফেব্রুয়ারি এবং ১৮ জুন একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারির সভায় আবুল কাসেম উত্থাপিত প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। প্রস্তাবটি ছিলঃ ‘বাঙলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে অবিলম্বে ঢাকায় একটি বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হউক’। অবশেষে ১৯৬২ সনের ৪ মার্চ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অবস্থিত রাইটার্স গিল্ড ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় ‘বাঙলা কলেজ’ প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। অধিকাংশ সভায় সভাপতিত্ব করেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যাঁরা এসব সভায় উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ, কবি জসীম উদ্দিন, কবি গোলাম মোস্তফা, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম, তোফাজ্জল হোসেন, ডক্টর ইন্নাস আলী (পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য), ডক্টর কামালউদ্দীন, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল ওসমান গনি, বাংলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান, প্রাক্তন ডিপিআই আবদুল হাকিম, ডক্টর হাসান জামান, অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, কবি জাহানারা আরজু, আখতার-উল-আলম (পরবর্তীতে ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক)সহ তমদ্দুন মজলিসের আরো বেশ কিছু নেতা-কর্মী। বাঙলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ। খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ (পরবর্তীতে এডিপিআই ও জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল) সহসভাপতি ও প্রাক্তন ডিপিআই আবদুল হাকিম ট্রেজারার নির্বাচিত হন। অবৈতনিক প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষাবিদ আবুল কাসেম।

  ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে, উৎস-মোস্তফা কামালের লেখা প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন গ্রন্থ

বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন উচ্চ মাধ্যমিক ডিগ্রী শাখায় বাংলা কোনো পাঠ্য বই ছিল না। জনাব কাসেম বিজ্ঞানের বাংলা পাঠ্য বই লিখতে গিয়ে প্রায় এক হাজার নতুন ও সহজ পারিভাষিক শব্দ তৈরী করেন। বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে সহজবোধ্য করে ছাত্রদের জন্য শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা প্রচলনে নিরলসভাবে কাজ করে যান। একাজে তিনি কতটুকু পরিশ্রম ও উদ্যমী ছিলেন তার রচিত তখনকার পাঠ্যপুস্তকের তালিকা থেকে তা বুঝা যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:

ক) বিজ্ঞান প্রকাশ ৭ম শ্রেণীর পাঠ্য খ) বিজ্ঞান প্রকাশ ৮ম শ্রেণীর পাঠ্য গ) বিজ্ঞান প্রকাশ ৯ম শ্রেণীর পাঠ্য ঘ) বিজ্ঞান প্রকাশ ১০ ম শ্রেণীর পাঠ্য ঙ) বিজ্ঞান প্রকাশ ১১ তম শ্রেণী চ) বিজ্ঞান প্রকাশ ১২ তম শ্রেণী ছ) মাধ্যমিক পদার্থ বিজ্ঞান : ( ১ম ভাগ ও ২য় ভাগ) জ) মাধ্যমিক রসায়ন:(১ম ও ২য়) ঝ) জৈব রসায়ন দ্বাদশ শ্রেণী ঞ) মাধ্যমিক জ্যামিতি প্রকাশ ট) উচ্চ মাধ্যমিক ত্রিকোণমিতি ঠ) উচ্চ মাধ্যমিক এলজাবরা ড) লগতালিকা ৫-৬ফিগার ঢ) ল্যাবরেটরী পদার্থ (প্রথম খন্ড ১১তম শ্রেণী) ণ) ল্যাবরেটরী পদার্থ (দ্বিতীয় খন্ড ১২তম শ্রেণী) ত) ডিগ্ৰী পদার্থিকা থ) উচ্চ মাধ্যমিক স্টেটিকস্ দ) উচ্চ মাধ্যমিক ডিনামিক্স ধ) লগ টেবিল ৫ম ও ৬ষ্ঠ সংখ্যা ন) উচ্চ মাধ্যমিক ক্যালকুলাস প) সহজ পদার্থিকা (১ম ও ২য় ভাগ ) ফ) ফিজিক্স টিউটর (১ম ও ২য় ভাগ) ব) সহজ বাংলা। যখন বাংলায় কোনো উচ্চতর বই ছিল না; ছিল না প্রয়োজনীয় পরিভাষাসমূহ সেই ক্রান্তিলগ্নে নিজস্ব ভাষা, পরিভাষা সৃষ্টি করে একাই এতোগুলো বই রচনা করা নিঃসন্দেহে এক দুঃসাহসিক কাজ।

