স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী পূর্তির দোরগোড়ায় বাংলাদেশ। বিশেষ এ ক্ষণটি উদযাপনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রার পর থেকে দেশের অর্থনীতির বাঁকবদলগুলো নিয়ে চলছে নানা আলাপ-আলোচনা। শনিবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির উদ্যোগে এমনই এক ভার্চুয়াল আলাপচারিতা অনুষ্ঠিত হয়। ‘আ লুক অ্যাট বাংলাদেশ’স ৫০ ইয়ার্স জার্নি: টার্নিং পয়েন্টস অব দ্য ইকোনমি’ শীর্ষক এ আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত বক্তাদের ভাষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জনের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে হতাশার কথাও ফুটে উঠেছে। দৃঢ় প্রত্যয়ে সামনে এগোনোর জন্য অর্থনীতির শক্তি ও নাজুকতাগুলো নিয়ে এ ধরনের পর্যালোচনামূলক আলোচনা ইতিবাচক। সামনের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে আলোচনা থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা গ্রহণপূর্বক অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
সন্দেহ নেই, উল্লিখিত সময়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি চমকপ্রদ। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। করোনায় কিছুটা হোঁচট খেলেও সরকারি ভাষ্যে তা আবারো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছবে বলা হচ্ছে। আর্থসামাজিক নানা সূচকে ভারতসহ এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশকে ছাড়িয়েছে বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, যাতায়াত ও পরিবহন খাতে উন্নয়নের পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অগ্রগতি হয়েছে। শিল্পায়ন বেগবান হচ্ছে। ইন্টারনেটের আওতায় এসেছে দেশের প্রায় সব জায়গা। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার মানুষের কাজকর্মে যোগ করেছে নতুন গতি। স্বাধীনতা-পরবর্তী একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে নানা ক্ষেত্রে এ ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছে মূলত সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর সরকারি-বেসরকারি খাতের সহায়তায়। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। দেশের অর্থনীতি এখনো পোশাক রফতানি আর রেমিট্যান্সনির্ভর। প্রবৃদ্ধির নতুন চালকের পথ সুগম করা আর রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণে বিভিন্ন সময়ে বলা হলেও এক্ষেত্রে এখনো খুব একটা উন্নতি দৃশ্যমান নয়। এটা অন্যতম চ্যালেঞ্জ। মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় ঘাটতি রয়ে গেছে, মানবসম্পদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যা অন্তরায়। সমরূপভাবে, শ্রমবাজারে উচ্চমাত্রায় অনানুষ্ঠানিকতা বিরাজমান। মোট শ্রমশক্তির ৮০-৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি খুবই শ্লথ। ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোর অবস্থা এখনো আশানুরূপ নয়। তদুপরি উন্নয়নের সুফল মুষ্টিমেয়র মুঠোবন্দি। ফলে বিপুল মধ্যবিত্ত অর্থনৈতিক উন্নয়নে তেমন এগোতে পারেনি। এটি সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
এর মধ্যে কভিড-১৯ মহামারী আবার দেশের উন্নয়ন ডিসকোর্সে প্রধান তিনটি ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সেগুলো হলো দারিদ্র্য, অসমতা ও কর্মসংস্থান। বিভিন্ন গবেষণা বলে যে দেশে দারিদ্র্য বিমোচন পরিস্থিতির অবনমন ঘটেছে। বিভিন্ন কারণে পুরনো দরিদ্রের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন আরো মানুষ। একইভাবে কভিড সংকট অসমতা আরো বাড়িয়েছে। সম্পদ, আয়, ভূমি মালিকানায় বৈষম্যের পাশাপাশি চলমান মহামারী বৃদ্ধি করেছে ডিজিটাল বিভাজনও। এছাড়া কভিডসৃষ্ট চাকরিচ্যুতি এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে অনেক লোক আয় হারানোর পাশাপাশি অনেকেই নিম্ন বেতনে নানা ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এসডিজির শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যের দিক থেকে এটি মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়। কাজেই উন্নয়নের বিষয়গুলোকে প্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্রীয় নানা সমর্থনমূলক নীতি ও পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সামনে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পরও বাংলাদেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। যেমন বাংলাদেশ এখন এলডিসি হিসেবে যেসব বাণিজ্য সুবিধা পায়, উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হওয়ার পর সেগুলো পাবে না। এখন যে রেয়াতি সুদের ঋণ পায় তা আর পাবে না, উচ্চসুদে ঋণ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক সুবিধা, মেধাস্বত্ব সুবিধা ইত্যাদি কমে যাবে কিংবা প্রত্যাহার হবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ আরো প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে। আছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অভিঘাতের বিষয়ও। বিশ্বে আলোচ্য শিল্প বিপ্লবের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। শ্রমভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করলেও চতুর্থ শিল্প বিপ্লববাহিত প্রযুক্তিগুলো নতুন ধরনের কিছু সুযোগও তৈরি করবে। এর প্রভাবে কোন কোন খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে আর কোন কোন খাতে বাড়তে পারে, তা চিহ্নিতপূর্বক দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত ও শিক্ষাগত রূপান্তর এখন থেকেই করতে হবে বৈকি।
২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে সরকারের রূপকল্প রয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন নয়। কিন্তু তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, রফতানি ঝুড়ি বৈচিত্র্যময় করা, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, বিনিয়োগের জন্য ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোর আরো উন্নয়ন দরকার। উন্নয়নের পথ শিল্পায়নমুখী হলেও দেশের অর্থনীতিতে এখনো বড় মাত্রায় রয়ে গেছে কৃষির গুরুত্ব। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও খাতটি ভালো করছে। বর্তমানে এ খাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রসার ও আধুনিকায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। এটি বেগবান করতে হবে। বিশ্বে উন্নয়ন চিন্তায় পরিবেশ প্রাধান্য পেলেও আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রতিবেশ-পরিবেশ সুরক্ষা এখনো উপেক্ষিত। অথচ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতার জন্য পরিবেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়গুলো আমলে নিয়ে আগামীর যাত্রা মসৃণ করতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।










