২০২২ সালে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের বাজার ছিল বেশ অস্থিতিশীল। চাল, তেল থেকে শুরু করে মসলা ও ডাল জাতীয় প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়েছে, কিন্তু আশ্চার্যের বিষয়, বৈশ্বিক বাজারের চেয়ে বাংলাদেশের বাজারে দাম বেড়েছে বেশি। বাংলাদেশের বাজারে চালের দাম এশিয়ার অন্যান্য স্থানের চেয়ে অনেক বেশি বলে বিভিন্ন সময়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। কিছুদিন আগেই এফএওর তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ইউএসডিএ বলছে, প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের বাজারে চালের দাম অন্তত ৭০ শতাংশ বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব দেশের কোনো কোনোটিতে গত দুই বছরে চালের দাম কমেছে। আবার যেসব দেশে বেড়েছে, সেগুলোয়ও এ বৃদ্ধির হার সীমাবদ্ধ ছিল ১০ শতাংশের নিচে, যেখানে বাংলাদেশে প্রধান খাদ্যশস্যটির দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। কিন্তু উৎপাদন খুব একটা কমেনি, আমদানিও হয়েছে। বাজারে খাদ্যশস্যটির দাম বারবার বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত সরকারের দুর্বল মজুদ ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততাই দায়ী। বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর অনিয়ন্ত্রিত উত্থান, কার্যকর ও দক্ষ সরবরাহ চেইন না থাকা, চালের মজুদ ধারাবাহিকভাবে উচ্চপর্যায়ে না রাখা ও মনিটরিংয়ের অভাবেই চালের বাজারে দাম বাড়ে। এ মুহূর্তে বাজারে মনিটরিং বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি ও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের মাধ্যমে চালের মজুদ ও সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লেও চালের দাম খুব একটা বাড়েনি। মূলত ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকেই বাংলাদেশ বেশি চাল আমদানি করে। এসব দেশের কোনোটিতে চালের দাম কমেছে। ডলারের ঊর্ধ্বগতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ফলে চালের দাম কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু গত দুই বছরে দেশের বাজারে চালের দাম যে পরিমাণ বেড়েছে তা অস্বাভাবিক। অভিযোগ রয়েছে, চাল ব্যবসায়ীরা চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। সিন্ডিকেটের কারণে চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে চালের মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণ হিসেবে চালকলের মালিক ও খুচরা বিক্রেতাদের অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের বিষয়টি উঠে এসেছে। চালকলের মালিকরা কেজিপ্রতি ৮-১৪ টাকা লাভ করেছেন। কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি ধানের দামও বেড়েছে। এছাড়া করপোরেট গ্রুপগুলোও বাজারে প্রবেশ করে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। সরকার চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। চাল ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী। ফলে চালের দাম তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এজন্য সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরো শক্তিশালী হতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের চালের মজুদ বেড়েছে। সরবরাহ বাড়াতে শুল্ক কমানো হয়েছে। এসব নানা উদ্যোগ নিয়েও বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দেশের বড় ৫০টি অটো রাইস মিলের হাতেই থাকে বেশির ভাগ ধান-চালের মজুদ। তারা প্রচলিত আইন না ভেঙেই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। ফলে মজুদ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। স্বাভাবিক আইনে অটো রাইস মিলগুলো চলার মতো ধান দেশে আছে কিনা সেটি ভাবতে হবে। ফলে কয়টা অটো রাইস মিলকে অনুমোদন দেয়া হবে এবং এসব মিলের উৎপাদন সক্ষমতা কতটুকু হবে, সে বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তা না হলে কোনো ধরনের আইনের ব্যত্যয় না ঘটিয়েই চালের সব নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ে চালের দাম নির্ধারণ ও বিপণন প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বিশেষ করে মিলাররা ভীষণ শক্তিশালী ও পারদর্শী হয়ে উঠেছে। কেননা বাজার তৈরি ও নিয়ন্ত্রণে কৃষকের কোনো ধরনের সাংগঠনিক সক্ষমতা নেই। সরকারের কর্তৃপক্ষ হিসেবে খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই পর্যাপ্ত দক্ষতা ও হাতিয়ার। তাই সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। চালের সরবরাহ চেইনে আরো দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কৃষকের মজুদক্ষমতা বাড়ানো ও তথ্য সরবরাহের ওপরও জোর দিতে হবে।
