দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস পুঁজিবাজার হলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। ২০২০ সালে বাংলাদেশে মোট অর্থায়নের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের তথ্যে তা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করা যায়। যেখানে ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ অর্থায়ন এসেছে ব্যাংক থেকে। দেশের পুঁজিবাজারের যাত্রা ছয় দশকের বেশি। কিন্তু অর্থনীতির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের পুঁজিবাজার এগোতে পারেনি। এর পেছনে অবশ্য বেশকিছু কারণ রয়েছে। পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেশি, ৮০ শতাংশের ওপরে। বিশেষজ্ঞরা একে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করছেন। আবার বাজারে শক্ত মৌল ভিত্তির কোম্পানির সংখ্যাও কম। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত ভালো কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ লাভজনক। কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ও শেয়ারে রিটার্ন হার প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু দেশের পুঁজিবাজারে খারাপ কোম্পানির জাঙ্ক বা প্রায় অচল শেয়ারই বেশি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট ও বাজারের গভীরতা বাড়াতে চাইলে শক্ত মৌল ভিত্তির ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়াতে হবে।
দেশের পুঁজিবাজারে শক্ত মৌল ভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা হাতে গোনা। তবে তাদের পারফরম্যান্স স্থিতিশীল। অনেক ভালো কোম্পানি দেশে ব্যবসা করছে। কিন্তু এসব কোম্পানির অনেকেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। দেশীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বস্ত্র, ফার্মাসিউটিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনেক ভালো কোম্পানি আছে, যারা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। ইউনিলিভার, মেটলাইফ, নেসলের মতো বহুজাতিক কোম্পানি যেমন পুঁজিবাজারের বাইরে রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক লাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতি দিয়েও আসছে না। দেশীয় বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও বাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এক্ষেত্রে তাদের কিছু যুক্তিও রয়েছে, যা অবহেলা করা যাবে না। শেয়ারবাজারে ‘এ’ ক্যাটাগরির জন্য ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে হয়। কিন্তু ঋণের সুদ হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। অর্থাৎ শেয়ারবাজার থেকে ব্যাংক ঋণে খরচ কম। এছাড়া বড় কোম্পানিগুলো আরো কম সুদের হারে ও খুব সহজেই এবং দ্রুত ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। অথচ শেয়ারবাজার থেকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। যাতে একটি কোম্পানির উদ্যোক্তা যে উদ্দেশ্যে টাকা সংগ্রহ করতে চায়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাহত হয়। তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে যে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ কর সুবিধা দেয়া হয়, প্রকৃতপক্ষে একটি অতালিকাভুক্ত কোম্পানি তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করে থাকে। কারণ অতালিকাভুক্ত কোম্পানি কর্তৃপক্ষ মুনাফা অনেক কম দেখিয়ে আয়কর কম দেয়ার সুযোগ নিতে পারে। আয়করের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ব্যবধান থাকলেও ভ্যাটের ক্ষেত্রে সমান। এক্ষেত্রে একটি অতালিকাভুক্ত কোম্পানি ভ্যাট প্রদান ফাঁকি দিতে পারে। যেহেতু তালিকাভুক্ত কোম্পানির মতো ওইসব কোম্পানিতে বিএসইসির মতো রেগুলেটর না থাকায় তদারক কম হয়। এসব বিষয় সংস্কার প্রয়োজন। নতুবা ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমে কমতে থাকবে।
বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাজার পর্যালোচনা অনুসারে দেখা যাচ্ছে, জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান ভারতে ৬২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৮৯ দশমিক ২৯, হংকংয়ে ১ হাজার ৩১১ দশমিক ১৪ ও চীনে ৩৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। এটা রাতারাতি অর্জন সম্ভব হয়নি। এর জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। পুঁজিবাজারের কাঠামোগত সংস্কার করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। দেশী-বিদেশী ভালো ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তথ্যগত স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জগুলো অটোমেশন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। অন্যায্য কারসাজি রোধে কঠোর আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে। একটি পরিপূরক সেকেন্ডারি মার্কেটও গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে দেশগুলোয় শেয়ারবাজার