চৈত্রের আগমনে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে লোডশেডিং। নতুন বছরের প্রথম মাসেই বিদ্যুতের মূল্য দুবার বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে আরেক দফা বাড়ে বিদ্যুতের মূল্য। সংকটের ফলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি মাসেই বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্ধিত মূল্যের পর বিদ্যুতের চাহিদা যে পূরণ হবে তার নিশ্চয়তাও নেই। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে বলা হচ্ছে। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নীতিগুলো মেনে কীভাবে লোডশেডিং কমানো যায়, সেদিকে আমাদের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
তীব্র গরমের এ সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার বহুল আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) তথ্যমতে, সারা দেশের এসির বেশির ভাগই ঢাকা শহরে ব্যবহৃত হয়। শুধু ঢাকা শহরেই প্রতি বছর এসির ব্যবহার ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
বস্তুত এসি ব্যবহারের সময় তাপমাত্রা চার-পাঁচ ডিগ্রি বাড়িয়ে ২০-৩০ ভাগ বিদ্যুৎ চাহিদা কমানো সম্ভব। এজন্য বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সব সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এসি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরের তাপমাত্রায় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আমাদের দেশে এ নির্দেশ থাকলেও গরমের সময় তা মানা হয় না। অথচ এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপানসহ অনেক দেশেই তাপমাত্রা ২৫-২৬ ডিগ্রির নিচে না নামানোর বিষয়ে নীতিমালা রয়েছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এসি ব্যবহারের সময় কক্ষের দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ রাখা, জানালায় দুই স্তরের কাচ বা পর্দা ব্যবহার করা, এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার করা, বছরে কমপক্ষে একবার এসির সার্ভিসিং করানো, এসির ডাক্ট বা পাইপের লিকেজ পরীক্ষা করা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও ইনভার্টারযুক্ত এসি ও ফ্রিজ ব্যবহার করতে হবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পুরনো প্রযুক্তির বদলে উন্নত প্রযুক্তির আলোক ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক পাখা ও এসি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। এছাড়া কক্ষে টিউবলাইটের বদলে এলইডি লাইট ব্যবহার, আলোর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির জন্য দেয়ালে উপযুক্ত রঙ ব্যবহার, সিঁড়ি, ওয়াশরুম, ওয়েটিং রুম, করিডোরসহ কমন স্পেসে মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে-নেভে এমন সেন্সর সমৃদ্ধ লাইটিং সিস্টেম ব্যবহার করা যেতে পারে। তাহলে বিদ্যুৎ অপচয় অনেক কমে যাবে। কেননা দেখা যায়, এসব জায়গায় সার্বক্ষণিক কারো যাতায়াত না থাকলেও লাইট জ্বলতে থাকে।
অন্যদিকে ভবন নির্মাণের সময় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিল্ডিং কোডে উল্লিখিত কোন কাজে কত মাত্রার উজ্জ্বলতা বজায় রাখতে হবে তা অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া ঔজ্বল্য ধরে রাখতে বৈদ্যুতিক বাল্ব নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে, এজন্য বাল্বের ওপর স্বচ্ছ গ্লাস ব্যবহার করা যেতে পারে। দৈনন্দিন কাজে দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া ও ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস থাকা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও বাতাস বেশি তৈরি হয় এমন ফ্যান ব্যবহার করা দরকার। কাজ ছাড়া অফিসের চালু কম্পিউটার ও ল্যাপটপ পাওয়ার সেভিং মুডে রাখা, ডেস্কভিত্তিক প্রিন্টার ও স্ক্যানার ব্যবহারের পরিবর্তে নেটওয়ার্কের আওতায় কম যন্ত্রপাতি ব্যবহার উৎসাহিত করা ইত্যাদির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।
এ সংকটকালে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, শপিং মল, দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে আলোকসজ্জা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বিদ্যুৎ সংকট এড়াতে বিশ্বের অনেক দেশই ডে-লাইট সেভিং পদ্ধতি অনুসরণ করে, চলতি বছরের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১২ মার্চ থেকে ডে-লাইট সেভিং শুরু করেছে। আগামী নভেম্বরের প্রথম রোববার রাত ২টায় দেশটিতে ঘড়ির কাঁটা ১ ঘণ্টা পিছিয়ে আবারো ‘স্ট্যান্ডার্ড টাইম’-এ ফিরিয়ে আনা হবে। অস্ট্রেলিয়ায় এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ঘড়ির কাঁটা ১ ঘণ্টা এগিয়ে আনা হবে। আমাদের দেশে এ পদ্ধতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় কিনা সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বর্তমানে প্রতিদিনই ১০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বাংলাদেশের এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে ২৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। সেই সঙ্গে আমদানি করা হয় ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট। কিন্তু গরমের সময় পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ চাহিদা ওঠে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এ সময়ে চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বর্তমানে পুরো পরিস্থিতি জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাব্যতার ওপর নির্ভর করছে। কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু ডলার সংকটে ফার্নেস অয়েল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারায় বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। অথচ বিদ্যুতের মোট উৎপাদন ক্ষমতার ২৭ শতাংশ এসব বেসরকারি কেন্দ্র থেকে আসে। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে যেতে না পারলে স্বাভাবিকভাবে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ঘাটতি থাকবে। এর ফলে রমজান এবং গ্রীষ্মকালে তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হবে দেশবাসীকে।
মূলত পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হতেই হবে। এজন্য বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনের জন্য জরুরি ডলার সহায়তা দেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে বিবেচনা করতে হবে। এটি সাময়িক সমাধান হলেও আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যাওয়া প্রয়োজন। এজন্য কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের বিকল্প উৎস কাজে লাগাতে হবে। আমাদের দেশে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকে এখনো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে ঢাকা শহরের ছাদ ব্যবহারের বিষয়টি দেখার জন্য ডিপিডিসি ও ডেসকোকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেটির সম্ভাব্যতা অতি দ্রুত যাচাই করা উচিত। এছাড়া বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম ও বড় শিল্প-কারখানার ছাদেও সৌরবিদ্যুৎ কাজে লাগানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।
উইন্ডমিলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পও সরকারের নেয়া উচিত। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতসহ বেশ কয়েকটি সমুদ্রসৈকত থাকার পরও আমরা বায়ুকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগাতে পারছি না। এক্ষেত্রে সমুদ্রের পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে বায়ুশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায়, সেক্ষেত্রে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মে লোডশেডিং কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আশ্বাস দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের নাগরিকদেরও বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়িতা অবলম্বন করে এ ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করতে হবে। এজন্য দিনের বেলায় অতিরিক্ত লাইট ব্যবহার না করা, এমনকি রাতেও অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা দরকার। কোনো কোনো ভবনে সারা দিন ধরে বৈদ্যুতিক বাতি চলে, এমনকি রাস্তায়ও দিনের বেলায় সড়কবাতি জ্বলতে দেখা যায়। এসব অপচয় যদি আমরা রোধ করতে পারি, তাহলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ফলে আসন্ন গ্রীষ্মকালে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কমে আসবে এ আশা করা যায়।
তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক










