আজ
বঙ্গবন্ধুর ৪৭তম শাহাদতবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের এ দিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরিবারের সদস্যসহ আত্মীয়-স্বজনের অনেককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ শোকের মাসের আজকের দিনে আমাদের অবশ্যই আবারো স্বীকার করতে হবে, তার ঐতিহাসিক ভূমিকা, যা তিনি বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে অগ্রনায়ক হিসেবে পালন করেছিলেন। যুদ্ধ-পরবর্তী বিপর্যস্ত পরিস্থিতি থেকে দেশকে কীভাবে তিনি পুনর্গঠন করেছিলেন এবং খুব গোলযোগপূর্ণ স্রোতের বিপরীতে নতুন রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালনা করেছিলেন, তাও আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার একজন নিবেদিত, প্রতিশ্রুত ও সম্মোহনী নেতা হিসেবে নতুন রাষ্ট্র নিয়ে বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা আমরা শুরু থেকেই দেখতে পাই। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তাকে লন্ডনে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি সেখান থেকে আসেন ভারতে, উদ্দেশ্য প্রিয় মাতৃভূমিতে ফেরা। ভারতে আসার অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে নতুন দেশ নিয়ে তার রূপকল্প তুলে ধরেছিলেন। হানাদারমুক্ত একটি স্বাধীন বাংলাদেশে তার প্রথম যাত্রাকে তিনি ‘অন্ধকার থেকে আলো, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতা, নিরাশা থেকে আশার’ অভিযাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আরো বলেছিলেন, ‘আমি
ফিরে যাচ্ছি আমার হূদয়ে কারো জন্য কোনো বিদ্বেষ নিয়ে নয়, বরং এ পরিতৃপ্তি নিয়ে যে, অবশেষে মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের, অপ্রকৃতিস্থতার বিরুদ্ধে প্রকৃতিস্থতার, কাপুরুষতার বিপরীতে সাহসিকতার, অবিচারের বিরুদ্ধে সুবিচারের এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভের বিজয় হয়েছে।’
বঙ্গবন্ধুর উদারতা এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রতি বিশ্বাস তার আশাবাদে প্রতিফলিত হয়েছিল। এ স্পিরিটই তাকে সামনের মাসগুলোয় শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন নয়, উপরন্তু নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রটির আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্পৃক্তির মতো জটিলতাগুলো মোকাবেলায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি জানতেন, খুব যত্ন ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে এ কঠিন পথের জট খুলতে হবে। না হলে বড় সংকটে পড়তে হবে।
একজন রাষ্ট্রনায়ক, বিরল বাগ্মী বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমে পা রেখেই স্বাভাবিকভাবে খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় বেশ বাস্তবসম্মত ভঙ্গিতে ভাষণ এবং বাংলাদেশের বীর জনতার উদ্দেশে মূল্যবান পরামর্শ দেন। প্রথম সুযোগেই অবাঙালিদের কোনো ধরনের হামলা ও অন্যায় না করার ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানে আটকে পড়া চার লাখ বাঙালির নিরাপত্তা বিষয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন। পাকিস্তানিদের প্রতি তিনি কোনো ‘বিদ্বেষ’ পুষে না রাখার বিষয়টি পুনর্ব্যক্তের পাশাপাশি এও পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ‘যারা
আমাদের দেশের মানুষকে নির্বিচারে-অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে, তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
একই ভাষণে তিনি মুসলিম বিশ্বকে (মিথ্যা ও বিতর্কিত পাকিস্তানি অপপ্রচার খণ্ডন করে) উদ্দেশ্য করে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি দেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার
পরে বাংলাদেশ হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র।’ তিনি এ বলেও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, ‘ইসলামের
নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এদেশের মানুষকে হত্যা করেছে, নারীদের অপমান করেছে। ইসলামের কোনো অমর্যাদা হোক আমি এটা চাই না।’ একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সংঘটিত গণহত্যা বিষয়ে তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের আবেদন জানান। এছাড়া তিনি ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ওআইসির মহাসচিব টিংকু আব্দুর রহমানের কাছে বার্তা পাঠিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ঠাণ্ডা মাথায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে ৩০ লাখ নিরপরাধ ও নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করেছে, সে ব্যাপারে কিছু না করার জন্য জোরালো প্রতিবাদ জানান।
এক্ষেত্রে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ১০ মিলিয়নেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে তিনি সফলভাবে পুনর্বাসন করেছেন, ত্রাণ সহায়তা জুগিয়েছেন এবং যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত অর্থনীতির মধ্যে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। এ প্রচেষ্টা এবং অ্যাপ্রোচ ১৯৪৮-৭১ এ সময়পর্বে বঙ্গবন্ধু যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে তিনি কারাবাস বরণ করে নিয়েছিলেন, নিজের কাজ ও বিশ্বাসের প্রতি অটল ছিলেন এবং কোনো আপসরফা ও অসম্পূর্ণ সমাধানে রাজি হননি। এটি তাকে মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত করেছিল।
দুর্ভাগ্যক্রমে স্বাধীনতার পর তিনি আর বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারেননি। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আগস্টের এ মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর একটা অংশ এবং কিছু অসন্তুষ্ট-অসহিষ্ণু রাজনীতিবিদ। তারা সেদিন রাস্তায় দাপিয়ে বেড়িয়েছিল, সরলতাকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিল। দেশকে বাঁচাতেই যাদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছিল মুক্তির কণ্ঠকে তারাই আবার রুদ্ধ করেছিল।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তো খুব জঘন্য-ঘৃণ্য কাজ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও খারাপ ছিল পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। ১৯৭৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দখলদার রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং তার অনুগত আইন, সংসদ ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নজিরবিহীন এক পরিপত্র জারি করেছিলেন। সেখানে জাতিকে জানানো হয়েছিল, ‘দায়মুক্তি
অধ্যাদেশ ১৯৭৫ মূলে হত্যাকাণ্ড এবং ১৫ আগস্টে ঘোষিত সামরিক শাসনের বিষয়ে কোনো ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়া না চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।’ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!
সংগত কারণে এ ধরনের জবাবদিহিতা ঘাটতির পরিণামও ছিল খুব স্বাভাবিক। হত্যাকারীরা অন্য একটি বড় অপরাধ করতে আর কোনো দ্বিধা করেনি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঠিক তাই ঘটেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীসহ জাতীয় চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। যেমনটা আশা করা হয়েছিল, ওই বিষয়টি তদন্তের জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে তিন সদস্যের একটি জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু সেটিই ছিল গল্পের সমাপ্তি। আর পরে কিছু হয়নি।
এ অস্থির সময়ের রক্তপথ বেয়েই বিএনপির উত্থান। অবশ্য দলটির নেতৃত্ব ভুলে গিয়েছিল, যা ঘটে সাধারণত তারই আবার অন্য কোনোভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। সাধারণ মানুষকে হত্যার ক্ষেত্রে তাদের জবাবদিহিতা ঘাটতির প্রতি পক্ষাবলম্বন শেষ পর্যন্ত তাদেরই বিপদে ফেলে দেয়। ১৯৮১ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বিএনপিও দিশেহারা হয়ে পড়েছিল।
আমরা দেখেছি, পরবর্তী সময়ে ১৫ আগস্ট সংঘটিত অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করতে সময় লেগেছিল। বলতে গেলে দীর্ঘ ২১ বছরের আগ পর্যন্ত শুরু করা যায়নি। এটা মূলত শুরু হয় ১৯৯৬ সালে, যখন নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ওই সময় সরকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়। কুখ্যাত দায়মুক্তির বিধান বিলোপ করে এবং আগস্টের হত্যাকাণ্ডে দায়ীদের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া (বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নয়) শুরু করে। এ পদক্ষেপ প্রশংসনীয়ভাবে আমাদের বিচার ব্যবস্থার প্রতি ভুক্তভোগীদের আস্থা ফিরিয়ে আনে। একই সঙ্গে ওই সময় থেকে সরকার ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০০১ সালে নির্বাচিত নতুন বিএনপি জোট সরকার মৌলিক সৌজন্যও প্রদর্শন করেনি। পরের বছরের ২৮ জুলাই তারা জাতীয় শোক দিবস পালন বাতিল করে। এটা ছিল সবচেয়ে জঘন্য ও ঘৃণার রাজনীতি। ক্ষমতায় থাকা সরকার এবং রাজনৈতিক প্রভাবিত বিচার বিভাগ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারপ্রক্রিয়া কম-বেশি স্থগিত করে রেখেছিল। এটা প্রত্যক্ষ করা বেশ অদ্ভুত যে, কীভাবে বিচারিক পদানুক্রমেও ‘হয়রানির’ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল। সৌভাগ্যের বিষয়, জনগণের জন্য আইনের যথার্থ প্রক্রিয়া এবং স্বাভাবিক বিচারের মূলনীতি ২০০৮ সালের ২৭ জুলাই আবার সমুন্নত করা হয়, যখন উচ্চ আদালত এ তাত্পর্যপূর্ণ শোক দিবস বাতিল বেআইনি ঘোষণা করে। আমি বিশ্বাস করি, এ দিন জাতীয় শোক দিবস পালনের বিষয়টি দেশের আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।
তার পর থেকে পুরো জাতি ওই বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এবং ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে রায় কার্যকর হওয়া দেখেছে। এখনো কয়েকজন আছে যারা ওই হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিল। আমরা আশা করি, এ অধ্যায় যেন শেষ পর্যন্ত সমাপ্ত হয়। এটা শেষ হলে জাতি অনেকটা কলঙ্কমুক্ত হবে।
বঙ্গবন্ধুর জীবন পর্যালোচনায় আমরা দেখতে পাই, তিনি সারা জীবন জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, এগুলো সাধারণ মানুষের কল্যাণে প্রয়োজন। তিনি এ দেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একজন দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। তার কাছে এটাই ছিল বাঙালি মূল্যবোধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্তহীন উৎস। এগুলো ধারণ করেই তিনি একজন বাঙালি হিসেবে গর্ব করতেন এবং এর নিরিখেই গড়তে চেয়েছিলেন সোনার বাংলা। তার জীবন ছিল আত্মনিবেদনের, বিসর্জন ও ত্যাগের। এটা নিদারুণ কষ্টের যে তুলনামূলক কম বয়সেই তার প্রচেষ্টাগুলোকে নস্যাৎ করা হয়েছে।
মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার; পররাষ্ট্র, তথ্য অধিকার ও সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষক










