গত সাড়ে তিন মাসে বিশ্বের দুইশর বেশি দেশে প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে পৌনে ১৯ লাখ মানুষ। আর মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজারের ওপরে। বিশ্ব যে একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’, এমন ধারণা এ মুহূর্তে অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে করোনা মহামারীর কারণে। করোনায় আক্রান্ত প্রায় সব দেশই নিজেদের জনগণকে সুরক্ষা দিতে নিয়েছে সংরক্ষণশীল পদক্ষেপ। বেশির ভাগ দেশ তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। করোনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাণিজ্যে। বিশ্বব্যাপী আমদানি-রফতানি কমছে। নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর প্রকোপে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কতদিন চলবে, সেটি সম্পর্কে এ মুহূর্তে সঠিক উত্তর কারো জানা না থাকায় নিজ নিজ দেশের জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রফতানি বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে খাদ্য রফতানিকারক অনেক দেশ। ফলে খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলো খাদ্যপণ্যের সংকটে পড়তে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (এফএও)।

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলাকালে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ে মার্চের শেষ দিকে এফএও কিছু ধারণা তুলে ধরে। সরবরাহের দিকে এগুলো হলো: ক. এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান না হলেও খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়া; খ. এপ্রিল-মে মাসে খাদ্য সরবরাহ চেইন বা প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া; গ. শ্রমিকস্বল্পতার কারণে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ বিশেষ করে শ্রমিকনির্ভর শস্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হওয়া; ঘ. গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব এবং পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে কসাইখানাগুলোর পুরোপুরি সদ্ব্যবহার না হওয়ায় মাংস উৎপাদন কমে যাওয়া; ঙ. যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা ও সঙ্গনিরোধ পদক্ষেপগুলোর ফলে বাজারে কৃষকদের আগমনে বাধা সৃষ্টি হওয়া এবং বিক্রয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়া; ঙ. যানবাহন গমনাগমনের পথ বন্ধের ফলে নতুন খাদ্য সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়াসহ খাদ্যের অপচয় বৃদ্ধি। চাহিদার দিক থেকে এগুলো হলো: ক. নভেল করোনাভাইরাস বিস্তারের শুরুর দিকে খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি; খ. অনানুপাতিক হারে মাংসের ব্যবহার কমে যাওয়া; গ. ছোঁয়াচে ভীতিতে খাদ্যবাজারে ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যাওয়ায় খাদ্যভোগ হ্রাস পাওয়া। ঘ. খাদ্য বিক্রয়ের ধরনে পরিবর্তন আসা। যেমন ই-কমার্সের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ এবং বাড়িতে খাবার খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে রেস্তোরাঁয় খদ্দের হ্রাস; ঙ. খাদ্য রফতানিকারক দেশগুলোর সংরক্ষণবাদী মনোভাবের কারণে খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি হওয়া।  

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এফএওর কিছু ধারণা এরই মধ্যে বাস্তব রূপ নিয়েছে। বণিক বার্তার ১১ এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান নভেল করোনাভাইরাস সংকটের কারণে খাদ্যশস্য রফতানির গন্তব্য সীমিত করে দিয়েছে রোমানিয়া। রোমানিয়ার মতো এতটা কঠোর পদক্ষেপ না নিলেও ভিয়েতনামও বর্তমানে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় চাল রফতানিতে নতুন সরবরাহ চুক্তিগুলোর ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ আরোপ করে রেখেছে। চালের আরেক বৃহৎ রফতানিকারক দেশ ভারতও এখন পণ্যটি রফতানি স্থগিত রেখেছে। বিশ্বের অষ্টম শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ কম্বোডিয়া ৫ এপ্রিল থেকে ধান ও সিদ্ধ চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। একই পথে হাঁটতে পারে থাইল্যান্ডও।

অন্যতম বৃহৎ গম রফতানিকারক দেশ কাজাখস্তান বর্তমানে পণ্যটি রফতানি সীমিত করে আনার ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে দেশটি পেঁয়াজ, চিনি, সূর্যমুখী তেলের মতো পণ্য রফতানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। গত মাসে বিশ্বের বৃহত্তম গম রফতানিকারক দেশ রাশিয়াও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশস্য রফতানির ওপর স্থগিতাদেশ আরোপ করে। তাছাড়া দেশটির ভেজিটেবল অয়েল ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সূর্যমুখীর বীজ রফতানিতে সীমা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাম অয়েলের দ্বিতীয় শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ মালয়েশিয়ায় পণ্যটি উৎপাদনের গতিও এখন বেশ শ্লথ হয়ে পড়েছে।

বিপরীতে আমদানিকারক দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের চাহিদাও এখন বাড়তির দিকে। ইরাক এরই মধ্যে ১০ লাখ টন গম ও আড়াই লাখ টন চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা দিয়েছে। চাল আমদানিকারক দেশ ফিলিপাইনে মাত্র দুই মাসের চাল মজুদ আছে। শীর্ষ আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে জুন পর্যন্ত গমের মজুদ আছে। চালের বাণিজ্য দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকলে ফিলিপাইনসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ নাজুক অবস্থায় পড়বে। 

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের স্থায়িত্বের অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ মুহূর্তে সরকারের করণীয় কী?

এটা ঠিক যে গত দুই অর্থবছরে (২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯) অনুকূল আবহাওয়ার কারণে দেশ বর্তমানে প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন প্রলয়ঙ্করী বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, খরা ইত্যাদি কারণে দেশে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হারে ধারাবাহিকতা সবসময় বজায় থাকেনি। গত পাঁচ বছরে চাল উৎপাদনের চিত্র থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সরকারি তথ্য মোতাবেক, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন দাঁড়ায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার টন। পরের অর্থবছরে (২০১৫-১৬) একই পরিমাণ চাল উৎপাদিত হয়। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার ছিল শূন্য দশমিক শূন্য শতাংশ, যদিও এক বছরে কমপক্ষে ২০ লাখ নতুন মুখ আমাদের খাবারে ভাগ বসায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদিত চালের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৬ হাজার টন। অর্থাৎ চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ঋণাত্মক। অর্থাৎ ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কমপক্ষে ৪০ লাখ নতুন মুখ আমাদের খাদ্যের দাবিদার হলেও প্রধান খাদ্যে প্রবৃদ্ধির হার সাকল্যে ছিল ঋণাত্মক। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চালের মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬২ লাখ ৭৯ হাজার টনে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯)। গত অর্থবছরে সরকার ৩ কোটি ৬৪ লাখ ৫৯ হাজার টন মোট চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায় বলা হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রীর মতে, চলতি অর্থবছরে আমনের উৎপাদন গত বছরের উৎপাদনকে (১ কোটি ৫৩ লাখ টন) ছাড়িয়ে গেছে। তবে চলতি অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদনে শীর্ষে থাকা বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার (২ কোটি ৪ লাখ  টন) চেয়ে কম হবে বলে এরই মধ্যে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। দেশের চালকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো, হাসকিং, মেজর ও মিল মালিক সমিতির হিসাবের বরাত দিয়ে ১১ এপ্রিল একটি দৈনিকের (প্রথম আলো) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ শতাংশ কম হবে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—ক. গত দুই অর্থবছরে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বোরো ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় কৃষক এবার কম জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘চলতি বোরো মৌসুমে জমি আবাদ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় এক লাখ হেক্টর কম অর্জিত হয়েছে’ (বণিক বার্তা, ১৪ এপ্রিল); খ. ধানবীজ বিক্রয়কারী সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো এ বছর তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম বীজ বিক্রি করেছে। কৃষক ঘরে রাখা বীজ দিয়ে চাষ বেশি করেছেন। এতে ফলন কমবে; গ. চলমান করোনা মহামারীর কারণে বেশির ভাগ বাজার বন্ধ থাকায় কৃষক ফসল উৎপাদনের জন্য ইউরিয়া সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে পারছেন না; ঘ. খরা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত মার্চে স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৬০ শতাংশ কম। এপ্রিলের দুই সপ্তাহ চলে গেলেও দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি হয়নি।

উপর্যুক্ত কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ শতাংশ বোরো উৎপাদন হ্রাস পেলে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে কম-বেশি ১ কোটি ৮০ লাখ টনে, যা হবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বোরো উৎপাদনের সমান। তাছাড়া করোনার আতঙ্ক এবং দীর্ঘায়িত খরা বিবেচনায় আসন্ন আউশ আবাদের মোট জমির লক্ষ্যমাত্রা ৫-১৫ শতাংশ কমার সম্ভাবনা আছে বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে ধান কাটার শ্রমিক সংকটের কারণে দেশের হাওড় অঞ্চলে পাকা বোরো ফসল বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। করোনা মহামারীর কারণে দেশব্যাপী গণপরিবহন বন্ধ থাকায় হাওড় অঞ্চলে অবস্থিত সাতটি জেলা সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজারে এরই মধ্যে ধান কাটা শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। সারা দেশে ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, যার প্রায় ২৩ শতাংশ হাওড় অঞ্চলে অবস্থিত উল্লিখিত সাতটি জেলায়। মাঠে পাকা ধান যেকোনো সময় বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় হাওড় অঞ্চলে কৃষকের চোখে ঘুম নেই। এমন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে হাওড় অঞ্চলে কম-বেশি ৫০ লখ টন বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ না করুন, এমনটি হলে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার শূন্য শতাংশে বা ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।   

চাল উৎপাদনে দেশ বর্তমানে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলেও তা বাহ্যিক আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। এর সমর্থনে রয়েছে একাধিক উদাহরণ। আমরা দেখেছি ২০০৭-০৮ অর্থবছরে একাধিক প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সিডর কীভাবে আমন ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করেছিল। আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৩০ লাখ ৪৫ হাজার টনের বিপরীতে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৯৬ লাখ ৬২ হাজার টনে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৯)। ওই সময় বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার কারণে ভারত, ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি দেশ খাদ্যশস্য (চাল, গম) রফতানির ওপর স্থগিতাদেশ আরোপ করেছিল। এতে উন্নয়নশীল বিশ্বের ক্রেতা দেশগুলোর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশের তত্কালীন নির্দলীয় সরকার চাল আমদানিতে দারুণ অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মার্চে অকালবন্যায় সিলেটের হাওড় অঞ্চলে বোরোর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ১০ লাখ টন, যদিও বেসরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১৫ থেকে ২০ লাখ টন। সরকারের বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার (১ কোটি ৯১ লাখ টন) বিপরীতে উৎপাদন ১০ লাখ টন কমে যাওয়ায় এবং চাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কহারের (২৮ শতাংশ) কারণে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চাল আমদানির পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় (ওই অর্থবছরে শুধু বেসরকারি খাতে ১ লাখ ৩৩ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়) ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শুরুতে দেশের কম-বেশি ৮০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকায় পৌঁছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলে। মাঝারি ও চিকন চালের দাম ছিল আরো অনেক বেশি।

চালের ঘাটতি মেটাতে এবং দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার বেসরকারি খাতে চাল আমদানিকে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। চাল আমদানির ওপর পুরো শুল্ক (২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি) রহিত করা হয়। তাছাড়া সরকারি খাতেও ১৫ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়।

খাদ্যশস্যের চাহিদায় দ্বিতীয় স্থানে আছে গম। পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা  কম-বেশি ৭০ লাখ টন। আমরা উৎপাদন করি ১২ থেকে ১৩ লাখ টন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের  তথ্যানুযায়ী,  চলতি অর্থবছরের ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৫১ লাখ ৭৪ হাজার টন গম আমদানি করা হয়েছে। রফতানিকারক দেশগুলো থেকে পণ্যটির রফতানি সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং বড় বড় আমদানিকারক দেশের বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় অবশিষ্ট গম আমদানি ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। ২০১৭ সালের অবস্থার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সরকারি-বেসরকারি খাতে কমপক্ষে দুই লাখ টন চাল আমদানিও বিবেচনা করা যেতে পারে। শুধু বেসরকারি খাতে এ চাল আমদানি করতে হলে তাদের কিছুটা শুল্ক সুবিধা দিতে হতে পারে।   

নভেল করোনাভাইরাসের দুর্যোগের সময় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৫ এপ্রিল ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির বিশেষ ওএমএস চালু করে সরকার। সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট কিছু সমস্যার কারণে ১৩ এপ্রিল এ কর্মসূচি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হলেও এরই মধ্যে বিতরণকৃত চাল সরকারি মজুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যে দেখা যায়, ১৫ মার্চ খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামে মোট মজুদ ছিল ১৭ লাখ ৫১ হাজার টন (চাল ১৪ লাখ ২৯ হাজার টন এবং গম ৩ লাখ ২২ হাজার টন)। এদিকে ৯ এপ্রিল বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ৮ এপ্রিল সরকারি গুদামে চাল ও গমের মজুদ কমে দাঁড়ায় ১৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৭৮ টনে। এক মাসে সরকারি গুদামে সোয়া দুই লাখ টন খাদ্যশস্যের (মূলত চালের) মজুদ কমেছে। স্মর্তব্য, সরকারি গুদামে খাদ্যশস্য মজুদের পরিমাণ কমে গেলে তা বাজারে দাম বাড়াকে উসকে দেয়। 

মাংস, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, গুঁড়ো দুধ, ফলমূল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন মসলায় আমরা বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। এসব খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তুলতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

সব শেষে যা বলতে চাই, নভেল করোনাভাইরাসের শেষ কোথায় এবং মানুষ কবে নাগাদ তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারবে—এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর এ মুহূর্তে কারো জানা নেই। কেউ কেউ বলছেন, আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি শেষ হতে অনেক সময় নেবে। বৈশ্বিক করোনা মহামারী চলাকালে খাদ্য রফতানিকারক দেশগুলো খাদ্যপণ্য রফতানিতে যে রক্ষণাত্মক ব্যবস্থা নেবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই আগামী ছয় থেকে নয় মাসের খাদ্যপণ্যের সন্তোষজনক মজুদ গড়ে তোলার জন্য সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল: সাবেক খাদ্য সচিব

Latifm43@gmail.com