দেশে করোনা সংক্রমণ ক্রমেই কমছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অচিরেই করোনামুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত হতে পারে। এর মধ্য ময়মনসিংহের নাম এসেছে অনেকটাই করোনামুক্ত এলাকা হিসেবে। তেমনি আরেকটি জেলা বরিশাল। এ জেলায় করোনা সংক্রমণ অনেকটাই কম। প্রায় ২৫ লাখ লোক বসতিসংবলিত এ জেলা ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে একটি বানারীপাড়ার উপজেলা। এ উপজেলায় রয়েছে বানারীপাড়া, বাইশারি, বিশারকান্দি, চাখার, ইলুহার, সলিয়াবাকপুর, সৈয়দকাঠি, উদয়কাঠি। এ এলাকার কয়েকটি জায়গা যেমন—বানারীপাড়া, বাইশারি, চাখার, ইলুহার, মলুহার, সোহাগদল, কউরিখাড়া এসব গ্রাম ঘুরে দেখার একটা সুযোগ হয়েছিল। তার কিছু অভিজ্ঞতা এ লেখায় তুলে ধরতে চাই। বালাম চালের জন্য বিখ্যাত এ এলাকায় পান ও কৃষিজাত, ফল যেমন পেয়ারা, কামরাঙা, আম, বড়ই ইত্যাদিও বেশ প্রসিদ্ধ। চারদিকে পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ায় মাছও বেশ প্রচুর। এখানকার খালের মধ্য কচুরির ভেলায় সবজি চাষ পৃথিবীখ্যাত। বেশির ভাগ চলাচল বা যাতায়াত নদীপথে। এখানে ‘বারানি’ বলে একটা কথা আছে, যার অর্থ বেড় হওয়া। বেশির ভাগ বাড়ির সঙ্গে ঘাটে নৌকা বাঁধা থাকে। যে যখন যেখানে যাওয়া দরকার নৌকা নিয়ে যাতায়াত করে। অল্প দূরত্ব হলে অবশ্য হাঁটা পথেই যেতে হয়।
গ্রিন লাইন ওয়াটার বাসে করে বরিশাল যাতায়াত বেশ সহজ। ফলে বেশকিছু চাকুরে বা ব্যবসায়ী আছেন যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন। অর্থাৎ ঢাকায় অফিস করেন এবং পরিবার থাকে বরিশালে। মূলত জলযানেই এ এলাকার মানুষ যাতায়াত করে। কারণ এটা বেশ আরামদায়ক এবং ভাড়াও আয়ত্তের মধ্য। ঢাকায় অসহনীয় যানজটে দীর্ঘ সময় বদ্ধ থাকার পর এটা মানুষের মনে কিছুটা হলেও ক্ষণিকের প্রশান্তি এনে দিতে পারে। তবে সদরঘাট পর্যন্ত পৌঁছতে যে বিরক্তিকর পরিস্থিতি তার কোনো উন্নতি হয়নি। অসংখ্য দোকানপাট অর্ধেক জায়গাজুড়ে থাকায় রাস্তা একদম শুরু। কী নেই সেখানে, বিরাট শপিং মল থেকে শুরু করে আধুনিক ইলেকট্রনিকসসামগ্রী, জুতা, কাপড়, ফলের দোকান, হরেক রকমের খাবারের দোকান, কাঁচাবাজার কোনো কিছুর কমতি নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রয়োজনের চেয়ে পণ্য সরবরাহ এতটা বেশি যে দরকষাকষি চলতেই থাকে। ফলে শোরগোলও খুব বেশি। রাস্তার মধ্যে দোকান অবশ্য ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় রয়েছে। এ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু তেমন কোনো উন্নতি কোথাও হয়নি।
যেহেতু সকালে উঠেই আমরা চলে এসেছি, তাই যানজটের মধ্যে বসে থাকতে হয়নি। সকালের সদরঘাটের চিত্র প্রাণভরে উপভোগ করলাম। নানা কাঠ-খড় পুড়িয়ে অবশেষে পৌঁছা গেল ওয়াটার বাসে। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম একেবারে ঠিক সময়ে জলযান ঘাট ছেড়ে রওনা হয়ে গেল। ৪০-৫০ সিট খালি তার পরও। যেহেতু বরিশালে যাচ্ছি তাই এদের বেশির ভাগই বরিশালীয়। সবার হাতেই মোবাইল, তাই কথাও চলছে অবিরত। কথায় বলে, বরিশালের নতুন দম্পতি যখন বাসরঘরে কথা বলে তা এতটাই জোরে যে বাইরে থেকে নাকি শোনা যায়, কথাটার সত্যতা পাওয়া গেল। এক ভদ্রলোক মনে হয় সরকারি চাকরি করেন। তিনি তার প্রমোশন-সংক্রান্ত আলোচনা করছিলেন। এত পারসোনাল বিষয় তিনি নির্দ্বিধায় উচ্চকণ্ঠে বলে গেলেন। তার কোনো আত্মীয়ের কাছে বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছিলেন হয়তো। কেউ একজন চাবি ফেলে এসেছেন, উচ্চৈঃস্বরে কী কোথায় রাখতে হবে তার বর্ণনা দিলেন। আরেকজন ভিডিও করেছেন গাড়ির ভেতরের সবকিছু মেয়েকে দেখাচ্ছেন। পাশে আমরা রয়েছি, কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
ওয়াটার বাসের বসার জায়গাগুলো বেশ আরামদায়ক। কাচের ঢাকনি থাকায় সামনের বিশাল জলরাশির খেলা উপভোগ করা যায়। শিশুরা কিছুটা খেলাধুলাও করতে পারে। সিট অনেক খালি থাকায় অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছেন। অবাক কাণ্ড, এত কম যাত্রী হয়তো অফিস-ডে তাই হয়তো। অন্যদিকে ঢাকা-বরিশাল প্লেনে কিন্তু যাত্রি পুরোটাই ভর্তি থাকছে। মনে করে বেশ ভালো লাগল এজন্য যে মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে, মানুষের হাতে টাকা আছে। কভিড আমাদের এ জায়গাগুলোতে হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। আমরা সিটে বসার স্প্রে এবং হাতে ঘন ঘন স্যানিটাইজার লাগাচ্ছিলাম। অন্য কাউকে তেমন কিছু করতে দেখলাম না।
নদীতে দেখা গেল অসংখ্য বার্জ একেবারে পানির সঙ্গে মিশে আছে। এমনকি কিছুটা পানিও উঠেছে, এগুলো বালি ভর্তি, বালি তুলে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে, শুনেছি এটি একটি লাভজনক ব্যবসা, পানিতে কিছুটা ধুয়ে গেলেও তেমন ক্ষতি হয় না। বর্তমানে এর ব্যবহার বেশি হচ্ছে নিচু জায়গা ভরাট করার ক্ষেত্রে।
আমরা একেবারে গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম তার পরদিন, রাস্তাঘাট বেশ ভালো। কথা হচ্ছিল মলুহারের শাহজামালের সঙ্গে, তার বয়স ৬১ বছর, বেশ কর্মঠ এখনো। তিনি তার ইঞ্জিনচালিত ট্রলার চালান। আমরা রিজার্ভে তার ট্রলারটি ভাড়া করেছি। মলুহার থেকে নান্দলা হয়ে ইন্দারহাট-কুরিখাড়া হয়ে আমরা সোহাগদল যাব। শাহজামাল তার দুঃখের কথা জানালেন। তিনি তার ভাইয়ের ট্রলার চালাতেন, কিন্তু কিছুদিন আগে তার ভাই সেখান থেকে তাকে বাদ দিয়ে দেন। এতে তার বেশ অভিমান হয়। তাই তিনি তার সর্বশেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে এ ট্রলার কিনেছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়। এ ব্যাপারে তার স্ত্রী ও ছেলে বড় ভূমিকা রাখেন। তার রোজগার এখন দিনে ১ হাজার টাকা। তিনি করোনার পর থেকে অর্থাৎ আগস্ট থেকে এ ব্যবসায় জড়িত। তবে তার মূলধন কবে উঠে আসবে এবং কবে তিনি লাভের মুখ দেখবেন, সে ব্যাপারে তার কোনো ধারণা নেই। তার কোনো বড় আশা নেই। সবকিছু আল্লাহর ওপর নির্ভর। তার সবটুকু জমি হারিয়ে ফেলেছেন, শুধু ভিটেটুকু আছে। সম্প্রতি তার স্ত্রী মারা গেছেন, ছেলের সঙ্গে থাকেন। ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে, ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে এবার, তিন মেয়ে, সবার বিয়ে হয়ে গেছে। চেহারাটা বেশ দুঃখী মনে হলো। তিনি এক বিরাট অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। করোনা সম্পর্কে তিনি একেবারেই অবগত নন। শুনেছেন কেবল এ রকম একটি জিনিস আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, একমাত্র জমিটি বিক্রি করে কি ভালো করেছেন? ভাইয়ের প্রতি অভিমানের চিত্র পরিষ্কার ফুটে উঠেছিল তার মুখে। স্ত্রীকে তিনি খুব ভালোবাসতেন বোঝা গেল। মাস্ক পরার কথা তিনি ভাবতেও পারেন না।
এদিককার বেশির ভাগ লোক কাঠের ব্যবসা করেন। ধান চাষের পরিবর্তে তারা এখন কমার্শিয়াল ক্রপ বেশি করেন, যেমন কাঠের মধ্যে মেহগনি, চাম্বল বেশ জনপ্রিয়, লাভও ভালো। ফলের চাষ যেমন মাল্টা, আনারস, পেয়ারা ইত্যাদি। বেশির ভাগ ধানের মধ্যে ইরি চাষ করে, কিছুটা আমন হয়। ইরির ফলন খুব ভালো। আরেকটি বড় ফসল হলো বোম্বাই মরিচ, অন্য মরিচও হয়। আশ্বিন থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত বোম্বাই মরিচের চাষ বেশ মুনাফা দিয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে কৃষিতে বেশ বড় ধরনের বৈচিত্র্য এসেছে, চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে।
আজ আরো একজনের সঙ্গে কথা হলো। তিনি তইয়ব আলী, তাকে এলাকায় বেশ পরিচিত মনে হলো। তিনি খেজুরের গাছ কাটেন। আমরা জানতাম তাদের শিয়ালি বলে, তবে লোকাল ভাষায় বলে হিঁয়ালি, এরা খেজুরের গাছ কাটে কাঁচা রস বের করে আনার জন্য। তইয়ব আলী দিনে ২০টি গাছ কাটতে পারেন। তাদের হিসাব হলো প্রতি তিনদিনের মধ্য দুদিনের রস হিঁয়ালির, বাকি একদিন মালিকের। বর্তমানে ২০টি গাছে তার রস খুব বেশি হয় না। ৮-১০ হাঁড়ি মাত্র। তার দৈনিক আয় ৬০০ টাকার মতো। তাতে তার দিব্যি দিন চলে যায়। তইয়ব আলীর বয়স ৭১ বছর। তার কোমরে একটি মোটা দড়ি, বেশ তরতর করে অতি অল্প সময়ে তিনি গাছে উঠে যান এবং উপরে উঠে নিজেকে প্রথমে দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলেন, তারপর গাছ কাটেন। জানতে চাইলাম কখনো কোনো দুর্ঘটনা হয়নি। তিনি জানালেন, খেজুর গাছ থেকে নয়, বরং অন্য একটি গাছ থেকে তিনি পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙেছিলেন, তবে এখন ভালো আছেন। তিনি আর কোনো কাজ জানেন না। বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে এসেছে, রসও কম হয়, তাই হয়তো ভবিষ্যতে এ পেশার লোক হারিয়ে যাবে। করোনার ব্যাপারে তিনি একেবারেই নির্বিকার, তার কোনো আগ্রহও নেই এ ব্যাপারে। তার পরিবারের, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব কারো কাছেই এ ধরনের কোনো খবর তিনি জানেন না।
