দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের প্রধান খাদ্য চাল। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রথম প্রাধিকার থাকে চালের জোগান নিশ্চিত করা। উৎপাদন কম হলে আমদানি করে অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখে দেশগুলো। চাল আমদানির ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরই অধিক নির্ভরশীল। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীলংকায় খাদ্য সংকট দেখা দিলে এগিয়ে আসে ভারত। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ গেলেও অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রয়োজন মেটাতে দেশটি থেকেই চাল আমদানি করছে বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন (সার্ক) এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সেটি হয়ে ওঠেনি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চালের মতো সম্ভাবনাময় অন্যান্য ক্ষেত্রেও সহযোগিতা জোরদার করার সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস, সমুদ্রসম্পদ, জ্ঞান আদান-প্রদান, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। সার্ক কার্যকর না হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। 

একটি দেশের বেঁচে থাকার জন্য কৃষি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত খাত। খাদ্য ছাড়া দেশ বিশৃঙ্খলা ও দেউলিয়া অবস্থা অনুভব করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার চালের প্রাপ্যতা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে। সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় হলো চাল আমদানি করা। এই আমদানি নীতির কারণে অনেক ক্ষতি হয়, কারণ বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কিন্তু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বিরোধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট পরিস্থিতিতে চাল আমদানি ছাড়া বিকল্প নেই। এদিকে অনেক দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ মজুদ বজায় রাখতে রফতানির দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ চাল আমদানিতে শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারকেও বেছে নিয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও গম আমদানিতে সংকটে পড়ে। এরই মধ্যে গত মে মাসে বাংলাদেশে গমের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ ভারত রফতানি বন্ধ করে দিলে সংকট আরো ঘনীভূত হয়। এমন পরিস্থিতিতে জিটুজি পদ্ধতিতে রাশিয়া থেকে পাঁচ লাখ টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশ সরকার বাজারে চালের সরবরাহ ঠিক রাখতে এ মুহূর্তে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর একটি হলো কূটনীতির মাধ্যমে চালের আমদানি বাড়ানো। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেক দেশই এখন খাদ্যপণ্য রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিবেশীসহ রফতানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতেই হচ্ছে বাংলাদেশকে। আবার গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এখন কৃষি খাত। দেশটি আবার চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ অবস্থায় বর্তমান পরিস্থিতিতে চাল কূটনীতিকেই ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে দুই দেশেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বাজারে চালের সরবরাহ ঠিক রাখতে এ মুহূর্তে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর একটি হলো কূটনীতির মাধ্যমে চালের আমদানি বাড়ানো। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেক দেশই এখন খাদ্যপণ্য রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিবেশীসহ রফতানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতেই হচ্ছে বাংলাদেশকে। আবার গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এখন কৃষি খাত। দেশটি আবার চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ অবস্থায় বর্তমান পরিস্থিতিতে চাল কূটনীতিকেই ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে দুই দেশেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এখন প্রতিবেশী ভারত থেকেও চাল আমদানি বাড়াতে জোর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গত বছরের শেষ দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভারত থেকে চাল আমদানিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার্ষিক কোটা চাওয়া হয়। এ প্রস্তাব নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে ভারতও।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) একটি আদর্শ জোট হয়ে উঠেছে। ইইউর কোনো দেশে আর্থিক বা খাদ্য সংকট দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট জোট দেশটিকে সহায়তায় এগিয়ে আসে। খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশ থেকে খাদ্য ঘাটতির দেশে পণ্য সরবরাহ করা হয়। আর্থিক সংকটের সময়ও অর্থ প্রদান করে সহায়তা করার উদাহরণও রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সার্কের যাত্রা হয়েছিল এ অঞ্চলের সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে। কিন্তু সেটি সফল হয়ে উঠতে পারেনি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই এখন মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এটিকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। চাল কূটনীতিকে সমুদ্র কূটনীতি, পরিবেশ কূটনীতি, প্রাকৃতিক সম্পদ কূটনীতির মতো ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করার সুযোগ রয়েছে। ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি করছে, শ্রীলংকাকে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশও প্রতিবেশী ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। 

২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী মন্দা ও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। ২০২৩ সালে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাস দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। আগামী বছর বিশ্বে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা (এফএও) বলেছে, খাবারের অভাব এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শুধু দুর্ভিক্ষই হবে তা নয়, বরং এর জেরে বিভিন্ন দেশে বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, করোনা মহামারী, সংঘর্ষ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০১৯ সালের পর বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে সাড়ে ৩৪ কোটি ছাড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও সংঘর্ষের ফলে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া ২০২৩ সালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও রফতানি হ্রাস পাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তুলতে হবে। প্রতি বছরই বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করে। এক্ষেত্রে বিশ্ববাজার অস্থির হয়ে উঠলে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কী করা হবে তার পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মিয়ানমারসহ খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করায় মনোযোগ দিতে হবে।