আবুল কাসেম এর লেখা ‘আমাদের ভাষার রূপ’ (১৯৬৮) গ্রন্থে পারিভাষিক শব্দ ব্যবহারে তাঁর চিন্তা-চেতনার স্বরূপ বোঝা যায়। তিনি লিখেছেন, ‘বিগ্যান ও টেকনিকেল বিষয়ে বই প্রনয়ন ও অনুবাদের বেলায় আমাদের সহজ শব্দ ব্যবহারে ততপর হওয়া উচিত। Iron-কে লোহা না বলিয়া লৌহ, copper-কে তামা না বলিয়া তাম্র,  furnace-কে চুলা না বলিয়া চুল্লী,  increased বাড়িল না বলিয়া বৃদ্ধি করিল-এই ভাবে ভাষার আভিজাত্যের নামে সঙস্কৃত-করন ও কঠিন-করন কোন মতেই কাম্য নয়। আমাদের মনে রাখা উচিত, গ্যান বিগ্যান যত সহজে বুঝা ও বুঝান যায় ততই মঙগল। গ্যান-বিগ্যানের বই লেখায় অনাবশ্যক সাহিত্য করাও অন্যায়। উচু দরের অলঙকারাদি ব্যবহার করিয়া কোন বিষয়কে দুর্বোধ্য ও ঘোলাটে করিলে খতি বই লাভ নাই। বিগ্যান বুঝিবার জন্য-কবিতাদি সাহিত্যের মত অনুভব করার জন্য নয়। তবে সহজ সরল রাখিয়াও ভাষা যাতে সাবলিল ও পরিবেশনা যাতে রিদয়গ্রাহি হয় সেদিকে লেখককে অবশ্যই নজর দিতে হইবে। এমনকি ছোট খাট উপমা দিয়াও কোন কঠিন বিষয়-বস্তুকে সহজ করিয়া বুঝাইয়া দেওয়াও বিগ্যান-লেখকদের একটা বড় কাজ।’

তবে আবুল কাসেমের ভাষা সংস্কার কর্মসূচি যে বিরুদ্ধতার মুখে পড়েছিল, তার প্রমাণ মেলে সাংবাদিক ও সমালোচক হাসান হাফিজুর রহমানের লেখায়। প্রতিবিম্ব (পত্র সাহিত্য) (সেপ্টেম্বর, ১৯৭৬) গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলা ভাষার নামে এক অদ্ভুত বিকৃত ভাষা প্রচারে বাংলা কলেজ কর্তৃপক্ষ কোমর বেঁধে নেমেছেন। বাংলা কলেজের ছাত্রদের জন্যে যে সকল পাঠ্য সিলেবাস তাঁরা নিজেরা তৈরি করেছেন, তা আর যাই হোক বানানে কি বাক্য গঠনে কি শব্দ প্রয়োগে আমাদের পরিচিত বাংলা ভাষার সঙ্গে তার সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অনেক অধ্যাপক এই ভাষা শিক্ষাদানে আপত্তি জানানোর অপরাধে সেই কলেজ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। কিন্তু তাতে কিছুই যায় আসেনি।  বাংলা কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব পদ্ধতি অনুযায়ী বিকৃত ও অভিনব পদ্ধতিতে বাংলা ভাষার নব নির্মাণের সম্পূর্ণ অনুকূল এবং আয়ত্তাধীন পরিবেশ অন্তত বাংলা কলেজে অবাধ ও অব্যাহত করে তুলতে শেষ পর্যন্ত পুরো সক্ষম ও সফল হয়েছেন। এর জন্য ভিন্ন মত ঝেঁটিয়ে বিদায় করতেও যেমন তাঁদের বাধেনি, বশংবদ মনোভাবসম্পন্ন লোকজনের অভেদ্য দুর্গ রচনাতেও কসুর তাঁরা করেন নি। মোটকথা বাংলা ভাষার নবরূপ বিধানে আটঘাট বেঁধেই তারা জান কবুল সংগ্রামে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমী, কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডμকেউই তাদের অভিনব বিকৃত বাংলা ভাষা তৈরীর প্রয়াসে সম্মতি দেননি। কিন্তু তার থোড়াই পরোয়া তাঁরা করেন।’ পরিভাষা ব্যবহারে শিক্ষাবিদ আবুল কাসেমের প্রচেষ্টা যে দীর্ঘ মেয়াদে সফল হয়নি একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে তা পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায়।

