বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর ৫ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লি গেলেন। করোনার কারণেই মূলত দীর্ঘ এ বিরতি। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত সরকারও এ সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এ সফরে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পানিবণ্টন, কানেক্টিভিটিসহ এক ডজন চুক্তি, সমঝোতা ও ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের সম্ভাবনা আছে। এরই মধ্যে কয়েকটি স্বাক্ষরও হয়েছে। তবে নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, পানি ব্যবস্থাপনা, ভারতের বাজারে বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশে অশুল্ক বাধা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ অনেক বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেল এবারো। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মধ্য দিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে, আছে কিছু বার্তাও। প্রত্যাশা থাকবে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক এ সফরের মধ্য দিয়ে আরো শক্তিশালী হবে এবং বিদ্যমান বিরোধ ও সমস্যাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি ঘটবে।
বৈশ্বিক সংকটময় রাজনীতির নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ ও ভারত শুধু ভৌগোলিক সীমান্ত সম্পর্কেই আবদ্ধ নয়, বরং ৫০ বছর ধরে দুই দেশ অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানা ক্ষেত্রে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে যারা বিগত কয়েক দশকের মাপকাঠিতে বিবেচনা করছেন, তাদের কাছে নিশ্চিতভাবেই এটি সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্কের একটি উদাহরণ। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বহুমুখী ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার দিকগুলো তাদের পারস্পরিক প্রশংসাসূচক বক্তব্যের মধ্যে প্রকাশ পায়। বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতি পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ক্রমে বাংলাদেশ-ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশী পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশের সুবিধার কারণে (সাফটা নেগেটিভ লিস্টের ২৫ ধরনের আইটেম ব্যতীত) ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে গতিশীলতা এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুষ্টিয়া ও বাগেরহাটে প্রস্তাবিত বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন হলে তা দুই দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশ-ভারত পরস্পরের ভৌগোলিক সীমারেখা, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। দুই দেশই পরস্পরের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বেশ সক্রিয়। বিশ্বায়নের যুগে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক তৈরিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। গত কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল রুট সম্পর্কিত প্রটোকল, ঢাকা-গুয়াহাটি-শিলং এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারকসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, যা দেশ দুটির আন্তঃযোগাযোগ সম্প্রসারণে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে। আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ, খুলনা-মোংলা রেলসংযোগ এবং মিতালি এক্সপ্রেস চালু হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন হয়েছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সব স্থল ও নৌ-সংযোগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সুদৃঢ় হয়েছে। পদ্মা রেললিংক ও খুলনা-মোংলা রেলপথ দুই দেশের যোগাযোগের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতি বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিবেচনায় ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর হয়। যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাতটি নদীর পানিবণ্টনের রূপরেখা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত আগেই হয়েছে এবং আটটি নদীর পানির তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যৌথ নদী গঙ্গার পানির সর্বোচ্চ ব্যবহারেও একটি যৌথ সমীক্ষার বিষয়ে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে তা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধান করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে পারস্পরিক সহযোগিতায় জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে মোকাবেলা করা যায় এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানিসম্পদের সুষম ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা আলোচিত হলে উভয় দেশই লাভবান হবে।
সমস্যা হলো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি। এখানে যে পরিমাণ ভারতীয় পণ্য আমদানি হয়, তার তুলনায় ভারতে আমাদের পণ্য যায় খুবই কম। সেপা চুক্তিতে কেবল বাণিজ্যে নয়, বিনিয়োগের ওপরও জোর দেয়া হয়েছে। আমরা যদি সেখানে পণ্য রফতানি বাড়াতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। ভারতে যে ১৩০ কোটি মানুষের বাজার, সেখানে খুব কম পরিমাণ পণ্যই বাংলাদেশ থেকে যায়। পাটসহ কয়েকটি পণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং বাধা আছে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে এগুলো তুলে দেয়া। আরেকটি বিষয় হলো, সেপা চুক্তিতে কেবল বাণিজ্যের কথা নেই। বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার কথাও আছে। বাংলাদেশে যদি ভারতের বিনিয়োগ বাড়ে, সেখানে আমাদের রফতানিও বাড়বে। বাংলাদেশে এখন কয়েক লাখ ভারতীয় চাকরি করেন। ভারতেও বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য সেই সুযোগ থাকা উচিত। ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং নীতি ভুল বার্তা দেয়। ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সময়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাহার হয়নি। এবারো এ-সংক্রান্ত সুখবর মিলবে বলে খবর জানা যাচ্ছে না। যৌথ পানি ও নদী ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি নেয়নি।
করোনা মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ব একটি সংকটকাল পার করছে। ফলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারসাম্য রক্ষা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ সামর্থ্য বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন জরুরি। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় খাদ্যসামগ্রী, ভোজ্য ও জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াতেও ব্যাপকভাবে পড়ছে। এ বৈশ্বিক বাস্তবতায় জ্বালানি খাতে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতায় মনোযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ, কারণ ভারত জ্বালানি খাতে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারস্পরিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। যুদ্ধের কারণে বিশ্ব যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে সেখান থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্বস্ত প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতকে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। তবে বাংলাদেশ কিংবা এ উপ-অঞ্চলের কোনো দেশ একা টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না। দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারসাম্য রক্ষা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ সামর্থ্য বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন জরুরি। শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও নিরাপদ প্রতিবেশী উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে অবশ্য প্রয়োজনীয়। ভারত আর বাংলাদেশের উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি অনেকটা একই রকম। ফলে উভয় দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের সময় দুই দেশের বেশকিছু অমীমাংসিত বিষয়ের নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ছিটমহল সমস্যার সমাধান, সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় বেশকিছু পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা। তবে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ও সীমান্ত হত্যা শূন্যতে নামিয়ে আনাসহ কিছু বিষয়ের সমাধান এখনো করা যায়নি। দুই দেশের সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই চায় উপমহাদেশের এ অঞ্চলে শান্তি বজায় থাকুক। বাংলাদেশ-ভারতের পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের জনগণের স্বার্থেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরো অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানো উচিত। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক শুধু সরকারের সঙ্গে সরকারের নয়। বরং এ দুই দেশের সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে জনগণের। সেই বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো মীমাংসা করার জন্য ভারতকে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট, পানিবণ্টন চুক্তি ও সীমান্ত হত্যাসহ নানা ইস্যুতে ভারতকে এগিয়ে আসতে হবে। ভারত এগিয়ে আসবে বলেও আমাদের প্রত্যাশা। কেননা এ ইস্যুগুলোর মীমাংসা হলে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতও লাভবান হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর দুই দেশের জনগণের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-ভারতের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হোক।










