স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। বাংলাদেশে সরকারি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ নেই। তাই সুযোগ সঠিকভাবে না মেলায় অধিক খরচ করে বেসরকারি চিকিৎসাসেবার দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। সরকারের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেখানেও বাণিজ্যিক মুনাফাই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবেই গড়ে উঠেছে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা। অধিকাংশেরই সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, আছে অধিক ফি আদায়ের অভিযোগ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মাঝে মধ্যে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে শৃঙ্খলায় আনতে উদ্যোগ নিতে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখে না। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক আলোচনা সভায় দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবার ব্যয় নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়ার কথা পুনরায় ব্যক্ত করেছেন। যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়া এমন পদক্ষেপের সাফল্য নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণহীন বা ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছে। হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণমূলক কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে তারা সহজে সেটি মেনে নিতে চান না। ভোগ্যপণ্যের বাজারের ক্ষেত্রে বিষয়টি যেমন সত্য, তেমনি চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও। নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে সেটি হয় তারা মানেন না, নতুবা নতুন নতুন অজুহাত দাঁড় করাতে থাকেন। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে চিকিৎসা ব্যয় নির্ধারণের উদ্যোগটি সরকার অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে ওঠা বেসরকারি খাতের ওপর কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে।  

মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, মোট প্রজনন হার—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসা ও স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মডেল হিসেবে কমিউনিটি ক্লিনিককে ‘বৈপ্লবিক’ বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু এত অর্জন সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। চিকিৎসা ব্যয় বেড়েই চলছে। বললে ভুল হবে না, চিকিৎসকদের ফি আদায়ের কোনো নীতিমালা না থাকায় একধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বিরাজমান। এর দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এখান থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাতের উত্তরণ দরকার।

সরকারি হাসপাতালে সেবার ঘাটতি ও বেসরকারি হাসপাতালকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় রোগীর চিকিৎসায় শৃঙ্খলা আসেনি। আর তাই বাড়ছে ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়। এছাড়া গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যথাযথ কার্যকর না হওয়ায় এবং শহর এলাকায় পর্যাপ্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা না থাকায় রোগীরা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। সেবার মানোন্নয়ন করতে সরকার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ক্যাটাগরি করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল—এ, বি, সি ইত্যাদি। বলা হয়েছিল, ক্যাটাগরি নির্ভর করবে তাদের ব্যবস্থাপনার ওপর। যে প্রতিষ্ঠান যেসব স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী তারা শুধু সেটি দেবে, অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারবে না। পরবর্তী সময়ে এ প্রক্রিয়া আর অগ্রসর হয়নি। এমনকি চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণসংক্রান্ত নতুন আইনটিও আলোর মুখ দেখেনি। বেসরকারি খাতে চিকিৎসাসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি নির্ধারণ করে দেয়া হয়, সবাই সেটি মানছে না। কিন্তু দেখার কেউ নেই। তাই বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যয় এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানে এবং যারা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিমালা বা বিধান ফাঁকি দেয়ার প্রবণতাও দেখা যেতে পারে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে সেবার মানেও আলাদা ক্যাটাগরি করে ফেলতে পারে। প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির সেবার ফি নির্ধারণ আর সরকারি ফিতে ন্যূনতম মানের সেবা দেয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। দেশের বেসরকারি খাতকে সরকার কোনোভাবেই বাগে আনতে সক্ষম নয়। যেখানে দাম নির্ধারণ করে দিয়েও বাজারে সে দামে ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করাতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার, সেখানে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যয় নির্ধারণ করে দুর্বল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করতে পারবে, তার নিশ্চয়তা মিলছে না। এক্ষেত্রে তাই বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে সবার আগে।

উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন উপাদানের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসাসেবার ফি ও চার্জ নির্ধারণ করা হয়। এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন রয়েছে সরকারের। নিয়মিত বিরতিতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাও পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে। আইন বা বিধি অমান্য করলে বড় জরিমানাও আদায় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় সেখানে বীমা বড় ভূমিকা রেখে থাকে। কানাডাসহ কল্যাণমুখী অর্থনীতির দেশগুলোয় চিকিৎসাসেবা অনেকটাই বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। আর ব্যয়টি সরকার রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে মিটিয়ে থাকে। তাছাড়া কিছু দেশের জনগণকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বাস্থ্যসেবা বাবদ অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা ফি নির্ধারণ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে তারা বীমা মডেলটি প্রয়োগের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের সরকার বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণ বা সুশৃঙ্খলতা প্রতিষ্ঠায় যে উদ্যোগের কথা বলছে তা মন্দের ভালো। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে আস্থায় নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

বেসরকারি খাতের চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে মানুষের ব্যাপক হতাশা আছে বাস্তবসম্মত কারণে। হাসপাতাল-ক্লিনিকের নামে যেসব প্রতিষ্ঠান চলছে সেখানে বাস্তবে যারা প্রশিক্ষিত সেবা দানকারী থাকার কথা তার বিপরীতে বিভিন্ন অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে সেবা দানকারীরা সুযোগ নিচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতাল অ্যাক্রিডিটেশন পদ্ধতি এবং এর সেবা মান ও মূল্যের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকায় সেবাগ্রহীতা জনগণ প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সে বিষয়ে রোগীদের অসন্তুষ্টি ও কখনো কখনো আস্থার ঘাটতি তাদের দেশের পরিবর্তে বিদেশ থেকে সেবা নিতে উৎসাহিত করে। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ-সংক্রান্ত আইনের ঘাটতির কারণে মুনাফাভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেখানে আইনের নীতি প্রয়োগের দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ফলে দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নেই, যা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশকে ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ নিশ্চিত করতে হলে ব্যক্তির ওপর চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমাতে হবে। এজন্য ২০১২ সালে সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ২০ বছর (২০১২-৩২ সাল) মেয়াদি একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ক্রমান্বয়ে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে ২০৩২ সালে মোট স্বাস্থ্য ব্যয় ৩২ শতাংশ করা হবে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে রোগীর স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের কারণে সৃষ্ট আর্থিক বিপর্যয় ততই বাড়ছে। এতে বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের দেয়া ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ও পরিকল্পনার মধ্যে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবার উন্নতি করার কথা বলা হয়েছে। তাতে এক বছরের কম বয়সী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী সব নাগরিককে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের সেবাকেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি, সেবার মান বৃদ্ধি ও উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে এলেও প্রতিশ্রুতির কোনো কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিল সেগুলো করা হয়নি। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ফি নির্ধারণ, সেবার মান খতিয়ে দেখা কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। আবার অনেক বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে যাদের লাইসেন্স নেই, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। এগুলো কিন্তু একদিনে হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খামখেয়ালির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন যদি স্বাস্থ্য বিভাগ বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে তাহলে এ জটিল সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হবে না।

চিকিৎসার মতো মানবিক স্পর্শকাতর ব্যাপারটিও রীতিমতো ব্যবসায় পরিণত হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতালে গরিব মানুষের কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। আর সরকারি হাসপাতালেও সবাই চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না। সব জায়গায় এখন টাকা দিয়ে চিকিৎসাসেবা কিনতে হয়। এই বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসা ব্যয়কে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা উচিত। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে মানুষের বিনামূল্যে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। 

গত ৫০ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ হচ্ছে ‘অব্যবস্থাপনা’। সত্যিকার অর্থেই দেশে পেশাদার একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তৃণমূল থেকে যত ওপরে যাওয়া যায় সর্বত্রই একই দৃশ্য প্রতীয়মান হয়। বেসরকারি খাতের চিকিৎসা ফি যদি যথাযথভাবে নির্ধারণ করে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে উদ্যোগটি ভালো। তবে মনে রাখতে হবে নির্ধারিত মূল্য যেন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। শুধু মূল্য নির্ধারণ করে দিলেই হবে না, তার যথার্থ বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, রোগীরা সঠিকভাবে এর সুফল পাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটর করতে হবে।