‘বাঙলা কলেজ’ প্রতিষ্ঠার পথ কিন্তু মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। শুরুর দিকে কলেজের প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল ও অধ্যাপকগণ বিনা বেতনে বৎসরাধিককাল এবং কেউ কেউ নামমাত্র বেতনে অধ্যাপনা করেন। স্বয়ং প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ৮ বছর বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারের কাছে কলেজের জন্য একটি বাড়ি বরাদ্দের আবেদন দেয়া হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হতে একটি বাড়ির সন্ধান নিয়ে সেটি কলেজের অনুকূলে বরাদ্দের জন্য আবেদন দিতে বলেন। ফলশ্রুতিতে ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ আবুল কাসেম সরকারের জিম্মায় রয়েছে এমন একটি পরিত্যক্ত বাড়ি খুঁজতে শুরু করেন। ধানমন্ডির একটি বাড়ির জন্য আবেদন দেয়া হলে সেটি সরকারের অন্য কাজে লাগবে বলে কর্তৃপক্ষ তা দিতে অস্বীকার করে। আজিমপুরের আরেকটি বাড়ির জন্য বলা হলে, সেটিও কৃষি বিভাগের একজন কর্মকর্তা কেনার কথা থাকায় নামঞ্জুর হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও বাড়ি না পাওয়ায় নিরুপায় হয়ে জনাব কাসেম, তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু নবকুমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নানের শরণাপন্ন হন। স্কুলটি ছিল বখশী বাজারে। নবকুমার স্কুল ভবনে নৈশ কলেজ হিসেবে ‘বাঙলা কলেজ’ চালুর প্রস্তাব দেন তিনি। আবদুল মান্নান স্কুল পরিচালনা কমিটিকে এ প্রস্তাবে রাজী করান। উল্লেখ্য যে, আবদুল মান্নান ছিলেন তমদ্দুন মজলিশের একজন বিশিষ্ট কর্মী। জুন-জুলাই (১৯৬২) মাস হতে নবকুমার ইনস্টিটিউটে বাঙলা কলেজের দাপ্তরিক কর্মকান্ড শুরু হয় এবং অক্টোবরে প্রথম ক্লাশের উদ্বোধন হয়। প্রথম বছর বিজ্ঞান বিভাগ, দ্বিতীয় বছর বাণিজ্য বিভাগ এবং তৃতীয় বছর মানবিক বিভাগ খোলা হয়। নবকুমার স্কুল ভবনে অফিস কক্ষের স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম তাঁর বাসভবন ৩২/২ আজিমপুরের নীচতলার একটি কক্ষ আসবাবপত্র, টেলিফোন ও বিদ্যুৎ সুবিধাসহ ছেড়ে দেন, যা কয়েক বছর বাঙলা কলেজের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বন্ধু-বান্ধব, মজলিস কর্মী, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখের সহায়তায় কলেজের আসবাবপত্র জোগাড় করা হয়। অতঃপর বহু ধর্ণা দেওয়ার পর বোর্ডের অনুমোদন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী এফিলিয়েশন পাওয়া যায়। কিন্তু স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর অনুমোদন দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে।

বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার পর প্রায় সাত বছর নবকুমার ইন্সটিটিউটেই ক্লাস চলে। এ সম্পর্কে জনাব আবুল কাসেমের স্মৃতিচারণ: ‘বাঙলা কলেজ ও বাঙলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত জায়গা একোয়ার করে দেয়ার জন্য আমরা সরকারের কাছে আবেদন করি। অনেক চেষ্টার পরও মূল ঢাকা শহরে কোন জায়গা পাওয়া না যাওয়ায় আমি তখনকার মীরপুরের জঙ্গলাকীর্ণ একটি পতিত জায়গা পছন্দ করি। আর সেই জায়গা একোয়ার করে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই। বাঙালী অফিসারের ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও সেই পাকিস্তানী আমলে সরকারের উর্ধ্বতন কমিটি কর্তৃক একোয়ার করার প্রস্তাব পাশ করাতে সমর্থ হই। ১৯৬৪ খৃ. দিকে আমরা কলেজের জন্য উক্ত জায়গা (প্রায় ১২ একর) আয়ত্ত করি। এই জমির মূল্য পরিশোধের ও তাতে বাড়ী তৈরীর ব্যবস্থা করার উদ্দেশে শিক্ষা বিভাগের তখনকার ডিরেক্টর আমার পরম শ্রদ্ধেয় মুরব্বী জনাব ফেরদাউস খানের শরণাপন্ন হই। প্রধানত তাঁরই পরামর্শে ও চেষ্টায় বাঙলা কলেজকে সরকারের উন্নয়ন স্কীমভুক্ত করতে সমর্থ হই। এই বাবদে কলেজের নামে কয়েক লক্ষ টাকা মঞ্জুর হয়। সেই টাকা দিয়ে আমরা কিস্তিতে জমির মূল্য পরিশোধ করি। আর কলেজের ডিগ্রি সেকশনের আংশিক ল্যাবরেটরীসহ মূল দালান ও হোস্টেলের একাংশের দোতলা তৈরীর কাজ সমাধা করি। কলেজের দালান তৈরী আংশিকভাবে সম্পন্ন হলে ১৯৬৯ সনে ঐ দালানে আমরা দিনের বিভাগ উদ্বোধন করি, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ক্লাস শুরু করে দেই।’ কলেজের ভবন তৈরির কাজ আংশিকভাবে শেষ হলে ১৯৬৯ সালের ৪ অক্টোবর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় গবেষণা ও শিক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ শামসুল হক বাঙলা কলেজের বি.এসসি ও বি.কম ক্লাশ উদ্বোধন করেন। বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুতে ওই সময়ের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ ও পাকিস্তান অবজারভার ব্যাপক সমর্থন জুগিয়েছে। এ কলেজেরই পথ ধরে পরবর্তীকালে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়ার ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হয়।

বাঙালি বিদ্বান ব্যক্তিদের কেউ কেউ অবশ্য বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুতে প্রচন্ড বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করলে ছাত্র-ছাত্রীরা চাকরি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে। এমনকি ‘বাঙলা মৌলবি’ জন্ম হবে বলেও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন তাঁদের অনেকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ দ্রুতই জনপ্রিয়তা লাভ করে। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর বাংলা মাধ্যমের এই পরীক্ষার্থীদের ফলাফল ছিল বেশ সন্তোষজনক। তৎকালীন সরকারি কলেজের তুলনায় পাশের হার ছিল অনেক বেশী। ঐতিহাসিক সেই ‘বাঙলা কলেজ’ বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভূক্ত। ১৯৮৫ সালে শ্রীবৃদ্ধি ঘটে হয়েছে ‘সরকারি বাঙলা কলেজ’। মিরপুর দারুস সালাম সড়কের পশ্চিম পার্শ্বে সগৌরবে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:

১।  জীবনকথা: শাহেদ আলী, বাতিঘর, ২০১৯

২।  দৈনিক আজাদ পত্রিকা, ১৯ আগস্ট ১৯৬২

৩।  বাংলাপিডিয়া

৪।  ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২৬তম খন্ড

৫।  ভাষা আন্দোলন ও ডান-বাম রাজনীতি, আসাদ বিন হাফিজ, প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারী ১৯৯০

৬।  প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন, মোস্তফা কামাল, প্রথম প্রকাশঃ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮

৭। প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, লেখকঃ আজিজুর রহমান, দেওয়ান আবদুল হামিদ, মফিজউদ্দিন আহমদ ও আহমাদ কাফিল, প্রথম প্রকাশঃ ১৫ এপ্রিল ১৯৯১

হোসাইন মোহাম্মদ জাকি: গবেষক