অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলেও তা এখন যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। যানবাহনের অত্যধিক চাপ বেড়ে যাওয়ায় যানজটে পড়ে মহাসড়কটিতে প্রায়ই অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। মাইলের পর মাইল যানজট লেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সময়মতো পণ্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ দেশের প্রধান দুই মহানগরী এবং অর্থনীতির শতকরা ৫০ ভাগ পরিচালনাকারী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা মসৃণ ও দ্রুত করার জন্যই মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হয়। কিন্তু এর সুফল মিলছে না। প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগ না হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহনে সময় ও অর্থ লাগছে বেশি। যানজটের কারণে হচ্ছে যাত্রী দুর্ভোগও। যদিও গত এক দশকে ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-সিলেটের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ করিডোরগুলোয় এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিনিয়োগ করেছে সরকার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি শুরুতেই এক্সপ্রেসওয়ে মানে নির্মাণের সুযোগ ছিল। এজন্য দুই পাশে সার্ভিস লেন ও যানজটপ্রবণ মোড় বা হাটবাজার এলাকাগুলোয় ফ্লাইওভার, ইন্টারচেঞ্জের মতো অবকাঠামো তৈরি করলেই হতো। খরচও খুব বেশি হতো না। কিন্তু অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে সেটা করা হয়নি। চার লেনে উন্নীত করার কয়েক বছরের মধ্যে এর কার্যকারিতা কমছে, যা অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সড়ক ও জনপথের নির্দেশিকায় মহাসড়কে যানবাহন চলাচল (ট্রাফিক গ্রোথ) অন্তত ১০ শতাংশ ধরার নির্দেশনা থাকলেও মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার সময় ডিজাইন ম্যানুয়েলে ট্রাফিক গ্রোথ ধরা হয়েছিল ৮ শতাংশ। এটি চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই এই গ্রোথ ১০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যায়। সড়ক ও জনপথের কর্মকর্তারা অনেকটা অজুহাতের সুরে বলেছেন, দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যখন চার লেনে উন্নীতের পরিকল্পনা করা হয়, তখন সেই সময়ের উপযোগী হিসেবে তৈরি করা হয়। এখানেই তাদের দূরদর্শী চিন্তার অভাব ফুটে উঠেছে। দ্রুত উন্নয়ন ঘটছে। দেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে। এ চিন্তা তাদের মাথায় না থাকা দুর্ভাগ্যজনক।

মহাসড়কটি যখন চার লেনে উন্নীত করে সচল করা হয়, তখন থেকেই এর ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও নিম্নমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করার ফলে কিছুদিনের মধ্যেই মহাসড়কের অনেক জায়গায় বিটুমিন উঠে যায় এবং পিচ ঢেউয়ের আকার ধারণ করে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে কেন? সাধারণত যেকোনো সড়ক-মহাসড়ক এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সংস্কারের প্রয়োজন হবে না। ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি এক বছরের মধ্যেই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই মহাসড়কটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তৈরির সময় ভবিষ্যতে যানবাহনের চাপ বৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করা হয়েছিল তাও সঠিক ছিল না। ফলে সক্ষমতার চেয়ে বেশি যানবাহন চলাচলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ওপর চার লেনের মহাসড়কে দুই লেনের সেতু নির্মাণ করায় যানজটের কারণে গতিও কমে গেছে। সেতু এলাকায় মহাসড়ক ‘চিকেন নেকে’ পরিণত হয়েছে। বিশ্বের কোনো মহাসড়কে এমন অসামঞ্জস্য দেখা যায় না। যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার মহাসড়কটিকে এক্সপ্রেসওয়েতে পরিণত করার পরিকল্পনা করলেও তা আপাতত স্থগিত করেছে। এক্সপ্রেস হয়ে গেলে চার লেন আর সম্প্রসারণের প্রয়োজন হতো না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দূরদর্শী চিন্তার অভাব রয়েছে। চার লেনে উন্নীত করার সঙ্গে সঙ্গে এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির সুযোগ ছিল। এখন এ কাজ করা হলে বাড়তি অর্থ খরচের পাশাপাশি যথাযথ মানে তা সম্প্রসারণও কঠিন হয়ে যাবে। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার সময় যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তাতে গলদ ছিল। মহাসড়কের এ ধরনের ত্রুটির পাশাপাশি একে কেন্দ্র করে অন্যান্য সমস্যাও বিদ্যমান। বিশ্বে মহাসড়কের ধারণা হচ্ছে, এটি হবে দ্রুত ও মসৃণ। এতে অননুমোদিত অন্য কোনো যানবাহন চলতে পারবে না। এর সঙ্গে অন্য কোনো লিংক রোডও যুক্ত হবে না। আমাদের দেশে মহাসড়কে অবাধে ধীরগতির থ্রি হুইলার চলাচল, অবৈধ দখল, বাজার বসা থেকে শুরু করে যানবাহন স্ট্যান্ডও গড়ে তোলা হয়। মহাসড়কের বৈশিষ্ট্য বলে কিছু থাকে না। ফলে যানবাহনের গতি কমে যাওয়া ও যানজটের যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটে। মহাসড়কে কীভাবে এবং কোন গতিতে গাড়ি চালাতে হয়—এ ব্যাপারে অনেক চালকেরই সঠিক জ্ঞান এবং সেই মানসিকতাও নেই। মহাসড়কে অচলাবস্থা সৃষ্টির এটিও অন্যতম কারণ। মহাসড়ক এমন হওয়া উচিত, যাতে কেউ এক শহর থেকে আরেক শহরে দিনে গিয়ে দিনে ফিরতে পারে। ধারণা করা হয়েছিল, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলে মানুষ দিনে গিয়ে দিনে নিজ গন্তব্যে ফিরতে পারবে। এ অবস্থা সৃষ্টি না হয়ে উল্টো অতিরিক্ত সময় লেগে যাচ্ছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম কিংবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফিরতে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে দুইদিন লেগে যাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, মহাসড়ক মানুষের সময় বাঁচাতে পারছে না। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, একটি মহাসড়ক বর্তমান ও ভবিষ্যতে কতটা যানবাহন ধারণ করতে সক্ষম হবে—এ বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হচ্ছে।

দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার আর তিন পার্বত্য জেলার কারণে মহাসড়কটি একই সঙ্গে দেশের প্রধান পর্যটন করিডোরও। স্বভাবতই প্রতি বছর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাড়ছে চলাচলরত যানবাহনের সংখ্যা। এ বৃদ্ধির হার বিভিন্ন সংস্থার প্রাক্কলনের চেয়েও বেশি। ভবিষ্যতে মহাসড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে ও সাসেক করিডোরে সংযুক্ত হলে চলাচলরত যানবাহনের সংখ্যা হবে আরো বেশি। সক্ষমতার চেয়ে বেশি যানবাহন চলাচল করায় এরই মধ্যে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ করে ফেলেছে ২০১৭ সালে চালু হওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক। ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দিতে দ্রুত মহাসড়কটি সম্প্রসারণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের। মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য এখন কেবল একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সংস্থাটি, যার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল এখনো নিযুক্ত করা হয়নি।

উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু কোথাও কোথাও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে দেশের সড়ক বা মহাসড়কগুলো নির্মাণের পরও তা বেশিদিন টিকছে না। বছর না ঘুরতেই নতুন সড়ক ভেঙেচুরে একাকার হয়ে পড়ছে। খানাখন্দ আর কার্পেটিং উঠে চলাচলের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। একটি সড়ক নির্মাণ করার পর কোনো রকম মেরামত ছাড়াই তা টানা ১৫ বছর ভালো থাকবে, এটা ধরে নিয়েই সড়কের নকশা ও নির্মাণকাজ করার রীতি। অথচ নির্মাণের পর এক বছর না পেরোতেই সড়ক-মহাসড়কের স্থানে স্থানে ভেঙে যায়, খানাখন্দ সৃষ্টি হয়। ফলে বছর না ঘুরতেই সেগুলো মেরামতের প্রয়োজন দেখা দেয়। মেরামতের কাজও ভালোভাবে করা হয় না। তাই সেগুলো টেকসই হয় না। অবিরাম চলে মেরামতের কাজ আর এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হতে থাকে। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও মেরামতে বিপুল অংকের অর্থের অপচয় একটা স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের তুলনা চলে না। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয়ও সড়ক-মহাসড়কের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে যে সার্বক্ষণিক তত্পরতা পরিলক্ষিত হয়, তার সঙ্গেও আমাদের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। আমাদের দেশে সদ্যনির্মিত ব্যয়বহুল রাস্তায়ও পানি জমে যায়। কেউ সেদিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করে না। দরিদ্র দেশ। সম্পদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও সুবিদিত। অতএব, নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিটি সড়ক সংরক্ষণই যেখানে আমাদের অলঙ্ঘ্য কর্তব্য হওয়া উচিত, সেখানে এ অপচয়, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সড়ক-মহাসড়ক টেকসই করতে হলে সবার আগে দুর্নীতি দমন করতে হবে। সংস্কার ও মেরামতের কাজে যারা গাফিলতি করেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সনাতন ধারার পরিবর্তে কীভাবে সড়কের টেকসই উন্নয়ন ঘটানো যায়, সে ব্যাপারে গবেষণা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। আমরা আশা করব, দুদকের সুপারিশ কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সেজন্য সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি প্রতিষ্ঠান কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিযোগিতা সক্ষমতাবিষয়ক সমীক্ষায় সড়কের মান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত। কেননা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় কোন দেশের সক্ষমতা কেমন, তা অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামোর গুণগত মানের ওপরও নির্ভরশীল। অথচ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মহাসড়ক নেই বললেই চলে। সড়ক-মহাসড়কের দিকে দৃষ্টি দিলে কর্তৃপক্ষের উপেক্ষা ও অবহেলা আরো প্রকটভাবে চোখে পড়বে। বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক অবকাঠামোর মান বিবেচনায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল নেপালের তুলনায় এগিয়ে আছে। অথচ সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে প্রতি বছর মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করছে সরকার। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। মানসম্পন্ন সড়কের অভাবে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে উঠছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ২০১৯ সালেও পাঁচ হাজারের অধিক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে, আহত হয়েছে আরো অনেকে।

সরকারের যে ভিশন ছিল তা সময় উপযোগী। তবে ভিশনের সঙ্গে কার্যক্রমের মিল ছিল না। চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের একমাত্র বন্দর, সেটা আমাদের আমদানি ও রফতানির জন্য ব্যবহার করা হয়। চট্টগ্রামের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থাটি ছয় বা আট লেনের করা উচিত ছিল। সেটা করা হয়নি, যা প্রধানমন্ত্রীর ভিশনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে। এতে বাড়তি চাপ সামলাতে যোগাযোগের জন্য সরকারকে এখনই নজর দিতে হবে। দ্রুততার সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে গতি রেখে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।