কথা হলো বাদশা মিয়ার সঙ্গে। তিনি নার্সারি করেন, তাই পিরোজপুর থেকে চারার টব নিয়ে এসেছেন। একেকটি দেড় টাকা করে দাম। সঙ্গে তার ছেলে রুবেল কাজ করে। তারা গাছ লাগিয়ে চারা তৈরি করেন। কলম তৈরি করেন। জানালেন, কলমের একটি আম গাছে দুই বছরের মধ্য আম হতে পারে। তিনি ৩০ বছর থেকে এ কাজ করছেন। করোনা সম্পর্কে তার কোনো ভীতি নেই, তিন জানেন না এটি একটি ভয়ংকর ভাইরাস।
দক্ষিণের এ জনপদে আরো একজনের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি আলফেসানি শাওন, করোনার সময় তিনি চাকরি ছেড়ে দেশে চলে এসেছেন। বাড়িতে আগে পোলট্রি ফার্ম অন্যের কাছে ভাড়া দেয়া ছিল, এখন তিনি নিজেই চালান। তার ফার্ম আরো বড় করার ইচ্ছা। তার ফার্মে ৫০০ মুরগি রয়েছে। ৪৫০-৪৮০টি ডিম তিনি পান প্রতিদিন। সপ্তাহান্তে লোক এসে ডিম নিয়ে যান, ৬ টাকা হালি। তারাই আবার মুরগির খাবার, ওষুধ দিয়ে যান, মুরগির ডিমের দাম থেকে এগুলোর দাম বাদ দিয়ে তার যেটুকে থাকে তাতে তার মাসে ১৫-২০ হাজার টাকার মতো আয় থাকে। ডিমের দাম নির্ধারণ করে ডিম ব্যবসায়ী সমিতি। ফেসবুকের মাধ্যমে ডিমের দাম তারা সবাই জানতে পারেন। এছাড়া আছে পোলট্রি সমিতি, পোলট্রি খাবার সরবরাহকারী সমিতি ইত্যাদি। অর্থাৎ পোলট্রি ফার্মকে কেন্দ্র করে অগ্র-পশ্চাৎ শিল্প গড়ে উঠেছে। যুব ছেলেরা এতে বিনিয়োগে উৎসাহী হয়ে উঠেছে। মুরগির খামারের সঙ্গে আছে পুকুরের পাঙ্গাশ মাছ। ছয়-সাত মাসে পাঙ্গাশ মাছ বিক্রির জন্য তৈরি হয়ে যায়। এটা আরেকটা লাভজনক ব্যবসা। এছাড়া মা-মুরগি ১৮ মাস পর বিক্রি করা যায়। চাকরি ছেড়ে তিনি ভালোই আছেন। গ্রামের পরিবেশও ভালো। করোনার ভয় নেই। তার মতো এ রকম অনেক যুব ছেলে রয়েছে, যারা এ ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে।
করোনার ব্যাপারে তাদের কোনো সমস্যা নেই। তাদের অঞ্চলে কোনো ইনফেকশন সম্পর্কে তিনি জানেন না। অর্থনীতিতে তারা বেশ ভালোই অবদান রাখছেন। খুব সকালেই চলছে চালকল, ট্রলারও চলছে। অটো, মাহেন্দ্র চলছে। আরেকটি নতুন উদ্যোগ দেখলাম। তৈরি হচ্ছে ক্রিকেট খেলার ব্যাট। ওয়ালটনের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল, ইলেকট্রনিকস পণ্য প্রত্যেকের ঘরে, আছে বিদ্যুৎ, সেই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎও রয়েছে। মনে হলো বাংলাদেশের ৬২ হাজার গ্রাম জেগে উঠেছে বিপুল শক্তি নিয়ে। এবার আমাদের সত্যিকারের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
এখানকার মানুষ করোনার ভয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়নি। তারা একদিকে যেমন পাচ্ছে শহরের প্রায় সবটুকু স্বাদ সেই সঙ্গে গ্রামের বিশুদ্ধ বাতাস, তাই তাদের করোনার ভয় নেই। তারা আমাদের থেকে ভালো আছে। হয়তো আস্তে আস্তে শহরের এই বিরক্তিকর যানজট, ইট-বালি, সিমেন্টের পিলার, পচা ড্রেনের গন্ধ, ধুলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মানুষ একদিন তার জন্মস্থানেই ফিরে যাবে।
ফেরদাউস আরা বেগম: প্রধান নির্বাহী, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)