বিভিন্ন মাধ্যম সঠিক নীতির অভাবে চাল কেনার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হতে দেখা যায়। বাজার থেকে ধান না কেনার কারণে ধানের বাজারের একচ্ছত্র আধিপত্য মিলারদের কাছেই তুলে দেয়া হয়। ধানের এত বড় বাজার এককভাবে ব্যবসায়ী ও মিলারদের কাছে রাখা মোটেও যৌক্তিক নয়। সরবরাহ চেইনের সমস্যাগুলো দূর করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। এজন্য সরকারের মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার প্রচলন করতে হবে। পাশাপাশি চিকন ও মোটা দানার চালের জন্য সরকারের আলাদা ন্যূনতম সহায়তা মূল্য (এমএসপি) ঘোষণা করা প্রয়োজন। খাদ্য অধিদপ্তর যেন মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ সংগ্রহ করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে সেটি খেয়াল রাখতে হবে। আবার মিলাররা তাদের মুনাফা দেখানোর ক্ষেত্রে অনেক সময় উপজাত দ্রব্য ভালো দামে বিক্রি করলেও সেটির হিসাব না দেখিয়ে বলে থাকেন তাদের মুনাফা হচ্ছে না। এর মাধ্যমে তারা সরকারের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন।
চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি অভিঘাত পড়ে। চালের দাম বৃদ্ধি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দেয়। আর কভিডকালে এটি দ্বিমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সরকারের দুর্বল মজুদ ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় অপর্যাপ্ততার কারণে বাজারের নিয়ন্ত্রকসংশ্লিষ্টরা সুযোগ নিচ্ছেন। আমদানি ও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের মাধ্যমে চালের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজারে চালের সরবরাহে সংকট তৈরি না হলেও দাম অস্থিতিশীল। মূলত বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর অনিয়ন্ত্রিত উত্থান, কার্যকর ও দক্ষ সরবরাহ চেইন না থাকা, চালের মজুদ ধারাবাহিকভাবে উচ্চপর্যায়ে না রাখা ও মনিটরিংয়ের অভাবে চালের বাজারে দাম অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
সরকারের উচিত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বসে অবিলম্বে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা। ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা করা আবশ্যক। সেই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে সমন্বয় থাকতে হবে। সমস্যা ঘাড়ের ওপর পড়লে তড়িঘড়ি করে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে। বাজার স্বাভাবিক রাখতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। আমদানি শুরুর পর ডলারের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং জোরদারের সঙ্গে দুদফায় আমদানি শুল্ক ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্পমূল্যে ওএমএস চালু করা হয়। এতে চালের বাজারের অস্থিরতা দূর হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা করতে সুযোগ খোঁজেন। অজুহাত পেলেই তারা তা কাজে লাগিয়ে ভোক্তার পকেট কাটেন। কাজেই ব্যবসায়ীরা যাতে ভোক্তার পকেট কাটতে না পারেন, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
চাল এদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। মানুষ তার আয়ের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ব্যয় করে খাদ্য খাতে। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ চাল কিনতেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে থাকে। কাজেই চালের দামের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনমান। এ অবস্থায় চাল নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি চলতে দেয়া উচিত নয়। অব্যাহত মূল্যস্ফীতির কারণে দম বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে ভোক্তার। কেবল চাল নয়, সব নিত্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দরে; শিশুখাদ্যের দামও আকাশছোঁয়া। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে ক্রেতার দীর্ঘশ্বাস বেড়েই চলেছে; আয়ের সঙ্গে ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে গরিব মানুষ। দুঃখজনক হলো, অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির করে তুললেও বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর তত্পরতা একেবারেই দৃশ্যমান নয়। নিত্যপণ্যের বাজারে যারা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।