পরিণত হওয়ার পাশাপাশি হয়ে উঠেছে উন্নয়ন-অর্থায়নের বিকল্প উৎস। উল্লেখিত দেশগুলোর কর্মপ্রক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অনুসরণীয়। দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটছে। অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। এখন এ খাতের অবদান বেড়ে ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। কিন্তু এ খাতের উন্নয়নে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। সব দেশে শিল্প মূলধনের বড় অংশের জোগান শেয়ারবাজার থেকে এলেও বাংলাদেশে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। উদ্যোক্তারা এখানে নিজেরা ব্রোকারেজ হাউজের মালিক হলেও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য ব্যাংকে ছোটেন। এ প্রবণতা বদলাতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।
পাকিস্তানের অর্থনীতির আকার বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের চেয়ে ছোট। কিন্তু ওদের করাচি স্টক এক্সচেঞ্জ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে সমৃদ্ধ। এর মূল কারণ, করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত আছে, যেগুলো ঢাকার শেয়ারবাজারে নেই। উদাহরণস্বরূপ ইউনিলিভার, নেসলে, সিমেন্স, পালমোলাইভ, সানোফি-অ্যাভেনটিস ইত্যাদি। অথচ এসব কোম্পানি বাংলাদেশেও ভালো ব্যবসা করছে, শুধু তারা আমাদের শেয়ারবাজারে নেই। বাংলাদেশে ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চেষ্টা চলছে। কিন্তু তারা আসছে না। পুঁজিবাজারে আসতে নানা ধরনের আইনি জটিলতা পেরিয়েই তাদের এখানে লিস্টেড হতে হয়। এগুলো সহজ করতে হবে। আইন ও নীতিকাঠামোয় কিছুটা সংস্কার আনা হয়েছে। এতে অবশ্য খুব কমই সুফল মিলেছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আসছেন না, বরং আগের কিছু বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে চলে যাওয়ার খবর মিলছে। এদের ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন খাতের ভালো ভালো কোম্পানিকে বাজারে কীভাবে তালিকাভুক্ত করা যায়, তার উপায় সন্ধান করতে হবে। অন্যদিকে শুধু বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করলেই হবে না, বাজারে ভালো শেয়ারের জোগানও নিশ্চিত করতে হবে।
শেয়ারবাজারের গভীরতা বৃদ্ধির জন্য বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করা জরুরি। আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন অনেক বেশি। তাই এসব কোম্পানি বাজারে এলে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার জন্য সরকার দীর্ঘদিন ধরে উৎসাহ দিলেও কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে চাচ্ছে না। আবার কোনো কোনো কোম্পানি বাজারে এলেও মূলধন বৃদ্ধি করে না। কেবল কর মওকুফ সুবিধা পাওয়ার জন্যই তারা বাজারে আসছে। কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারমুখী করতে হলে আগে করপোরেট সুশাসন ও অডিটের মান বাড়িয়ে কর ফাঁকির পথ বন্ধ করতে হবে। শেয়ারবাজার থেকে তাত্ক্ষণিক অর্থায়নের সুযোগ নেই। কিন্তু নানা প্রক্রিয়া শেষ করে টাকা তুলতে বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এ সময় কী করে কমানো যায়, সে বিষয়ে ভাবতে হবে। কাঠামোগত কিছু সমস্যা তো রয়েছেই। তাছাড়া পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বিশ্বের পুঁজিবাজারে কী কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেটির দিকে সমন্বয় রেখে এগোতে হবে। নতুন প্রজন্মের বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে আকৃষ্ট করা ও বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণের জন্য বাজার ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন ও অনলাইন ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থা করা। সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এক্সচেঞ্জের অভিজ্ঞতা ও তাদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।
দেশের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী এবং আগামী দিনের বাণিজ্যকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার প্রয়োজন। ব্যাংকের পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে স্বল্প ব্যয়ে মূলধন সংগ্রহের বাজারে পরিণত করা না গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া, মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রভৃতি লক্ষ্য অর্জন করতে হলে স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই। আর স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের জন্য প্রয়োজন শক্ত মৌল ভিত্তির কোম্পানির তালিকাভুক্তি। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে যাতে তারা স্বল্পমেয়াদে বড় লাভের চিন্তা না করে দীর্ঘস্থায়ী ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। এভাবেই একটি উন্নত অর্থনীতি-সহায়ক টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে উঠবে।










