জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান একটি অনুপাত দিয়ে পরিমাপ করা হয় যা জনপ্রিয়ভাবে অনুপ্রবেশ অনুপাত নামে পরিচিত; বীমা প্রিমিয়ামকে জিডিপি দিয়ে ভাগ করে এ অনুপাত পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বীমা খাতে অনুপ্রবেশের অনুপাত বর্তমানে মাত্র শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ। এটি অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম, যেমন ভারতে ৪ দশমিক ২ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ২ দশমিক ৮, ভিয়েতনামে ২ দশমিক ৬ এবং এমনকি পাকিস্তানে শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ। যদিও বাংলাদেশে ৮১টি বীমা কোম্পানি রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি কোম্পানি জীবন বীমা এবং ৪৬টি সাধারণ বীমা নিয়ে কাজ করে, এর নিম্ন অনুপ্রবেশের অনুপাত নির্দেশ করে যে খাতটি সঠিকভাবে বৃদ্ধি পায়নি। বিপুলসংখ্যক বীমা কোম্পানির বোঝা, অযৌক্তিক প্রতিযোগিতা এবং নানা ধরনের আর্থিক অনিয়ম খাতটিকে বিভিন্ন অসংগতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ‘ব্যাংকের জন্য ব্যাংকাস্যুরেন্স নির্দেশিকা’ জারি করেছে যেখানে ব্যাংকগুলোকে প্রচলিত বীমা পণ্য বাজারে বিক্রির জন্য বীমা কোম্পানির করপোরেট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। ব্যাংক গ্রাহকদের কাছে বীমা পরিষেবা বিক্রির এ ব্যবস্থা ব্যাংকাস্যুরেন্স নামে পরিচিত। এখানে ব্যাংকগুলো কেবল করপোরেট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে, তাদের গ্রাহকদের বীমা পলিসি সম্পর্কে জানাবে এবং আগ্রহী গ্রাহকদের কাছে সেগুলো বিক্রি করবে।
ব্যাংকাস্যুরেন্সের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, ব্যাংকাস্যুরেন্স বিক্রির জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ এবং তত্ত্বাবধানমূলক কাঠামো প্রদান করা, বীমার অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি করা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর জন্য ব্যাংকিং ও বীমা পরিষেবার প্রসার বাড়ানো। এটি বীমার আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির চেষ্টা করবে, ভোক্তা সুরক্ষা উন্নত করবে এবং ব্যাংক ও বীমাগ্রহীতার জন্য ওয়ান স্টপ সেবা প্রদান করবে।
ব্যাংকের জন্য কিছু মানদণ্ড রয়েছে যা বীমাকারীদের করপোরেট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার জন্য অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। প্রধান মানদণ্ডগুলো হলো একটি ব্যাংকের ন্যূনতম মূলধন ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকতে হবে; এর ন্যূনতম ক্রেডিট রেটিং ২ থাকতে হবে; এর নিট খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের অধিক হবে না; এর নিট মুনাফা পরপর তিন বছর ধনাত্মক থাকতে হবে। একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ তিনটি জীবন বীমা এবং তিনটি সাধারণ বীমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে।
এ পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান গ্রাহকদের যথাযথ প্রয়োজন বিশ্লেষণ করে বীমা পরিষেবা বিক্রি করবে। সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে তাদের বীমা পরিষেবার বৈশিষ্ট্য এবং খরচ সম্পর্কিত সব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। এখানে গ্রাহকরা সিদ্ধান্ত নেবেন যে তারা ব্যাংকিং পণ্যের সঙ্গে বীমা পণ্য কিনতে চান কিনা। এছাড়া ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের জন্য বীমা পণ্যের উপযুক্ততা পরীক্ষা করবে। ব্যাংক কোনোভাবেই তাদের গ্রাহকদের বীমা পণ্য কিনতে বাধ্য করতে পারবে না। ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের জানার জন্য পূর্ববর্তী একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের আর্থিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করবে। তাই কোনো ওয়াক-ইন-গ্রাহক ব্যাংক থেকে এ পরিষেবাগুলো কেনার যোগ্য হবেন না।
ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা অধিক হওয়ার কারণে এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যাংক বেশি বিশ্বস্ত হওয়ায় তাদের প্রচুর পরিমাণে বীমা পরিষেবা বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংক তাদের শাখা নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল প্লাটফর্ম এবং বিক্রয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সহজেই বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের কাছে বীমা পরিষেবা বিক্রি করতে পারবে। ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে ব্যাংক, বীমা কোম্পানি ও গ্রাহকদের জন্য কিছু ইতিবাচক প্রভাব আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
বীমা খাতটি দীর্ঘকাল ধরে আস্থার সংকটের সম্মুখীন যা এর নিম্ন দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত, তহবিল আত্মসাৎ, নিম্ন বিনিয়োগ মান এবং তারল্য সংকট থেকে উদ্ভূত। বীমা প্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা পলিসিহোল্ডারদের সব শর্ত সঠিকভাবে জানায় না। বেশির ভাগ পলিসিহোল্ডার বীমা প্রতিনিধির কথার ওপর ভিত্তি করেই পলিসি গ্রহণ করেন। কিন্তু পরে যখন পলিসি পরিপক্ব হয়, তারা প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যাপক অসংগতি দেখতে পান। প্রতিনিধিরা ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমেও পলিসি বিক্রির চেষ্টা করেন। তারা একটি পলিসি বিক্রির প্রথম বছরে সক্রিয় থাকেন, কারণ তারা তখন বেশি কমিশন পান। সম্প্রতি এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তথাপি বীমা খাত সম্পর্কে অবিশ্বাস সৃষ্টির জন্য বীমা প্রতিনিধিরা অনেকাংশে দায়ী।
ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে এ সমস্যা কমানো যেতে পারে যেখানে ব্যাংক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে। ব্যাংক এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে তাদের মুনাফা বাড়বে। যেহেতু ব্যাংকের গ্রাহকের সংখ্যা অনেক বেশি, তাই তারা সহজেই তাদের কাছে বীমা পরিষেবা সম্পর্কে প্রচার করতে পারবে। বীমা পরিষেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকের গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তি প্রতিনিধির চেয়ে ব্যাংকের ওপর অনেক বেশি আস্থা রাখবেন।
ব্যাংকাস্যুরেন্স থেকে ব্যাংকগুলো দুভাবে উপকৃত হবে। প্রথমটি হলো, বীমাসেবা বিক্রয়ের ওপর কমিশন। ব্যাংক বেশি বেশি সেবা বিক্রি করতে পারলে তাদের কমিশন ও মুনাফা বাড়বে। দ্বিতীয় সুবিধা হলো, ব্যাংকাস্যুরেন্স সেবা বিক্রির জন্য ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই কিছু মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে যা তাদের সামগ্রিক কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করবে। ব্যাংকাস্যুরেন্সের জন্য ব্যাংকগুলোকে তাদের খেলাপি ঋণ কমাতে হবে, ন্যূনতম মূলধন অনুপাত বজায় রাখতে হবে এবং তিন বছরের জন্য নিট মুনাফা অর্জন করতে হবে। এসব মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে যা তাদের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন।
এসব মানদণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু ব্যাংককে ব্যাংকাস্যুরেন্সের জন্য অযোগ্য করে তুলবে। অনেক ব্যাংক এরই মধ্যে কিছু কিছু মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায় যে ১৪টি ব্যাংক রেকর্ড মূলধন ঘাটতির সম্মুখীন যা প্রধানত উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ঘটেছে। আবার উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংক মুনাফা হ্রাস করে। ব্যাংকাস্যুরেন্সের সুবিধা নেয়ার জন্য এ তিন আন্তঃসম্পর্কিত মানদণ্ড (মূলধন, খেলাপি ঋণ ও মুনাফা) অবশ্যই ব্যাংকগুলোকে পূরণ করতে হবে যা তাদের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করবে। এসব শর্ত আরোপ করে শুধু ভালো ব্যাংককে ব্যাংকাস্যুরেন্স পরিষেবা বিক্রির অনুমতি দেয়া হয়েছে।
যেখানে ব্যাংকাস্যুরেন্সে নিযুক্ত থাকার জন্য ব্যাংককে অবশ্যই এ মানদণ্ডগুলো কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে, সেখানে তারা সেসব বীমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করবে যাদের বাজারে সুনাম আছে, দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত ভালো, তহবিল আত্মসাতের কোনো ইতিহাস নেই এবং তহবিল বিনিয়োগে বিচক্ষণতা রয়েছে।
সাধারণত ব্যাংকের গ্রাহকরা আর্থিকভাবে বেশি শিক্ষিত হওয়ার কারণে তাদের আর্থিক প্রয়োজনীয়তাগুলো পূরণ করে এমন পলিসি গ্রহণ করতে চাইবে। তারা কাস্টমাইজড পণ্যের দাবি করতে পারে যা দ্রুত ডিজাইন করা বীমা কোম্পানির জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্যের আবশ্যিক শর্ত সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। খরচ-সুবিধা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিকে সেগুলো তৈরি করে বাজারে ছাড়তে হবে। এতে বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়বে। এ পণ্যগুলো যদি বেশি পরিমাণে বিক্রি করা যায় তাহলে বীমা কোম্পানি আর্থিকভাবে লাভবান হবে এবং তাদের ব্যবসা বৃদ্ধি পাবে। এতে বীমা খাতের অনুপ্রবেশ বাড়বে।
ব্যাংকাস্যুরেন্স বিদ্যমান ব্যক্তি প্রতিনিধির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। যদি এসব প্রতিনিধি পলিসিহোল্ডারদের ব্যাংকের চেয়ে ভালোভাবে বোঝাতে ব্যর্থ হন, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের ভূমিকা বীমা খাতে গৌণ হয়ে যাবে। তাই নতুন পলিসিহোল্ডারদের আকৃষ্ট করতে তাদের অবশ্যই সৎ এবং দক্ষ হতে হবে। বিপরীতে, যদি ব্যাংকগুলো ব্যাংকাস্যুরেন্সে জড়িত কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ব্যাংকাস্যুরেন্সের সম্ভাব্যতা সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানো যাবে না। তাই ব্যাংকগুলোকে বীমা পণ্যের প্রচার ও বিক্রির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ যদি পলিসিহোল্ডার এবং ব্যাংকের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয় তাহলে এটি ব্যাংকের কার্যক্রমের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। করপোরেট প্রতিনিধি (ব্যাংক) এবং ব্যক্তি প্রতিনিধির মধ্যে একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতা স্থাপনের মাধ্যমে বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বিরাজ করবে বলে আশা করা যায়। এতে গ্রাহকরা ভালো মানের বীমা পরিষেবা পাবেন বলে ধরে নেয়া যায়।
যদি গ্রাহকের আর্থিক ঝুঁকি বিবেচনা করে বীমা পণ্যকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায় এবং তা বিক্রি করার জন্য ব্যাংক যথেষ্ট তৎপর থাকে তাহলে অনেক লোক বীমার আওতায় আসবে। শুধু তা-ই নয়, যাদের ব্যাংক হিসাব নেই তারাও ব্যাংক হিসাব খুলে বীমাসেবা নিতে উদ্বুদ্ধ হবে। এটি অবশ্যই ব্যাংকিং এবং বীমা পরিষেবার প্রসার বৃদ্ধি করবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে।
ব্যাংকাস্যুরেন্স সফল হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বীমা কোম্পানির অবশ্যই ভালো উদ্দেশ্য থাকতে হবে। তাদের তহবিল ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে বিনিয়োগ এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তহবিলের অপব্যবহার রোধ করতে হবে। তহবিল আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বীমাকারীদের আরো বেশিসংখ্যক লোককে বীমার আওতায় আনতে হবে এবং ঝুঁকি বিবেচনায় আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, যা বীমার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, দিতে হবে। ব্যাংকাস্যুরেন্স সফল হলে বাংলাদেশের বীমা খাতের দীর্ঘদিনের কলঙ্ক কিছুটা হলেও কেটে যাবে এবং অর্থনীতিতে এর অবদান একটি কাম্য পর্যায়ে পৌঁছবে।
ড. মো. মাইন উদ্দিন: অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










