সাম্প্রতিককালের অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণে পরিলক্ষিত হয় বেশকিছু সূচকের ঊর্ধ্বগামী গতিধারা। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী নদীতে টানেল, তৃতীয় পায়রা বন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম। এছাড়াও জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, সর্বোপরি গড় আয়ু বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বার্তাই প্রকাশ করে থাকে। দেশের এ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাঝেও যে তথ্যটি একটি নেতিবাচক অবস্থার জানান দেয় তাহলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। ধনী-দরিদ্রের আয় ও সম্পদ বৈষম্য, জেন্ডার বৈষম্য, আঞ্চলিক বৈষম্য ইত্যাদি। ধনী-দরিদ্রের আয় ও সম্পদ বৈষম্য পৃথিবীব্যাপী আজ এক আলোচিত বিষয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য পরিমাপক আন্তর্জাতিক পদ্ধতি জিনি সহগের মান অনুসারে বর্তমানে আমাদের দেশের বৈষম্য স্তর রেড জোনের খুব কাছাকাছি। দেশে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে বহুতল বিশিষ্ট সুউচ্চ অট্টালিকা, রাস্তায় নামি-দামি বিভিন্ন মডেলের গাড়ি, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ানো গাড়ির দিকে বাড়ানো ভিক্ষুকের হাত আর ফুটপাতে ঘুমানো মানুষের সংখ্যা। অর্থনৈতিক এ বৈষম্যের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে সামাজিক অপকর্ম এবং অসামঞ্জস্যতা। দরিদ্র মানুষ শুধু অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিতই হচ্ছে না, শিকার হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিকূল অবস্থার। অতিসম্প্রতি দৈনিক পত্রিকার এক খবরে প্রকাশিত হয় ধর্ষণের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের বড় অংশই নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য। নিম্ন আয়ের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কখনো সামান্য চকোলেট বা বিস্কুটের লোভ দেখিয়ে কিংবা কখনো দরিদ্র পরিবারের মেয়েকে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পর পরিবারের সদস্যদের হুমকি-ধমকি দিয়ে আইনের আশ্রয় গ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়। দরিদ্র পরিবারের শিশু বা কিশোরীদের একদিকে যেমন ধর্ষণের জন্য সহজে পাওয়া সম্ভব হয়, তেমনি অপরদিকে ধর্ষণের পর শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়াটাও খুব একটা কঠিন কাজ হয় না। দরিদ্র মানুষ আর্থিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে থাকে। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে থাকে নরপিশাচ ধর্ষক। এক কথায় বলতে গেলে ধর্ষণের মতো অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়ে যাওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক বৈষম্য অন্যতম একটি কারণ।
শুধু ধর্ষণের শিকারই নয়, দরিদ্র মানুষ সমাজে বঞ্চিত হচ্ছে আরো বিভিন্নভাবে। গত ১৫ জানুয়ারির দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে শীতের সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২০-২৫ টাকা দরে। ওই একই দিনের একই পত্রিকার ভিন্ন পাতায় প্রকাশিত খবরে লক্ষ্য করা যায়, ‘যশোর সদর উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন ৪০ কেজি শিম নিয়ে মোকামে গেলেন। ২ টাকা কেজি দরে সেই শিম বিক্রি করে ৮০ টাকা পেলেন। অথচ খেত থেকে শিম তোলা আর পরিবহনের জন্যই তিনি ১৪০ টাকা খরচ করলেন।’ শিমের বাজার নিয়ে এ দুই তথ্য অনুযায়ী যশোরে যে শিম বিক্রি হয় প্রতি কেজি ২ টাকা আর ঢাকার বাজারে সে শিম ক্রেতাকে ক্রয় করতে হচ্ছে প্রতি কেজি ২০-২৫ টাকায়—এর অর্থ হচ্ছে ব্যবসায়ীর মুনাফা এবং যশোর থেকে ঢাকায় শিম আনতে পরিবহন খরচ প্রতি কেজিতে ১৮-২৩ টাকা, যা একেবারেই অস্বাভাবিক। বিপরীতভাবে ঢাকায় যে শিম ২০-২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়, যশোরে সে শিম ২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া অস্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন এ অস্বাভাবিক মূল্য পার্থক্য? এর মূল কারণ হচ্ছে কৃষক দরিদ্র। দরিদ্র কৃষক দুর্বল। দরিদ্র হওয়ার কারণে কৃষককে ঠকানো অনেক সহজ হয়। দরিদ্র কৃষককে ঠকিয়ে অতি নগণ্য মূল্যে শিম ক্রয় করে বিত্তবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এভাবেই বিভিন্ন দিক দিয়ে বঞ্চিত হচ্ছে সমাজের দরিদ্র মানুষ। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপক সূচকের অন্যতম হচ্ছে মাথাপিছু গড় আয়, গড় আয়ু ইত্যাদি। উন্নয়নের পরিমাপক এ সূচকগুলো হচ্ছে গড় অংকের খেলা। অংকের ৭ এবং ৫-এর গড় হয় ৬ আবার ১০ এবং ২-এর গড় ৬। দুই ক্ষেত্রেই গড় ৬ হলেও এদের অন্তর্নিহিত তাত্পর্য এক নয়। দেশের এ বৈষম্য দূর করতে সরকার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু করলেও ধনাঢ্যদের আয় এবং সম্পদ যে হারে বেড়ে চলেছে তার সঙ্গে তাল মেলানো সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনৈতিক এ বৈষম্য সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে না, যতদিন না দুর্নীতি, ঋণখেলাপি, কর ফাঁকির প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে দেশের এ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক যতই ঊর্ধ্বমুখী হোক না কেন ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যতদিন গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব না হবে, ততদিন এ উন্নয়ন টেকসই হবে না।
মো. শাহাদাৎ হোসেন: এফসিএ, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, আইসিএবি
সিনিয়র পার্টনার, ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স










