১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৬ মার্চ সময়ের ব্যবধান ৫৫ বছর। এ ৫৫ বছরে আমাদের অর্জন কম নয়। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতির সড়ক যেমন অনেক চওড়া হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ভিন্ন মাত্রায় এখন নির্ণিত। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর এ পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক অধিকারের ক্ষেত্রে অর্জন-অনার্জন দুই-ই আছে। কিন্তু তাতে তো দমে যাওয়ার কিছু নেই। বরং এ দীর্ঘ সময়ে আমরা কতটা সংগঠিত হতে পেরেছি তা অনুধাবন করা জরুরি। পেছনে ফিরে তাকানোর মধ্যেও নিজেকে যাচাই করার সুযোগ থাকে।
স্মরণ করা যেতে পারে, একসময় বাংলাদেশকে 'তলাবিহীন ঝুড়ি' বলে কিসিঞ্জার আখ্যায়িত করেছিলেন। সেই বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যমান বৈশ্বিক সংকটেও আমাদের অর্থনীতির অবস্থা খারাপ না। অর্থাৎ সুপরিকল্পনার মাধ্যমে চেষ্টা করলে সংকটকালীন সময়েও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখে। এমন সুসংবাদ আরো আছে, কিন্তু এর পাশাপাশি দুঃসংবাদও কম নয়। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বৈষম্য বেড়েছে, জীবনযাত্রায় নানা প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা জিইয়ে আছে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা এখনো সম্ভব হয়নি অঙ্গীকার সত্ত্বেও। অর্থনীতিসহ নানা সূচকে আমাদের অগ্রগতি দৃশ্যমান বটে, কিন্তু এ সত্যও অনস্বীকার্য, সুশাসন ও জবাবদিহির মতো জরুরি বিষয়গুলোও এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিশ্চিত করা যায়নি। এসব সমস্যা মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে ঘটেছে।
বাংলাদেশের জন্মই বিশ্বের কাছে একটি বিস্ময় ছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়াশীলতা-পশ্চাৎপদতাসহ নেতিবাচক অনেক কিছু নির্বাসনে পাঠিয়ে ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীন বাংলাদেশে সৃষ্ট সব অন্ধকার ভেদ করে আমরা এগিয়ে চলেছি সর্বাংশে, এটি বলা যাবে না। মুখোশধারীরা এখনো ঘাপটি মেরে আছে। উগ্রবাদী-ধর্মান্ধরা এখনো তৎপর। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এখনো ছড়ায়। রাজনীতিতে স্ববিরোধিতা জিইয়ে আছে। রাজনীতিতে অস্বচ্ছতার ছায়াও কম প্রলম্বিত নয়। অথচ এসবই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। একাত্তরের ২৬ মার্চ থেকে বাঙালির যে প্রতিরোধ ও মুক্তির লড়াই শুরু হয়েছিল, এর পূর্ণতা আসে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মাধ্যমে।
আজকের বাংলাদেশ যে পর্যায়ে অবস্থান করছে, তা অনেক দিক থেকেই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু তাতে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। আমাদের যে আরো অনেক কিছু করণীয় রয়ে গেছে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে মনে রাখতে হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযুদ্ধে মুক্তি শব্দটি বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়েছিল। শুধু ভৌগোলিকভাবে স্বাধীনতা অর্জনই নয়, সার্বিক মুক্তিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর প্রশ্ন দাঁড়াল আমাদের মুক্তি কীভাবে আসবে? আসবার একটা পথ বাংলাদেশের আদি সংবিধানে দেখানো হয়েছিল। চারটি মূলনীতি বের হয়ে এসেছিল। কিন্তু পথের দিশা সংবিধানে থাকাই যথেষ্ট নয়, পথটা বাস্তব ক্ষেত্রে গড়ে তোলা অনিবার্য ছিল, তা আর নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রাখে না। আগেই বলেছি, তৎকালীন শাসকরা হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার স্বার্থে সংবিধানের মূল স্তম্ভগুলোতে আঘাত করেছিলেন। বিলম্বে হলেও উচিত, সংবিধানের সেই আদিরূপ ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দেশবিরোধী যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, এরও প্রতিকার প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ বটে, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। তা আবার কীভাবে ফিরে এল এবং হীনস্বার্থবাদীর রাজনীতিতে ধর্মের সংমিশ্রণ পুনর্বার ঘটিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে যা কিছু করেছে, এরও প্রতিকার প্রয়োজন।
স্বাধীনতার সড়ক নির্মাণ হয়েছিল অনেক আগেই। আমরা যদি '৫২-এর ভাষা আন্দোলন-পর্ব থেকে '৭১-পর্ব পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সবকিছু বিশ্লেষণ করি, তাহলে এর কোনো কিছুই অস্পষ্ট থাকে না। যে রাজনীতির অর্জন এত কিছু, সেই রাজনীতিই আমাদের জন্য ধাপে ধাপে যে দুর্ভোগ ও ক্ষত সৃষ্টি করেছে, এর সলুক সন্ধান জরুরি। সুশাসন নিশ্চিত হলে এ কাজটি সহজ হবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারলে কদাচারের পথ রুদ্ধ হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথও মসৃণ হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হলে আমাদের আরো অনেক পথ হাঁটতে হবে। তার নীতি-আদর্শ চলার পথে পাথেয় করতে হবে। দেশে গণতান্ত্রিক অধিকারের ক্ষেত্র সমতল করতে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কম নয়। দেশের কৃষক, গার্মেন্টসকর্মীসহ আমাদের প্রবাসীরা অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ব্যাপক অবদান রেখে চলেছেন। তাদের যেন যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। তাদের বঞ্চিত রেখে অগ্রযাত্রার পথ মসৃণ রাখা যাবে না। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য করণীয় আছে আরো অনেক কিছু। সরকারের নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয় সেসব ব্যাপারে জ্ঞাত। দেশপ্রেম থাকুক মুখ্য হয়ে। দেশপ্রেম যদি অন্তরের অন্তঃস্থলে থাকে, তাহলে দেশ আলোকিত না হয়ে পারে না।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের আত্মদান আর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় আমাদের বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের। উন্নয়নকে জনমুখী ও টেকসই করতে সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর সব ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। মানবাধিকার, পরমতসহিষ্ণুতা, আইনের শাসন সুসংহত হলেই নিশ্চিত হবে মানুষের অধিকারের সব পথ। জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক ঐকমত্য জরুরি বটে, কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন না তাদের এই পথে টেনে আনা হবে অনুচিত। আমাদের দারিদ্র্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়গুলো রাজনৈতিক এজেন্ডার মুখ্য বিষয় হিসেবে সামনে রাখতে হবে। প্রতিজ্ঞা চাই মুক্তিযুদ্ধের অর্জন রক্ষায়। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে স্বাধীনতার চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থানকারী সব অপশক্তি হটানোর।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের ইতিহাসও আমাদের উন্নততর নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। ইতিহাসে আমাদের গৌরবময় দিক আছে; সেই সঙ্গে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতির দিকও আছে। গৌরবজনক দিকগুলো নিয়ে আমরা সবসময় আলোচনা করি। অথচ ত্রুটি-বিচ্যুতির দিকগুলো বিবেচনার বাইরে রাখি। এটাও আমাদের রাজনৈতিক অনুন্নতির একটি প্রধান কারণ। অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে সবারই দৃষ্টি আছে। অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছে এবং ঘটছে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে রাজনৈতিক উন্নতিও জরুরি। এ দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কিছুটা সংগঠিত হয়েছে। তবে অপূর্ণতার ফরিয়াদ সামান্য নয়। অপূর্ণতার বিষয়গুলোকে সুস্থ- স্বাভাবিক-প্রগতিশীল চিন্তা ও কাজ দিয়ে পূর্ণ করতে হবে। জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য চিন্তা ও কাজ দরকার।আমাদের জাতির গৌরবজনক দিকগুলো নিয়ে আমরা অবশ্যই গর্ববোধ করব। তবে ভবিষ্যতে উন্নয়নের কথাও ভাবা জরুরি। দায়িত্ব ভুলে থাকলে এর কুফল আমাদেরই ভোগ করতে হবে।
স্বাধীনতার সুফল সর্বক্ষেত্রে অর্থবহ করতে হলে সুশাসন, মানবাধিকারসহ নাগরিক অধিকারের সব অনুষঙ্গ নিশ্চিত করতে হবে এবং নজর গভীর করতে হবে অর্জনের পাশাপাশি অপূর্ণতার দিকেও। বিজয়ী জাতির তো দমে যাওয়ার অবকাশ নেই। সব অপূর্ণতা পূর্ণতা পাক। আমরা বিশ্বাস করি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের "শূন্য সহিষ্ণুতার যে অঙ্গীকার রয়েছে, এর বাস্তবায়নে সরকার নির্মোহ অবস্থান নেবে।
ড. মোহীত উল আলম: কথাসাহিত্যিক ও অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়। সাবেক উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ










