সম্প্রতি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ওপর সব ধরনের পণ্য রফতানিতে অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করেছেন। বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ওপর শুল্ক ধার্য করা হয়েছে ৩৭ শতাংশ। তাই সর্বত্র আলোচনা চলছে, এ শুল্ক বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে কেমন প্রভাব ফেলবে। আলোচনার গভীরে যাওয়ার আগে প্রথমেই আমরা দেখে নিই, Reciprocal Tariff নামের এ নতুন ট্যারিফ আসলে কী?
Reciprocal Tariff বলতে কী বোঝায়?
অফিস অব দি ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী আমেরিকার চলতি হিসাব প্রায় পাঁচ দশক ধরে ঋণাত্মক রয়েছে, যার মূল কারণ আমেরিকা বিদেশ থেকে আমদানি করছে প্রচুর, কিন্তু রফতানি করছে অনেক কম। যেমন ইউএস ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিসের তথ্যমতে, বিগত ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার এ ডেফিসিট বা ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১২২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার যা ২০২৫-এর জানুয়ারি থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার বেশি।
আমেরিকান সরকারের মতে, এ ধারাবাহিক ঘাটতির কারণে বিদেশী দেশগুলো আমেরিকান ভোক্তার চাহিদার সুবিধা নিচ্ছে, কিন্তু এর নেতিবাচক ফল ভোগ করছে আমেরিকান শিল্প মালিকরা। আমেরিকান সরকারের হিসাব মতে, ১৯৯৭ সাল থেকে আমেরিকাতে ৯০ হাজার শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় ৬৬ লাখ নাগরিক চাকরি হারিয়েছে।
আমেরিকান বর্তমান সরকার এ ধরনের প্রবণতা রোধ করতে Reciprocal Tariff নামে এক নতুন ধরনের ট্যারিফ হিসাব করেছেন। তাদের মতে, এখন বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর যদি উচ্চ হারে এ শুল্ক বা ট্যারিফ ধার্য করা হয়, তাহলে এ ঘাটতি আর থাকবে না।
এ হিসাবমতে, চীনের পণ্যের ওপর Reciprocal Tariff ধার্য করতে হবে ৬৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ট্যারিফ ধার্য করতে হবে ৭৪ শতাংশ। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের ওপর এ শুল্ক ধার্য করেছেন ৩৪ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ওপর ধার্য করেছেন ৩৭ শতাংশ। একইভাবে তিনি অন্যান্য দেশ, যেমন ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশের ওপর একই রকম অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেহেতু দয়া দেখিয়ে প্রকৃত ট্যারিফের বদলে কম ট্যারিফ ধার্য করেছেন, তাই আমরা এ নতুন ট্যারিফকে বলছি ট্রাম্প ট্যারিফ (Trump Tariff)। এখানে বলা দরকার, বাংলাদেশকে এ নতুন শুল্ক ধার্য করার আগেও আমেরিকায় পণ্য রফতানিতে শুল্ক দিতে হতো। পণ্যের ধরন অনুযায়ী এ শুল্কের হার ছিল ভিন্ন।
তাই আমেরিকার ট্রাম্প ট্যারিফ ধার্য করার আগে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি আমেরিকায় কেমন ছিল, তা যদি পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে আমরা বুঝতে পারব বাংলাদেশের রফতানির প্রকৃত Competitiveness কেমন?ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি দিয়ে এ Competitiveness মাপা যায় না, কারণ বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়।
আমরা এখন দেখব, বিগত দিনগুলোয় আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির চিত্র কেমন ছিল। যেহেতু আমেরিকায় বাংলাদেশের পণ্য রফতানির সিংহভাগ টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্য, তাই আমরা এ পর্যালোচনায় শুধু টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্যের রফতানি পর্যালোচনা করছি।
আমেরিকায় বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্যের রফতানির চিত্র
নিচের সারণিতে (সারণি-১) তুলে ধরা হয়েছে ২০২০-২৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের টেক্সটাইল এবং গার্মেন্টস পণ্য রফতানির সামগ্রিক চিত্র। এখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের এ খাতে রফতানি ছিল ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার যা ২০২৪ সালে এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে।
সারণি-১: আমেরিকায় বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্য রফতানির চিত্র (২০২০-২৪)

আমেরিকা প্রতি বছর যে পরিমাণ টেক্সটাইল পণ্য আমদানি করে, ২০২৪ সালে এসে বাংলাদেশ তার ৭ শতাংশ জোগান দিয়েছে যা ২০২০ সালে ছিল ৬ শতাংশ (সারণি-২)। তাই গত চার বছরে আমেরিকার টেক্সটাইল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে, শুল্ক দেয়ার পরও বাংলাদেশের পণ্য তার আকর্ষণ ধরে রাখতে পেরেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্যের প্রকৃত Competitiveness রয়েছে।
সারণি-২: আমেরিকার মোট টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের হিস্যা (২০২০-২৪)

এখন আমরা দেখব, অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের এ হিস্যা গত চার বছরে কেমন ছিল। এখানে বলা দরকার, ২০২৪ সালে বাংলাদেশসহ ১১টি দেশ আমেরিকার টেক্সটাইল পণ্যের মোট রফতানির ৭৮ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে (সারণি-৩)।
বাংলাদেশ ছাড়া এ দেশগুলো হলো—চায়না (২৪ দশমিক ২ শতাংশ), ভিয়েতনাম (১৫ দশমিক ২ শতাংশ), ভারত (৮ দশমিক ৯ শতাংশ), ইন্দোনেশিয়া (৪ দশমিক ৫ শতাংশ), কম্বোডিয়া (৪ দশমিক ৩ শতাংশ), মেক্সিকো (৩ দশমিক ৮ শতাংশ), পাকিস্তান (৩ দশমিক ৬ শতাংশ), ইতালি (২ দশমিক ৪ শতাংশ), তুরস্ক (২ দশমিক ৩ শতাংশ) ও হন্ডুরাস (২ দশমিক ২ শতাংশ)।
সারণি-৩: শীর্ষ ১১ দেশের আমেরিকার টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্যের বাজারে হিস্যার পরিমাণ (২০২০-২৪)

এখন আমরা দেখব, গত চার বছরে এই ১১ দেশের মধ্যে আমেরিকার টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্যের রফতানির বাজারে হিস্যার পরিবর্তন কেমন হয়েছে। নিচের সারণিতে (সারণি-৪) আমরা দেখতে পাচ্ছি, গত চার বছরে একমাত্র চীন ছাড়া বাকি সব দেশের হিস্যা বেড়েছে। গত চার বছরে আমেরিকার বাজারে চীনের হিস্যা কমেছে ৪ শতাংশ, যা অন্যান্য দেশ দখল করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে ভারত, যারা এ চার বছরে তাদের হিস্যা বাড়িয়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ছিল দ্বিতীয় ১ শতাংশ।
সারণি-৪: শীর্ষ ১১ দেশের আমেরিকার টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্যের বাজারে হিস্যার পরিবর্তন (২০২০-২৪)

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, গত চার বছরে চীন আমেরিকার টেক্সটাইল পণ্যের বাজারে তার আধিপত্য ধারাবাহিকভাবে হারিয়েছে, যার ফলে লাভবান হয়েছে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলো। চীনে এ আধিপত্য কমেছে কিন্তু তার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমার জন্য নয়। বিশ্ব আধিপত্য নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে চীনের লড়াই এখন চলমান এবং আমেরিকার বাজারে চীনের এ আধিপত্য হ্রাস তারই একটি প্রতিক্রিয়া মাত্র।
বর্তমানে যে ট্রাম্প ট্যারিফ ধার্য করা হলো, তারও কিন্তু মূল টার্গেট হলো চীন। এ ট্রাম্প ট্যারিফের মূল উদ্দেশ্য সারা বিশ্বে চীনের পণ্য রফতানি কমিয়ে আমেরিকার পণ্য রফতানি বাড়ানো।
বাংলাদেশের রফতানির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
ওপরের পর্যালোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে আগামীতে আমেরিকায় বাংলাদেশের টেক্সটাইল পণ্যের রফতানি বাড়বে। এর কারণ গত চার বছরে আমেরিকায় চীনের আধিপত্য যেভাবে ধারাবাহিকভাবে কমেছে, ঠিক একই ধারা আগামীতেও বজায় থাকবে—এমনটি অনুমান করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাই আমেরিকার বাজারে চীনের আধিপত্য যদি কমে, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে প্রতিযোগী দেশগুলোর রফতানিতে। এর মাধ্যমে সবচেয়ে লাভবান হবে ভারত, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে রয়েছে, কারণ বাংলাদেশ যেসব ক্যাটাগরির গার্মেন্টস পণ্য রফতানি করে, তা মূলত নিম্নমূল্যের পণ্য। তাই এ পণ্যগুলো আরো কম খরচে অন্য কোনো দেশে তৈরি করা সম্ভব নয়। এছাড়া বাংলাদেশের মতো এত বিরাট গার্মেন্টস সক্ষমতা অন্য অনেক দেশের নেই। তাই পরিস্থিতি যা-ই থাকুক, বাংলাদেশের বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়।
বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প ট্যারিফের ভিন্নতা এ ইতিবাচক প্রভাবে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করবে বলে মনে হয় না, কারণ এ পার্থক্য খুব বেশি নয়। এখানে বলা দরকার, একটি পণ্যের প্রকৃত Competitiveness শুধু তার মূল্যের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে আরো অনেক বিষয় জড়িত। সেই সঙ্গে পণ্যের দাম কম হলেই যে একজন ক্রেতা বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাবে, এমন সম্ভাবনাও নেই। কারণ প্রতিটি ক্রেতা খেয়াল রাখেন তার সোর্সিং যেন একাধিক হয়। এতে ব্যবসায়িক ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
আগামীতে দেনদরবারের মাধ্যমে যদি এ ট্যারিফ কমিয়ে আনা যায়, তাহলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে আমেরিকার বাজারে রফতানি বিপুল পরিমাণে বাড়ানোর। এর কারণ চীনের আধিপত্য কমে গেলে এ জায়গা দখল করবে অন্য দেশ। এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ, যদি বাংলাদেশের রফতানির ওপর ট্যারিফের পরিমাণ আরো কমে আসে।
ট্রাম্প ট্যারিফ কমানোর জন্য আমাদের আমেরিকান পণ্য আমদানি বাড়াতে হবে। বর্তমানে টেক্সটাইল খাতে আমেরিকান তুলা আমদানি হয়, যার পরিমাণ বাড়ানো যায়। যদিও আমেরিকান তুলার দাম অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কিছুটা বেশি, কিন্তু আমেরিকান রফতানিকারকদের দাবি অনুযায়ী আমেরিকান তুলার দাম বেশি হলেও যেহেতু এ তুলার মান অনেক উন্নত, তাই এ তুলা ব্যবহারে যে সুতা তৈরি হয়, তা দিয়ে উন্নত মানের কাপড় তৈরি করা যায়, যার মূল্য অপেক্ষাকৃত বেশি।
তাই ট্রাম্প ট্যারিফ-পরবর্তী যুগকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে ইতিবাচক হিসেবে দেখা উচিত এবং সরকার এবং ব্যবসায়িক সমাজের যৌথ প্রচেষ্টায় এ পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় নতুন কৌশল নিয়ে রফতানি বাড়াতে উদ্যোগী হওয়া উচিত।
মাবরূর মাহমুদ: আইডিয়াজ ফর ডেভেলপমেন্টের (আইএফডি) প্রতিষ্ঠাতা















