বছর না পেরোতেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আবারো একটি কারখানায় বিস্ফোরণে ৬ জন নিহত ও অনেক আহত হয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে টঙ্গীতে একটি প্যাকেজিং কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ২৫ জন। ২০১৭ সালে গাজীপুরের পোশাক কারখানা মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেডে বিস্ফোরণে মারা যান ১৩ জন। উল্লিখিত বড় দুর্ঘটনার পাশাপাশি ছোটখাটো বিস্ফোরণ নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এসব ঘটনার কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া যায় না। অব্যাহতভাবে বিস্ফোরণে হতাহত ও সম্পদের ক্ষতি হলেও প্রশাসনের (সরকারি ও ব্যক্তি) কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তাতে। প্রতিশ্রুতি আর সাময়িক উদ্যোগের কথাই শুধু শোনা যায়। পেছনে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাই বড় হচ্ছে। এতে দেশের শিল্প-কারখানার পরিবেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ছে, যা বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অধিকাংশ কারখানা চলছে যথাযথ নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়াই। এগুলো দেখার দায়িত্বে নিয়োজিত এক ডজনের বেশি সরকারি প্রতিষ্ঠান/সংস্থা ও মন্ত্রণালয়। কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাদের উদাসীনতা ও ব্যর্থতার কারণেই ঘন ঘন দুর্ঘটনা বা বিস্ফোরণ ঘটছে। এটি বন্ধে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে।
কারখানায় বিস্ফোরণের জন্য বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। বয়লার, জমে থাকা গ্যাস, সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ইত্যাদি থেকেই বিস্ফোরণ ঘটছে। কারখানা কমপ্লায়েন্স মেনে পরিচালিত হলে এবং সম্ভাব্য বিস্ফোরণের জন্য দায়ী উপাদানগুলো নিয়মিত তদারকি করা হলে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেক কারখানার বয়লার চলছে কোনো রকম সরকারি নিবন্ধন ছাড়াই। ফলে সেগুলো নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। আবার নিবন্ধন করলেও অনেক বয়লারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে সেগুলো নবায়ন করা হচ্ছে না নিয়মিতভাবে। আবার কারখানাগুলো কমপ্লায়েন্স মেনে পরিচালিত হচ্ছে না। গাফিলতি রয়েছে পরিদর্শনের সঙ্গে জড়িত কার্যালয়েরও। কারখানা পরিদর্শনসহ বয়লার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু কারখানা তো বটে তদারককারী সংস্থাও সঠিকভাবে এগুলো দেখছে না। দুঃখজনকভাবে পরিদর্শনের কাজটিও যথাযথভাবে করা হচ্ছে না। কারখানার কমপ্লায়েন্স ও বয়লার ব্যবহারকারী কারখানার সংখ্যা অনেক বেশি হলেও পরিদর্শকের সংখ্যা অপ্রতুল। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাও নেয়া সম্ভব হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে শিল্প-কারখানায় বিস্ফোরণের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন কারখানায় দুর্ঘটনার বিষয়গুলো দেখভাল করার কথা শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বা ডাইফির। তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমছে না। এক্ষেত্রে তদারকি সংস্থার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও উদ্যোগ নেয়া হলে বহুলাংশেই দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ব্যাপারে বিশ্বস্বীকৃত নীতি হলো ‘সেফটি ফার্স্ট’ বা নিরাপত্তাই প্রথম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরাপত্তামূলক আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে শিল্প দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এজন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধান থাকলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হয় না। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর আওতায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধানের যে নিয়ম রয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নীতিমালা, ২০১৩ সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে পরিস্থিতির নিশ্চিতভাবেই উন্নতি সম্ভব। এক্ষেত্রে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কারখানা মালিক ও সরকারের।
শিল্প-কারখানায় বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর দেয়া হয়। নিবন্ধন থেকে পরিচালনা সব ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করা হয় রাষ্ট্রীয় নজরদারি। কোনো বয়লার নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে কিনা, মান ঠিক আছে কিনা, মেয়াদ আছে কিনা, যান্ত্রিক ও ভৌত ত্রুটি আছে কিনা, কীভাবে চালানো হচ্ছে, ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কিনা, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে কিনা—সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়। কারখানার কমপ্লায়েন্স পরিপালনে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্বলতা যেন না থাকে, সেজন্য বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা করা হয় নির্দিষ্ট সময় অন্তর। সময়োপযোগী করতে আইনে আনা হয় প্রয়োজনীয় সংস্কার। বলতে গেলে যুগোপযোগী আইন, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতায় উন্নত দেশগুলোয় কারখানায় বিস্ফোরণ প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও বয়লার আইন ১৯২৩ রহিত করে নতুন আইন পাস করা হয়েছে ২০২২ সালে। কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তায় কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু মালিকপক্ষ সেটি মানতে আগ্রহী নয়, সরকারি কর্তৃপক্ষও সেটি পরিপালনে জোরদার ব্যবস্থা নেয় না। সীতাকুণ্ডে ২০২২ সালে সংঘটিত বিস্ফোরণের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করত তাহলে শনিবারের এ দুর্ঘটনা ঘটত না, ঘটলেও হতাহতের সংখ্যা আরো কম হতো।
বাংলাদেশে শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ তৈরিতে গঠিত হয় বিদেশী ক্রেতাদের দুই জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। পাশাপাশি দাতা সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় রিমেডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল (আরসিসি) গঠন করে সরকার। এরপর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কারকাজ শুরু হয়। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে কারখানার নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের সুনাম বেড়েছে। ঠিক একইভাবে দেশের অন্য শিল্প-কারখানায় কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি। কারখানার কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতের জন্য সরকার নতুন সংস্থা গঠনসহ কিছু বিষয় নিয়ে ভাবছে বলে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন ২০২১ সালে। এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া যায় না, যা দুঃখজনক।
দেশে আইনের কমতি নেই। প্রতিটি খাতেই ভালো অনেক আইন রয়েছে, আছে তদারককারী সংস্থা। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয় না। ফলে যে উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন ও সংস্থা তৈরি করা হোক না কেন শেষ পর্যন্ত সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। কারখানায় বিস্ফোরণ ঘটা কোনো দৈব বা প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি সম্পূর্ণ কারখানার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার ফল। সঠিক সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই এসব বিস্ফোরণ রোধ অনেকাংশে সম্ভব। সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, কারখানা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। ব্যবসা যেভাবে বেড়েছে, অর্থনীতি যেভাবে বড় হয়েছে, সেই তুলনায় সরকারি তদারকি সংস্থার সক্ষমতা বাড়েনি। এদিকে নজর দিতে হবে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের অভিজ্ঞতা ও জনবলকে দেশীয় বাজারভিত্তিক শিল্পের সংস্কার উদ্যোগে কাজে লাগানো যেতে পারে। বেসরকারি পরিদর্শন প্রতিষ্ঠানকেও কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। এক্ষেত্রে কারখানার মালিকের পাশাপাশি সরকারি কর্তৃপক্ষের সতর্কতা ও সক্রিয়তার বিকল্প নেই।










