বেশ অনেক দিন ধরে দেশে চালের বাজার অস্থির। ক্রমেই বাড়ছে দাম। ভোক্তাসাধারণের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আবার সরকারি মজুদ কমে আসায় টেস্ট রিলিফ ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নেও কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে গত আড়াই মাস ধরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির চেষ্টা করছে সরকার। এরই মধ্যে ভারত থেকে কিছু চাল আমদানি হয়েছে। মিয়ানমার থেকেও চাল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। এর বাইরেও স্বল্পমেয়াদি দরপত্রের মাধ্যমে সাড়ে পাঁচ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ চলমান। আমদানীকৃত কিছু চাল বাজারে এলেও খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। এ অবস্থায় চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে সরকারিভাবে (জিটুজি) আরো সাড়ে তিন লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর বাস্তবায়নই এখন কাম্য।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ টন। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সেবা বিভাগের ইউনাইটেড স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের (ইউএসডি)। গত আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ লাখ টন ধান কম উৎপাদন হয়েছে। একে তো উৎপাদন কম; তার সঙ্গে যোগ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল সংগ্রহে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা। ফলে সরকারি মজুদ ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। মূলত সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত চাল না থাকলে মজুদদাররা কৃত্রিমভাবে চাল সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারো তা-ই হয়েছে। বারবার বলা হলেও শেষ পর্যন্ত মিলাররা সরকারি গুদামে চাল দেয়নি। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে; বেড়েছে চালের দাম। ঊর্ধ্বমুখী দামের প্রেক্ষাপটে পাঁচ মাস আগেই প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে চাল কেনার অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করতে অনেক সময় গড়িয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে, চাল আমদানির বিষয়ে শীর্ষ পর্যায় থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর খাদ্য অধিদপ্তর চাল আমদানি শুরু ও শুল্ক কমানোর জন্য বলেছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। অথচ মন্ত্রণালয় আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি। শুল্ক কমাতেও অনেকটা সময় নিয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় চাল আমদানির জন্য অনুমোদন দেয়া ৩২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনেকেই এলসি খুলতে গড়িমসি করছে। এ কারণে চাল আমদানি হচ্ছে খুব শ্লথগতিতে, যা দাম কমাতে সহায়ক নয়। প্রধানমন্ত্রী যখন আগস্টে চাল আমদানির অনুমতি দেন, বিশ্ববাজারে দাম কম ছিল। আমন ধান তখনো পাকেনি। ওই সময়ে আমদানি শুরু করলে দেশে পর্যায়ক্রমে চাল আসত। দামও হঠাৎ করে এভাবে বাড়ত না। এছাড়া, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ (এফএও) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা  বেশ আগে থেকেই করোনা মহামারীর কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য সংকট সৃষ্টির বিষয়ে সতর্ক করে আসছিল। কিন্তু তা যথাযথভাবে আমলে নেয়া হয়নি। সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নিলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। সুতরাং আজকের এই চাল সংকটের দায় খাদ্য মন্ত্রণালয় কোনোভাবে এড়াতে পারে না।

চলমান চাল সংকটের নেতিবাচক প্রভাব দ্বিবিধ। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যপণ্য হওয়ায় চালের বাজারে অস্থিরতা শুরু হলে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবারগুলো আর্থিক চাপে পড়ে। এখন যেমনটা পড়েছে। তদুপরি এবারের প্রেক্ষাপট আরেকটু ভিন্নতর। কভিড-১৯ মহামারী অব্যাহত; বিপুলসংখ্যক মানুষের আয়-রোজগারের পথ সংকুচিত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তা খুব উদ্বেগজনক। অন্যদিকে চালের সরকারি মজুদ অব্যাহতভাবে কমছে। এখন মজুদ পাঁচ লাখ টনে নেমে এসেছে। সরকারের মজুদ সবসময় যেখানে অন্তত ১০ লাখ টন থাকার কথা, সেখানে তা তার অর্ধেকে নেমে আসাটা খাদ্যনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আশঙ্কাজনক। এমনটি হলে আপত্কালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কঠিন হবে বৈকি। কাজেই আমদানি বেগবান করার বিকল্প নেই।

এও সত্য, আমদানির ক্ষেত্রে একেবারে অপরিণামদর্শী হওয়া যাবে না। তাতে হিতে বিপরীতে হবে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আট লাখ টন চাল কম উৎপাদন হয়। সেই ঘাটতি পূরণে সরকার চালের আমদানি শুল্ক ২ শতাংশে নামিয়ে আনে। আমদানি হয় ৪২ লাখ টন চাল। এর প্রভাবে পরের বছর ধানের দাম কমে গিয়ে লোকসানে পড়েন কৃষকরা। এখন বোরো মৌসুম চলছে। সামনে ধান উঠবে। প্রয়োজনের তুলনায় আমদানি বেশি হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই আগের সংকটের পুনরাবৃত্তি এড়াতে পরিকল্পিত আমদানি নীতি নিয়ে এগোতে হবে। ইএসডিএর এক প্রতিবেদনে ঘাটতি মেটাতে সব মিলিয়ে ১১ লাখ টন চাল আমদানির প্রাক্কলন করা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরাও সরকারি গুদামের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই আমদানির পরামর্শ দিচ্ছেন। বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে চাল আমদানির চলমান উদ্যোগগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে বলে প্রত্যাশা।