ওয়াশিংটনে ১০ এপ্রিল শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক গ্রুপ (ডব্লিউবিজি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বসন্তকালীন বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের চলমান বিবর্তনকে ফিরে দেখার সুযোগ প্রদান করেছে। যেহেতু উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী ও উদীয়মান উভয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তাই ব্যাংককে আরো উচ্চাকাঙ্ক্ষী সমাধান দিতে সক্ষম হবে এমন উপায়ে নিজেকে সংস্কার করতে হবে।

অর্ধশতাব্দী ধরে বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে লক্ষ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারীর কারণে প্রায় ৭০ মিলিয়ন মানুষকে চরম দরিদ্রতার দিকে ঠেলে দিয়েছে আর গত পাঁচ বছরের ধীরগতির প্রবৃদ্ধির পর ২০২০ সালে এসে বৈশ্বিক অগ্রগতি থমকে গেছে। যদি জলবায়ু পরিবর্তন এখনই নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এ সংখ্যা আরো বেড়ে ১৩২ মিলিয়নে পৌঁছতে পারে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ধারণা অনুযায়ী, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা অর্থাৎ যারা প্রতিদিন ২ দশমিক ১৫ ডলারের চেয়ে কম আয় করে তাদের সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০০ মিলিয়নে উন্নীত হবে এবং তিন বিলিয়নেরও অধিক মানুষ প্রতিদিন ৬ দশমিক ৮৫ ডলারের কম আয় করবে।

এ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন জোগাড় করার জন্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপ অনন্যভাবে প্রস্তুত। তবে ব্যাংককে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কৌশল ও অর্থায়ন ব্যবস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলোর চাহিদা এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ সংস্কারে ব্যাংকের অগ্রগতিতে আমরা সন্তুষ্ট হলেও অক্টোবরে বার্ষিক সভার আগে কমপক্ষে চারটি ক্ষেত্রে আরো কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রথমত, বিশ্বব্যাংককে অবশ্যই টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থিতিস্থাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচারের জন্য তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতে হবে। প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান এবং সুযোগ সৃষ্টির সর্বোত্তম উপায়। আর এভাবেই চরম দারিদ্র্য বিমোচন এবং অভিন্ন সমৃদ্ধি বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংকের দ্বৈত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে যে গত তিন দশকে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে চালিত করে এমন প্রায় সব অর্থনৈতিক শক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতির দেখে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ এখন ধারণা করছে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য অর্জন করার সম্ভাবনা খুব কম।

দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক ধীরগতির মূল কারণ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নতুন উপকরণ এবং কাজের ধরনের প্রয়োজন হবে। জনবল সক্ষমতা বৃদ্ধি ও লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যাংককে স্বাস্থ্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রতিপালন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে বৃহত্তর ভূমিকা পালনে সমর্থ করে। এটি কম ঝুঁকিবিমুখ পন্থা এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতের সঙ্গে দক্ষ সমন্বয় প্রত্যাশা করে। এটি গ্লোবাল সাউথ সদস্যদের প্রয়োজন এবং উদ্বেগ যত্নসহকারে শ্রবণ করা বোঝায়, যখন ব্যাংক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের জন্য মানদণ্ডের সংজ্ঞায়ন এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরবর্তী দশকজুড়ে মনোযোগ দেবে। 

দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাংক গ্রুপকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে নিম্ন আয়ের দেশগুলো উন্নয়ন এজেন্ডা রূপায়ণ করতে অধিক কর্তৃত্ব চর্চা করতে পারে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অধীনে পরিচালিত নমুনার মুখ্য নীতি হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালিত অঙ্গীকার, যার মাধ্যমে সরকার নিজস্ব পোর্টফোলিও সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ করে। এ গ্রাহককেন্দ্রিক নমুনা দেশগুলোকে জাতীয় প্রাধান্যের মাধ্যমে একই সারিতে নিয়ে আসতে ব্যাংকের কৌশল নিশ্চিত এবং নির্দিষ্ট সময়ে টেকসই বিনিয়োগে রাজনৈতিক সমর্থন পেতে সহায়তা করে। 

আমাদের প্রস্তাব বর্তমানে দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাপী সরকারি সম্পদে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শক্ত প্রণোদনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেমন গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করা। যখন এটি একটি ইতিবাচক ধাপ, ব্যাংককে অবশ্যই আপসকামী দেশগুলোর স্বত্ব থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে তাদের ওপর আরোপিত অত্যধিক অথবা ভারসাম্যপূর্ণ শর্তের মাধ্যমে। অধিকন্তু ব্যাংককে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হয় এ বিশেষ ঋণছাড় অথবা অনুদান যেসব বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে দেয়া হয়েছে, তা উচ্চ ঋণ খরচ বা মধ্যম আয়ের দেশ এবং নিম্ন আয়ের দেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় নেতৃত্ব প্রদান করে না। অথবা তাদের অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসট্যান্সের (ওডিএ) ব্যয় হিসেবে আসে না। অথবা লক্ষ্য যদি হয় বিনিয়োগ প্রচারণা যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে লাভবান করবে, এরপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো খরচ বহন করবে। 

তৃতীয়ত, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করার জন্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অংশীদারদের অবশ্যই ব্যাংকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করতে হবে। সবশেষে অংশীদার সরকার এবং অন্য সহযোগীদের অবশ্যই তাদের চলমান প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। ঠিক যেমন উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে জলবায়ু প্রশমন ও অভিযোজন প্রচেষ্টায় প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার, বেসরকারি খাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে জলবায়ু কার্যকলাপের জন্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার জোগান দেয়া এবং জি৭-এর প্রতিশ্রুতি রয়েছে বৈশ্বিক অবকাঠামো বিনিয়োগে ৬০০ বিলিয়ন ডলার উত্থাপনের। 

কিন্তু আরো বেশি প্রয়োজন রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে পূর্বে অনুমিত পরামর্শ হিসেবে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ক্যাপিটাল এডিকোয়েসি ফ্রেমওয়ার্কে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য পরবর্তী দশকজুড়ে ৫০-২০০ বিলিয়ন ডলার সহজলভ্য করার পরামর্শ দেয়া হয়। যখন কিছু আর্থিক উদ্ভাবন প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে, যা তাদের পূর্ণ প্রভাব বিবেচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে হাইব্রিড পুঁজির উত্থাপন ব্যাংকের ঋণ খরচ বৃদ্ধি করে, একই সময়ে যখন গ্রাহকরা ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ সুদহার এবং অস্থিতিশীল ঋণের বোঝার সম্মুখীন হয়। 

মূলধন বৃদ্ধি সম্পদের সুবিধা কাজে লাগানোর একটি উপায় হতে পারে। এটি শেয়ারহোল্ডারের শক্তিশালী সমর্থনের স্পষ্ট চিহ্ন। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই ব্যাংকের খরচ পাস থ্রু মডেলে হতে হবে। যাতে এটি কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বৃহত্তর ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। এতে দেশগুলো অস্থিতিশীল ঋণের বোঝা ছাড়াই উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে। এছাড়া অধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসট্যান্সের (ওডিএ) সম্পূরক অবস্থানের প্রয়োজনের ক্ষেত্রে আগামী কয়েক বছরে অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে।

পরিশেষে দারিদ্র্য হ্রাস করা কঠিন (এমনকি অসম্ভব) কাজ হবে। যদি না পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির উৎসের সঙ্গে উৎপাদন ও পরিবহনে নির্গমন উদ্ভূত বিনিয়োগ হয়। বিশ্বব্যাংকের বৃহত্তর উদ্দেশ্য রক্ষায় জলবায়ু প্রচেষ্টা একটি গুরুতর অবিচার হবে এবং এটি সবচেয়ে কার্যকর কৌশল নাও হতে পারে। যদি সাব-সাহারান আফ্রিকা (দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যতীত) বাড়তি চাহিদার বিদ্যুতের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করে রাতারাতি বিদ্যুৎ খরচ তিন গুণ করে, এর পরও এটি বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ যোগ করবে। 

একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কিছু সরকারকে ব্যয়বহুল ও বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। উচ্চমধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশগুলোকে নির্গমন কমানোর ওপর মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে বিপদাপন্ন গোষ্ঠী ও দেশগুলোর অভিযোজনের উদ্দেশ্যে জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা তৈরিতে সহায়তা করতে হবে। এজন্য ডব্লিউবিজি শেয়ারহোল্ডারদের আরো দক্ষ ও ন্যায্য হতে হবে। 

গ্লোবাল নর্থ ও সাউথের বহুমাত্রিক উন্নয়ন ব্যাংক ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের উদ্ভাবন ও অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে টেকসই, স্থিতিস্থাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বের লক্ষ্যকে এগিয়ে নেয়াই সর্বোত্তম উপায়।

(লেখকদের মতামত তাদের নিজস্ব এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও সংস্থাটির সদস্যদের সঙ্গে মতের মিল নাও হতে পারে) 

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট


ওয়েম্পি সাপুত্রা: বিশ্বব্যাংক গ্রুপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নির্বাহী পরিচালক

এরিভালদো আলফ্রেডো গোমেজ: বিশ্বব্যাংক গ্রুপে ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ডমিনিকান রিপাবলিক, একুয়েডর, হাইতি, পানামা, ফিলিপাইন, সুরিনাম, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর প্রতিনিধিত্ব করছেন

আবদুল সালাম বেলো: বিশ্বব্যাংক গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে আফ্রিকা গ্রুপ টুর নির্বাহী পরিচালক, আফ্রিকার ২৩টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন