বছরের অক্টোবর মাসটি অন্যান্য মাসের তুলনায় একটু আলাদা। এ মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। পদার্থবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে তাই অক্টোবর এলেই এক ধরনের উত্তেজনা বোধ করতে থাকি।

এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জিতলেন মোট তিনজন বিজ্ঞানী। বিলেতের স্যার রজার পেনরোজ, জার্মান বিজ্ঞানী প্রফেসর রেইনহার্ড গেনজেল ও মার্কিন বিজ্ঞানী প্রফেসর অ্যান্ড্রিয়া গেজ। এ তিনজনের মধ্যে রজার পেনরোজ একজন বিশ্বখ্যাত গাণিতিক পদার্থবিদ, রেইনহার্ড গেনজেল ও অ্যান্ড্রিয়া গেজ কাজ করেছেন অবজারভেশনাল অ্যাস্ট্রোনমিতে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তারা কী করেছেন, যার জন্য এই পুরস্কার? এর উত্তর নোবেল কমিটির কাছ থেকেই জানা যাক। রজার পেনরোজের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘for the discovery that black hole formation is a robust prediction of the general theory of relativity।’ রেইনহার্ড গেনজেল ও অ্যান্ড্রিয়া গেজের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘for the discovery of a supermassive compact object at the center of our galaxy।’

রজার পেনরোজ একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে (General theory of relativity) তার পাণ্ডিত্যের সুনাম বিশ্বজুড়ে। অনেকেই মনে করেন, আপেক্ষিকতার তত্ত্বে পেনরোজের অবস্থান আইনস্টাইনের পরেই। বিজ্ঞান নিয়ে যাদের কিছুটা আগ্রহ আছে, তারা black hole শব্দটির সঙ্গে কম-বেশি পরিচিত। বাংলায় আমরা বলি কৃষ্ণবিবর। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জনক আইনস্টাইনের মৃত্যুর বছর দশেক পর ১৯৬৫-এর প্রথম দিকে রজার পেনরোজ গাণিতিকভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে কৃষ্ণবিবরের সৃষ্টি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের এক অনিবার্য ফল। এই কৃষ্ণবিবরের কেন্দ্রে আছে এক singularity, বাংলায় যাকে আমরা বলতে পারি অনন্যতা। আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞান, স্থান-কালের ধারণা—এই অনন্যতায় এসে হার মানে। অনন্যতা এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অতীত।

দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন মহাজাগতিক ঘটনায় বিভিন্ন ধরনের কৃষ্ণবিবর সৃষ্টি হয়েছে এবং এখনো সৃষ্টি হচ্ছে। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ভারী নক্ষত্রগুলো জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে এক পর্যায়ে কৃষ্ণবিবরে পরিণত হতে পারে। নিজ অভিকর্ষ বলের প্রভাবে এসব নক্ষত্র সংকুচিত হতে থাকে, ভেতর থেকে শক্তি উৎপাদনের আর কোনো উৎস না থাকায় এই সংকোচন রোধ করার কোনো উপায়ই আর অবশিষ্ট থাকে না। এ অবস্থায় মৃত তারাটির মহাকর্ষজ বল শুধু বাড়তেই থাকে। এক পর্যায়ে এই বল এতই প্রবল হয়ে ওঠে যে আলোও আর মৃত তারাটি থেকে বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে না। এ অবস্থায় তারাটি আমদের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে যায়। সৃষ্টি হয় একটি কৃষ্ণবিবরের। এখানে মনে রাখা ভালো, আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী মহাকর্ষ বল আসলে স্থান-কালের বক্রতার একটি পরিমাপ। এই বক্রতা ভর ও শক্তি উভয় দিয়ে নির্ণীত হয়। আলো যেহেতু শক্তির একটি প্রকাশ, তাই স্থান-কালের বক্রতা অথবা মহাকর্ষ বল অন্যান্য ভরবিশিষ্ট বস্তুর মতো আলোকেও ‘টেনে ধরে’ রাখতে পারে। কৃষ্ণবিবরে ঠিক এ ঘটনাই ঘটে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, স্থান-কালের বক্রতা বর্ণনা করতে যে ক্ষেত্র-সমীকরণ দাঁড় করায়, তার সমাধানের ভেতর কৃষ্ণবিবর ও অনন্যতার ধারণা শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু বিষয়টি এতটাই অদ্ভুত যে আইনস্টাইন নিজেই তা বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি। রজার পেনরোজের কাজ গাণিতিকভাবে এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তত্ত্বগতভাবে তার সঙ্গে দ্বিমত করার অবকাশ তেমন আর ছিল না।


এ তো গেল তত্ত্বের কথা। পর্যবেক্ষণ থেকে কৃষ্ণবিবর যে আছে তার পক্ষে কী প্রমাণ পাওয়া যায়? এ প্রশ্নের উত্তর এখন দেয়া বেশ সহজ। কৃষ্ণবিবর যে আছে এবং তা আছে সারা মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে, সেটা এখন নানা ধরনের পর্যবেক্ষণ থেকে প্রমাণিত। এই পর্যবেক্ষণের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। বহু কৌশল ও প্রযুক্তিগত উত্কর্ষের গল্প। ইদানীং কিছুদিন পরপর কৃষ্ণবিবরের ছবি অথবা কৃষ্ণবিবর বা নিউট্রন তারা থেকে উৎসারিত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের খবর পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। দু-তিন দশক আগেও এটা এক রকম অসম্ভব ছিল। আগেই বলেছি, রেইনহার্ড গেনজেল ও অ্যান্ড্রিয়া গেজ কাজ করেছেন অবজারভেশনাল অ্যাস্ট্রোনমিতে। তারা দুজনে দুটি পৃথক গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যাদের কাজ ছিল আমরা যে গ্যালাক্সিতে বাস করি, তার প্রায় কেন্দ্রে অবস্থিত তারাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। অনেকেই হয়তো জানেন, যে গ্যালাক্সিতে আমাদের বাস, তার নাম মিল্কিওয়ে। এই প্যাঁচানো গ্যালাক্সিটির অনেকটা বাইরের দিকে আমাদের সৌরজগৎ। মিল্কিওয়ের যে ব্যাস, তা থেকে এই গ্যালাক্সি কত বড়, তার একটি ধারণা পাওয়া যায়। মিল্কিওয়েজুড়ে তারারা বিস্তৃত। এই বিস্তারের ব্যাস প্রায় দুই লাখ আলোকবর্ষ। অর্থাৎ মিল্কিওয়ের এক প্রান্তের একটি তারা থেকে অন্য প্রান্তের একটি তারায় আলো পৌঁছতে সময় লাগে দুই লাখ বছর। সৌরজগতের কেন্দ্রে প্রায় নয় কোটি মাইল দূরে যে সূর্য, সেখান থেকে পৃথিবীতে আলো পৌঁছতে সময় লাগে ৮ মিনিটের মতো। কাজেই মিল্কিওয়ের বিশালত্ব নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে। মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছাকাছি একটি এলাকা হচ্ছে Saggitarius A*। এই বিশেষ এলাকাটি থেকে উচ্চশক্তির রেডিও তরঙ্গ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিশেষ এলাকাটিতে অবস্থিত নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ছিল রেইনহার্ড গেনজেল ও অ্যান্ড্রিয়া গেজের অন্যতম প্রধান কাজ। নক্ষত্রের গতিবিধি থেকে তারা বুঝতে পারেন আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে দেখা যায় না কিন্তু অত্যন্ত ভারী এবং অতি উচ্চঘনত্ববিশিষ্ট ‘কিছু একটা’ আছে, যা নক্ষত্রগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। এই ‘কিছু একটা’-কেই নোবেল কমিটি ‘Supermassive compact object’ নামে অভিহিত করেছে। সব বৈশিষ্ট্য বিচারে বলা যায়, এই অত্যন্ত ভারী এবং অতি উচ্চঘনত্ববিশিষ্ট অদৃশ্য বস্তুটি হচ্ছে একটি কৃষ্ণবিবর। এখানে স্মরণ করতে বলি, কৃষ্ণবিবর দেখা না গেলেও তা দ্বারা সৃষ্ট অতিশক্তিশালী মহাকর্ষ বলের প্রভাব কিন্তু আশপাশে অবস্থানরত তারারা খুব ভালোই অনুভব করে। তাই অদৃশ্য কৃষ্ণবিবরের প্রভাব তারাদের গতিবিধির ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায়। গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত এই দানবীয় কৃষ্ণবিবর আবিষ্কারের ঘটনা একটি দারুণ ব্যাপার এবং এই আবিষ্কারের জন্যই রেইনহার্ড গেনজেল ও অ্যান্ড্রিয়া গেজ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন। আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত এই কৃষ্ণবিবরের অনুমিত ভর সূর্যের প্রায় চার লাখ গুণ বেশি। এখন ধারণা করা হয়, অন্যান্য গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও এ ধরনের দানব কৃষ্ণবিবর অবস্থান করছে।

রজার পেনরোজ কাজ করেছিলেন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে, রেইনহার্ড গেনজেল ও অ্যান্ড্রিয়া গেজ কাজ করেছেন অবজারভেশনাল অ্যাস্ট্রোনমিতে। তাদের কাজের যোগসূত্র হচ্ছে কৃষ্ণবিবর। আর এই কৃষ্ণবিবর বুঝতে হলে চাই আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব। সব মিলিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে এ বছরের নোবেল জয়ের চমত্কার এক কাহিনী।

 

ড. সালেহ্ হাসান নকীব: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়