কয়েক বছর আগের কথা, অফিসের ড্রপের গাড়িতে বাসায় ফিরছিলাম। কারওয়ান বাজার মোড় ঘোরার জন্য চালক সার্ক ফোয়ারা চত্বর না ঘুরে তার আগেই যেখানে ইউটার্ন নেয়া নিষেধ সেখানে ‘প্রেস’ স্টিকারযুক্ত গাড়িটি ঢুকিয়ে দিলেন। একটু পর তিনি নিজেই অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, ‘বুঝলেন আপা, মিডল ইস্টে যখন গাড়ি চালাইতাম, তখন এ কাজ করলে এতক্ষণে তিন দিক থেইকা পুলিশের গাড়ি আইসা ধইরা ফেলত।’ অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশে তিনি কোনো অনিয়ম করলে ধরা পড়ার, জেল-জরিমানার ভয় ছিল। সে কারণে ওইসব দেশে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে গাড়ি চালাতেন তিনি। সেই একই চালক বাংলাদেশের ব্যস্ত সড়কে অবলীলায় নিয়ম ভাঙেন, উল্টো পথে গাড়ি ছুটিয়ে চলেন।

শুধু গাড়ি চালানোতেই নিয়ম ভাঙা! বাংলাদেশের মানুষ কোন বিষয়ে আসলে নিয়ম মানেন সেটা খুঁজতে আলাদা গবেষণা করা যেতে পারে। সম্প্রতি বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কৃত্রিম জলাধারে ওয়ান টাইম প্লেট গ্লাস পড়ে থাকার একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। ওটাই আসলে বাংলাদেশীদের আসল চরিত্র। নিজের শরীর আর নিজের বসবাসের স্থানটুকু ছাড়া বাকি দেশ আবর্জনায় ডুবে গেলেও কারো কিছু যায় আসে না। রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় যে বাসায় ভাড়া থাকতাম, সেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজা থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিনের বর্জ্য সংগ্রহ করতেন। তার পরও প্রতিটি ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে প্রতিদিন নিচে পড়ত শিশুর ব্যবহৃত ডায়াপার থেকে শুরু করে মুরগির নাড়ি-ভুঁড়ি। ঠিক কোন মনস্তত্ত্ব থেকে এসব কাজ করা হয়, তার জন্য নিশ্চিতভাবেই গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কেন আমরা চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে চিপসের প্যাকেট, বাদামের খোসা, পানির বোতল সরাসরি রাস্তায় নিক্ষেপ করি, কেন পুকুর বা লেকের পানিতে ভাসে রাজ্যের প্লাস্টিকের বোতল-প্লেট-বিস্কিটের প্যাকেট, কেন পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করে ফ্ল্যাশ করি না, কেন রেলওয়ের সিটের হাতল জোর করে ভেঙে রেখে আসি; তার নিশ্চয়ই কোনো ব্যাখ্যা রয়েছে।

অথচ আমরা উন্নত দেশের নাগরিক হওয়ার কথা বলি! সরকার বা প্রশাসন পান থেকে চুন খসালেই উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর উদাহরণ টেনে তাদের তুলাধুনা করি। কিন্তু কোনোদিন কি ঠাণ্ডা মাথায় নিজেদের অপারগতার কথা ভেবেছি? নিজেরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছি কিনা তা ভেবে দেখেছি?

আমার সন্তানের স্কুল ছুটি হয় দুপুর ১২টায়। সে সময় আশপাশের অনেক স্কুলেরই ছুটি হয়। স্বাভাবিকভাবেই জ্যামের মধ্যে পড়তে হয়। রিকশায় উঠে আশপাশের গাড়ি আর মোটরসাইকেলের হর্নের শব্দে কান পাতা দায় হয়ে যায়। কতদিন আমি দুই হাত দিয়ে ছেলের কান চেপে ধরি। কিন্তু কতক্ষণই বা তা সম্ভব? আমরা সবাই জানি, ঢাকার বেশির ভাগ সড়ক অপ্রশস্ত, কোথাও জট লেগে গেলে তা ছুটতে সময় লাগে। সেখানে কেবল হর্ন দিয়ে তো জ্যাম ছোটানো সম্ভব নয়। তবু চালকরা ক্রমাগত হর্ন দিয়ে যান। অকারণ এ তীব্র হর্ন প্রতিটি মানুষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে কমছে শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষমতা, আইকিউ। গর্ভবতী ও তার গর্ভের সন্তানের ক্ষতি হচ্ছে। অনেকটা যেন জেনে-বুঝে নিজের আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতির মহোৎসবে নেমেছি আমরা। অথচ এই আমরাই যখন পশ্চিমা বিশ্বে বা মধ্যপ্রাচ্যের উন্নত কোনো দেশে গাড়ি চালাব, তখন অযথা হর্ন তো দূরের কথা, নিয়মের বাইরে এক পা-ও ফেলব না। এত বৈপরীত্য কেন আমাদের চরিত্রে?

প্রায়ই ফেসবুকের নিউজফিডে অনেককে জাপানে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ধরন, তাদের মানবিকতা বোধ নিয়ে পোস্ট বা ভিডিও শেয়ার দিতে দেখি। অথচ যারা শেয়ার দেন তারা নিজেরাও হয়তো সন্তানকে ঠেলে দেন তুমুল প্রতিযোগিতার জীবনের দিকে। জাপানের ওই শিক্ষা ব্যবস্থা যদি বাংলাদেশের কোনো স্কুল শতভাগ অনুসরণ করতে যায়, তাহলে আদৌ সেখানে কতজন অভিভাবক সন্তানকে পড়তে পাঠাবেন, তা নিয়ে সংশয় আছে আমার। আমরা এখনো জিপিএ ৫-এর পেছনে দৌড়াই, যেকোনো উপায়ে সন্তানকে সবার সামনে সেরা প্রমাণ করতে চাই। সে জন্য প্রয়োজনে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কিনতে দ্বিধা করি না। 

আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত পরিবারে মানবিকতার কোনো পাঠ দেয়া হয় না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছেও র‍্যাগিংয়ের নামে জঘন্য ঘটনার জন্ম দেয় আমাদের সন্তানরা। ক্ষমতার দাপটে অন্যকে অপমান-অপদস্ত করে বিকৃত আনন্দে মত্ত হয় তারা। যার শিকারও হয় আমাদেরই কোনো সন্তান। কেউ কেউ সেই অপমান সইতে না পেরে জীবনের দিক থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়।

শিশুদের কভিড প্রতিরোধী টিকা দেয়ার সময় দেখেছি অপেক্ষমাণ দীর্ঘ লাইনের ফাঁকে ফাঁকে নিজের সন্তানকে প্রবেশ করিয়ে দিতে অভিভাবকদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। কতজনের সঙ্গেই বা ঝগড়া করতে পারি আমি? এই যে লাইনের ফাঁকে ঢুকে যাওয়া, লাইন ভেঙে ঢুকে যাওয়া, পেছনের দরজা দিয়ে বা টেবিলের নিচ দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়ার প্রবণতা মনে হয় যেন আমাদের রক্তে মিশে গেছে। কবে এ থেকে মুক্তি মিলবে আমাদের? আসলেই কখনো মিলবে কি?

আমরা বিশ্ব নাগরিক হওয়ার কথা বলি। বিশ্ব নাগরিক হলো এমন একটি দর্শন যেখানে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে এক পরিচয়ে বেড়ে ওঠার কথা বলা হয়। জাতিসংঘ বলছে, বিশ্ব নাগরিক শব্দবন্ধ দিয়ে এমন একটি বিশ্বাসকে বোঝানো হয় যেখানে একজন মানুষ একাধিক বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং স্থানীয় ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সদস্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে, সমাজের সব অংশের উন্নয়নে বিশ্ব নাগরিকত্বের বিকল্প নেই। অর্থাৎ একজন বিশ্ব নাগরিক হতে হলে আপনাকে কেবল নিজেকে নিয়ে নয়, সবাইকে নিয়ে ভাবতে হবে। সবার ভালো থাকার জন্য কাজ করতে হবে। কিন্তু আসলেই কী আমরা সে পথে এগোচ্ছি? চারপাশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া কোথাও আশার আলোও দেখি না। সবখানেই নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতা, সামান্য লিফটের জন্য অপেক্ষমাণ লাইনেই আমরা ‘‌ঈমান’ ধরে রাখতে পারি না, আবার বড় বড় কথা বলি। 

হ্যাঁ, এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে দেশে আইনের শাসন নেই। ঘুষ-দুর্নীতির মহোৎসব চলে। কেউ নিয়ম না মানলে তার জন্য কোনো শাস্তি হয় না, সে কারণেই চলে নিয়ম ভাঙার মচ্ছব। সেক্ষেত্রে আমার কথা হলো, ‘‌তুমি অধম হইলেও আমি উত্তম হইব না কেন?’ আমাদের বিপুল জনসংখ্যার ছোট্ট একটি দেশ। নানা ধরনের সংকটে জর্জরিত এ দেশে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোয় যথাযথ লোকবলের সংকট রয়েছে। তাই আমরা যদি নিজেদের জায়গা থেকে নিজের দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করি, তাহলে রাষ্ট্রের ভার কিছুটা কমে; আবার রাষ্ট্র এক ধরনের চাপের মুখেও পড়ে। অর্থাৎ প্রত্যেকে নিজের কাজটুকু করলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু তা না করে আমরা কেবল নিজেরটুকু দেখি, নিজের ভবিষ্যৎ গোছাই আর নিজের পাওনাটুকু বুঝে নিই। এ বড় সংকট আমাদের। এ থেকে উত্তরণে আদৌ কোনো উপায় আছে কিনা তা আমার জানা নেই।

সিরাজুম মুনিরা: সাংবাদিক